জান্নাত সম্পর্কে দুর্বল বর্ণনার সংখ্যা অনেক বেশি। আমরা সেখান থেকে বিশুদ্ধ বর্ণনা গুলো উল্লেখ করেছি।
@ পোশাক
وَ جَزٰىهُمۡ بِمَا صَبَرُوۡا جَنَّۃً وَّ حَرِیۡرًا
আর তাদের সবরের পুরস্কারস্বরূপ তিনি তাদেরকে প্ৰদান করবেন। উদ্যান ও রেশমী বস্ত্ৰ।
– দুনিয়াতে পুরুষের জন্য রেশমি বস্ত্র করা হারাম, কিন্তু আখেরাতে হালাল হবে।
@ তৈজসপত্র
জান্নাতের পাত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে।
قَؔوَارِیۡرَا۠ مِنۡ فِضَّۃٍ قَدَّرُوۡهَا تَقۡدِیۡرًا
রূপার স্ফটিক পাত্ৰে, তারা তা পরিমাণ করবে সম্পূর্ণ-পরিমিতভাবে।(ইনসান/দাহর)
– অন্য বর্ণনায় স্বর্ণের পাত্রের কথা আছে। বোঝা গেল, কখনো স্বর্ণের পাত্রে পরিবেশন করা হবে কখনো রুপার পাত্রে। অথবা কারো কারো জন্য স্বর্ণের পাত্র থাকবে কারো জন্য রুপার পাত্র। (তাফসিরে জাকারিয়া)
– রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا تَشْرَبُوا فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ، وَلَا تَأْكُلُوا فِي صِحَافِهَا، فَإِنَّهَا لَهُمْ فِي الدُّنْيَا، وَلَنَا فِي الْآخِرَةِ»
— (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ: “সোনা ও রূপার পাত্রে তোমরা পান করো না, তাতে খেও না। এগুলো দুনিয়াতে কাফেরদের জন্য আর আখেরাতে আমাদের জন্য।”
@ অট্টালিকা
عَنْ عَلِيٍّ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” إِنَّ فِي الْجَنَّةِ لَغُرَفًا يُرَى ظُهُورُهَا مِنْ بُطُونِهَا وَبُطُونُهَا مِنْ ظُهُورِهَا ” . فَقَامَ إِلَيْهِ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ لِمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ” هِيَ لِمَنْ أَطَابَ الْكَلاَمَ وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ وَأَدَامَ الصِّيَامَ وَصَلَّى لِلَّهِ بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ ”
আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতে এমন বালাখানা রয়েছে যে, এর ভেতর থেকে বাহির এবং বাহির থেকে ভেতর দেখা যাবে। তখন এক মরুবাসী আরব উঠে দাঁড়াল এবং বললঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এটি কার জন্য?
তিনি বললেনঃ এটি হবে ঐ ব্যক্তির জন্য যে ব্যক্তি ভাল কথা বলে, লোকদের খাদ্য খাওয়ায়, নিয়মিত সিয়াম পালন করে এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে থাকে তখন আল্লাহর জন্যই রাতে উঠে সালাত (তাহাজ্জুদ) আদায় করে। (তিরমিজি, হাসান)
– দুনিয়ার রৌপ্য-পাত্ৰ গাঢ় ও মোটা হয়ে থাকে-আয়নার মত স্বচ্ছ হয় না। পক্ষান্তরে কাঁচ নির্মিত পাত্র রৌপ্যের মত শুভ্ৰ হয় না। উভয়ের মধ্যে বৈপরীত্য আছে, কিন্তু জান্নাতের বৈশিষ্ট্য এই যে, সেখানকার রৌপ্য আয়নার মত স্বচ্ছ হবে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেনঃ জান্নাতের সব বস্তুর নজীর দুনিয়াতেও পাওয়া যায়। তবে জান্নাতের জিনিসপত্র দুনিয়া থেকে অনেক উত্তম ও আলাদা হবে। [ইবন কাসীর] (তাফসিরে জাকারিয়া)
قُلْنَا الْجَنَّةُ مَا بِنَاؤُهَا قَالَ ” لَبِنَةٌ مِنْ فِضَّةٍ وَلَبِنَةٌ مِنْ ذَهَبٍ وَمِلاَطُهَا الْمِسْكُ الأَذْفَرُ وَحَصْبَاؤُهَا اللُّؤْلُؤُ وَالْيَاقُوتُ وَتُرْبَتُهَا الزَّعْفَرَانُ
আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী দিয়ে জান্নাত তৈরি করা হয়েছে? তিনি বললেনঃ সোনা-রুপার ইট দিয়ে। একটি রূপার ইট, তারপর একটি সোনার ইট, এভাবে গাঁথা হয়েছে। এর গাথুনির উপকরণ (চুন-সুরকি-সিমেন্ট) সুগন্ধি মৃগনাভি এবং কংকরসমূহ মণি-মুক্তার ও মাটি হলো জাফরান। (তিরমিজি সহীহ)
@ বাগান
وَ لِمَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهٖ جَنَّتٰنِ
আর যে তার রবের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান।
ذَوَاتَاۤ اَفۡنَانٍ
উভয়ই বহু শাখা-পল্লববিশিষ্ট।
– উদ্যানদ্বয় ঘন শাখাপল্লববিশিষ্ট হবে। এর অবশ্যম্ভাবী ফল এই যে, এগুলোর ছায়াও ঘন ও সুনিবিড় হবে এবং ফলও বেশি হবে। (তাফসিরে জাকারিয়া)
فِیۡهِمَا عَیۡنٰنِ تَجۡرِیٰنِ
উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রবাহমান দুই প্রস্রবণ।
وَ مِنۡ دُوۡنِهِمَا جَنَّتٰنِ
এ উদ্যান দুটি ছাড়া আরো দুটি উদ্যান রয়েছে।
مُدۡهَآ مَّتٰنِ
ঘন সবুজের কারণে যে কালো রঙ দৃষ্টিগোচর হয়, তাকে ادهمام বলা হয়। অর্থাৎ এই উদ্যানদ্বয়ের ঘন সবুজতা এদের কালোমত হওয়ার কারণ হবে। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর] (তাফসিরে জাকারিয়া)
فِیۡهِمَا عَیۡنٰنِ نَضَّاخَتٰنِ
উভয় উদ্যানে আছে উচ্ছলিত দুই প্রস্রবণ।
– আগের দুটি ঝরনা সম্পর্কে বলা হয়েছে প্রবাহিত। আর এ দুটি সম্পর্কে বলা হয়েছে উচ্ছলিত বা উথলে উঠা। বর্তমান জমানায় আমরা এমন ফোয়ারা দেখতে পাই, যা উথলে উঠে। সম্ভবত তেমন কিছু।
عَنْ أَبِي بَكْرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ قَيْسٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ إِنَّ فِي الْجَنَّةِ جَنَّتَيْنِ آنِيَتُهُمَا وَمَا فِيهِمَا مِنْ فِضَّةٍ وَجَنَّتَيْنِ آنِيَتُهُمَا وَمَا فِيهِمَا مِنْ ذَهَبٍ
আবূ বকর ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন কায়স তার পিতা আবদুল্লাহ্ ইবন কায়স (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতের দু’টো বাগিচা হবে রূপার। এ দুটোর পাত্রগুলো এবং যা কিছু আছে সবই হবে রূপার। আর দুটো বাগিচা হবে সোনার। এ দু’টোর পাত্রগুলো এবং যা কিছু আছে সবই হবে সোনার। (তিরমিজি ২৫৩০, সহীহ)
@ জান্নাতের ঘ্রাণ
وَإِنَّ رِيْحَهَا تُوْجَدُ مِنْ مَسِيْرَةِ أَرْبَعِيْنَ عَامًا
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব হতে পাওয়া যাবে।
– কোন কোন রেওয়ায়েতে ৭০ বছরের কথা এসেছে। সম্ভবত এখানে বছর দ্বারা উদ্দেশ্য অনেক বেশি সুঘ্রাণ।
@ গিলমান
یَطُوۡفُ عَلَیۡهِمۡ وِلۡدَانٌ مُّخَلَّدُوۡنَ
بِاَکۡوَابٍ وَّ اَبَارِیۡقَ ۬ۙ وَ کَاۡسٍ مِّنۡ مَّعِیۡنٍ
তাদের আশ-পাশে ঘোরাফেরা করবে চির কিশোররা, পানপত্র, জগ ও প্রস্রবণ নিঃসৃত সুরাপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে।
– অর্থাৎ, কিশোর খাদেমগণ বড় হয়ে বৃদ্ধ হয়ে যাবে না। বরং তারা কিশোর হয়ে একই বয়স ও একই অবস্থায় চিরদিন থাকবে।
হূরদের ন্যায় এই কিশোরগণও জান্নাতেই পয়দা হবে এবং তারা জান্নাতীদের খেদমতগার হবে। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, একজন জান্নাতীর কাছে হাজারো খাদেম থাকবে। [বাইহাকী আব্দুল্লাহ ইবনে আমরা থেকে] এই কিশোররা খুবই সুন্দর হবে। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে কিশোরেরা, সুরক্ষিত মুক্তার মত। [সূরা আত-তূর: ২৪] আরও বলা হয়েছে, “তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে চিরকিশোরগণ, যখন আপনি তাদেরকে দেখবেন তখন মনে করবেন তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা।” [সূরা আল-ইনসান: ১৯] তাদের চলাফেরায় মনে হবে যেন মুক্তা ছড়িয়ে আছে। কোন কোন লোক মনে করে থাকে যে, ছোট ছোট বাচ্চারা যারা নাবালেগ অবস্থায় মারা যাবে তারা জান্নাতের খাদেম হবে। তাদের এ ধারণা সঠিক নয়। কারণ; ছোট ছোট বাচ্চারা তখন পরিণত বয়সের হবে এবং জান্নাতের অধিবাসী হবে। পক্ষান্তরে এ সমস্ত খাদেমদেরকে আল্লাহ্ তাআলা জান্নাতেই সৃষ্টি করবেন। তাদের কাজই হবে খেদমত করা। তারা দুনিয়ার কোন অধিবাসী নয়। [ইবনে তাইমিয়্যা: মাজমু ফাতাওয়া ৪/২৭৯, ৪/৩১১] {তাফসিরে যাকারিয়া থেকে}
وَ فَاکِهَۃٍ مِّمَّا یَتَخَیَّرُوۡنَ
আর (ঘোরাফেরা করবে) তাদের পছন্দমত ফলমূল নিয়ে।
– হোটেলে যেভাবে ওয়েটাররা এসে বলে স্যার কী লাগবে?
وَ لَحۡمِ طَیۡرٍ مِّمَّا یَشۡتَهُوۡنَ
আর তাদের ঈপ্সিত পাখীর গোশত নিয়ে।
وَّ مَآءٍ مَّسۡکُوۡبٍ
আর সদা প্রবাহমান পানি,
وَّ فَاکِهَۃٍ کَثِیۡرَۃٍ
ও প্রচুর ফলমূল নিয়ে
لَّا مَقۡطُوۡعَۃٍ وَّ لَا مَمۡنُوۡعَۃٍ
যা শেষ হবে না ও যা নিষিদ্ধও হবে না।
– দুনিয়ার সাধারণ ফলের অবস্থা এই যে, মওসুম শেষ হয়ে গেলে ফলও শেষ হয়ে যায়। কোন ফল গ্ৰীষ্মকালে হয় এবং মওসুম শেষ হয়ে গেলে নিঃশেষ হয়ে যায়। আবার কোন ফল শীতকালে হয় এবং শীতকাল শেষ হয়ে গেলে ফলের নাম-নিশানাও অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু জান্নাতের প্রত্যেক ফল চিরস্থায়ী হবে- কোন মওসুমের মধ্যে সীমিত থাকবে না। [ইবন কাসীর; বাগভী, কুরতুবী] {তাফসিরে যাকারিয়া থেকে}
@ ডবল
إِنَّ أَدْنَى مَقْعَدِ أَحَدِكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ أَنْ يَقُولَ لَهُ تَمَنَّ . فَيَتَمَنَّى وَيَتَمَنَّى فَيَقُولُ لَهُ هَلْ تَمَنَّيْتَ فَيَقُولُ نَعَمْ . فَيَقُولُ لَهُ فَإِنَّ لَكَ مَا تَمَنَّيْتَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ ” .
আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কতিপয় হাদীস বলেন। এরমধ্যে একটি হলো তোমাদের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতীকে বলা হবে যে, তুমি কামনা কর। সে কামনা করতে থাকবে। আল্লাহ তাকে বলবেন, তোমার যা কামনা করার তা কি করেছ? সে বলবে, জী! আল্লাহ বলবেন, যা কামনা করেছ তা এবং এর অনুরূপ তোমাকে প্রদান করা হল। (মুসলিম)
@ ১০ গুণ
سَمِعْتُ الْمُغِيرَةَ بْنَ شُعْبَةَ، يَقُولُ: ” سَأَلَ مُوسَى رَبَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى قَالَ: أَيْ رَبِّ أَيُّ أَهْلِ الْجَنَّةِ أَدْنَى مَنْزِلَةً؟ قَالَ: هُوَ رَجُلٌ يَأْتِي بَعْدَمَا أَخَذَ النَّاسُ أَخَذَاتِهِمْ وَنَزَلُوا مَنَازِلَهُمْ، فَيُقَالُ لَهُ: ادْخُلِ الْجَنَّةَ، فَيَقُولُ: أَيْ رَبِّ كَيْفَ أَدْخَلُ وَقَدْ نَزَلَ النَّاسُ مَنَازِلَهُمْ وَأَخَذُوا أَخَذَاتِهِمْ، فَيُقَالُ لَهُ: أَتَرْضَى أَنْ يَكُونَ لَكَ مِثْلُ مَا كَانَ لِمَلِكٍ؟ فَيَقُولُ: نَعَمْ، قَالَ: فَيُقَالُ: لَكَ هَذَا وَخَمْسَةُ أَمْثَالِهِ، فَيَقُولُ: رَضِيتُ يَا رَبِّ وَفُزْتُ، قَالَ: فَإِنَّ لَكَ هَذَا وَعَشَرَةَ أَمْثَالِهِ، فَيَقُولُ: قَدْ رَضِيتُ. فَيُقَالُ فَإِنَّ لَكَ مَا اشْتَهَتْ نَفْسُكَ وَلَذَّتْ، فَيَقُولُ: رَضِيتُ، قَالَ: يَا رَبِّ فَمَنْ ⦗٦٢⦘ أَفْضَلُهُمْ مَنْزِلَةً؟ قَالَ: أُولَئِكَ الَّذِينَ أَرَدْتُ وَسَأُخْبِرُكَ: غَرَسْتُ كَرَامَتَهُمْ بِيَدِي، وَخَتَمْتُ عَلَيْهَا. فَلَمْ تَرَ عَيْنٌ وَلَمْ تَسْمَعْ أُذُنٌ، وَلَمْ يَخْطُرْ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ مِصْدَاقُ ذَلِكَ فِي كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ {فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ} [السجدة: ١٧] ”
মুগিরা বিন শুবা রা. থেকে বর্ণিত,
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
মূসা (আ.) তাঁর রবকে জিজ্ঞাসা করলেন:
“হে রব! জান্নাতের সর্বনিম্ন মর্যাদার অধিকারী কে?”
আল্লাহ তাআলা বললেন:
“তিনি এমন একজন, যিনি আসবেন তখন, যখন জান্নাতবাসীরা তাদের স্থান গ্রহণ করে ফেলবে এবং সব কিছু বণ্টন হয়ে যাবে। তাকে বলা হবে: ‘জান্নাতে প্রবেশ করো।’
সে বলবে:
‘হে রব! কিভাবে প্রবেশ করব, যখন সবাই তাদের স্থান নিয়ে নিয়েছে?’
তাকে বলা হবে:
‘তুমি কি সন্তুষ্ট হবে, যদি তোমাকে একজন রাজার (ধনসম্পদ) পরিমাণ দেয়া হয়?’
সে বলবে: ‘হ্যাঁ।’
আল্লাহ বলবেন:
‘তোমাকে তা দিলাম, সঙ্গে আরো পাঁচ গুণ দিলাম’
সে বলবে: ‘আমি সন্তুষ্ট এবং সফল হয়েছি।’
আল্লাহ বলবেন:
তোমাকে এগুলো দিলাম, সঙ্গে আরো দশ গুণ দিলাম।
সে বলবে, হে আল্লাহ! আমি সন্তুষ্ট।
আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তোমাকে দিলাম যা কিছু তোমার মনে চায় ও চোখে আনন্দ আনে।’
সে বলবে: ‘আমি সন্তুষ্ট।’
মূসা (আ.) বললেন:
‘হে রব! তাহলে তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী কে?’
আল্লাহ বললেন:
‘তারা , যাদের মর্যাদার বাগান আমি নিজে বুনেছি। অত:পর তার উপর সীল মেরে দিয়েছি। (তাদের জন্য রয়েছে) এমন কিছু যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি, কোনো কান শোনেনি, এবং কোনো মানুষের অন্তরে কল্পনাও আসেনি।’ (মুসলিম ৩৫৩, রিয়াদুস সালিহীন)
– সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতিকে দশটি রাজত্বের সমপরিমাণ সম্পদ দেওয়া হবে। পাশাপাশি তার যা মনে চায় তাই দেওয়া হবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের জান্নাতীদের দেওয়া হবে আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী। একদিকে বান্দার ইচ্ছামত আরেকদিকে স্বয়ং আল্লাহ নিজ হাতে তার জন্য জান্নাত সাজিয়ে দিবেন, তাকে যা যা দেওয়ার ইচ্ছা দিবেন।
@ সৌন্দর্য
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ جُرْدًا، مُرْدًا بِيضًا، جِعَادًا مُكَحَّلِينَ أَبْنَاءَ ثَلَاثٍ وَثَلَاثِينَ، عَلَى طُولِ آدَمَ، طُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا فِي عَرْضِ سَبْعَةِ أَذْرُعٍ»
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করবে (অযাচিত) লোমবিহীন, দাড়িহীন, ফর্সা রূপে, ঢেউ খেলানো চুল এবং চোখে সুরমা দেওয়া অবস্থায়, সবার বয়স হবে তেত্রিশ বছর। তারা আদম (আলাইহিস সালাম)-এর উচ্চতায় হবে, যার উচ্চতা ছিল ষাট হাত এবং প্রস্থ সাত হাত।”
– ১. جُرْدًا ইমাম নববী (রহ.) বলেন: এখানে “জুর্দ” অর্থ হলো—তাদের বগলের নিচে, তলপেটে কিংবা পিঠে লোম থাকবে না। এটি সৌন্দর্যের নিদর্শন।
২. مُرْدًا (দাঁড়িহীন): ইবন হাজার (রহ.) বলেন: এটি দুনিয়ার নিয়মের ব্যতিক্রম—কারণ দুনিয়ায় দাঁড়িত রয়েছে সৌন্দর্য, মর্যাদা ও পূর্ণতা; কিন্তু জান্নাতে দাঁড়িহীনতার মধ্যেই সৌন্দর্য থাকবে।
৩. بِيضًا (ফর্সা):
তাদের গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল, দাগহীন, ঝলমলে রূপে থাকবে। তবে “ফর্সা” মানে এখানে শুধু সাদা রঙ নয়—বরং সৌন্দর্যের নিখুঁত প্রকাশ।
৪. جِعَادًا চুল হবে স্বাভাবিকভাবে মোটা ও ঢেউখেলানো, যা সৌন্দর্যবর্ধক।
৫. مُكَحَّلِينَ : জান্নাতির চোখে স্বাভাবিকভাবেই সুরমা দেওয়া থাকবে, তা কষ্ট করে লাগাতে হবে না।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন: এটা সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন এবং সাজসজ্জা ছাড়াই জান্নাতিরা এ সৌন্দর্য লাভ করবেন।
৭. عَلَى طُولِ آدَمَ… (আদম আ.-এর উচ্চতা):
হাদীসে আদম (আ.)-এর উচ্চতা ৬০ হাত বলা হয়েছে (প্রায় ২৭-৩০ মিটার)।
ইমাম ইবনু হাজার বলেন: এ উচ্চতা জান্নাতের পরিবেশ অনুযায়ী নির্ধারিত।
@ সৌন্দর্যের বাজার
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ إِنَّ فِي الْجَنَّةِ لَسُوقًا يَأْتُونَهَا كُلَّ جُمُعَةٍ فَتَهُبُّ رِيحُ الشَّمَالِ فَتَحْثُو فِي وُجُوهِهِمْ وَثِيَابِهِمْ فَيَزْدَادُونَ حُسْنًا وَجَمَالاً فَيَرْجِعُونَ إِلَى أَهْلِيهِمْ وَقَدِ ازْدَادُوا حُسْنًا وَجَمَالاً فَيَقُولُ لَهُمْ أَهْلُوهُمْ وَاللَّهِ لَقَدِ ازْدَدْتُمْ بَعْدَنَا حُسْنًا وَجَمَالاً . فَيَقُولُونَ وَأَنْتُمْ وَاللَّهِ لَقَدِ ازْدَدْتُمْ بَعْدَنَا حُسْنًا وَجَمَالاً ”
আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ জান্নাতে একটি বাজার থাকবে। প্রত্যেক জুমুআয় জান্নাতী লোকেরা এতে একত্রিত হবে। তারপর উত্তরদিকের বায়ু প্রবাহিত হয়ে সেখানকার ধূলা-বালি তাদের মুখমণ্ডল ও পোশাক-পরিচ্ছদে লাগবে। এতে তাদের সৌন্দর্য আরো বেড়ে যাবে। তারপর তারা স্ব স্ব পরিবারের কাছে ফিরে আসবে। এসে দেখবে, তাদের সৌন্দর্যও বহু বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপর তাদের পরিবারের লোকেরা বলবে, আল্লাহর শপথ আমাদের নিকট হতে যাবার পর তোমাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তরে তারাও বলবে, আল্লাহর শপথ! তোমাদের শরীরের সৌন্দর্য তোমাদের নিকট থেকে যাবার পর বহুগুণে বেড়ে গেছে। (মুসলিম)
– এ যেন সৌন্দর্যের বাজার। দুনিয়ার বাজারে সৌন্দর্য পাওয়া যায় না। হ্যাঁ সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য বিভিন্ন প্রসাধনী, পোশাক পাওয়া যায়। যদিও সেসব জিনিস সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে পারে না। উলটা কখনো কখনো শরীরের ক্ষতি করে।
– ইমাম নববী লিখেছেন “জান্নাতের বাজার” বলতে ক্রয়-বিক্রয়ের বাজার বোঝানো হয়নি, (কেননা সেখানে ক্রয়বিক্রয়ের প্রয়োজন হবে না) বরং আল্লাহ তা‘আলা সেখানে জান্নাতীদের জন্য এক সমাবেশের ব্যবস্থা করবেন যেখানে তারা একত্র হবে। এটি তাদের জন্য আরও আনন্দ ভাগাভাগির ও মিলনস্থল হবে। সেখানে এক বিশেষ বাতাস তাদের উপর বয়ে যাবে, যা তাদের রূপ-সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে। (শারহে মুসলিম)
ইমাম কুরতুবী রহি. লিখেছেন, এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, জান্নাতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি অবিরাম চলতে থাকবে। জান্নাতীরা প্রতিনিয়ত নতুন রূপ-সৌন্দর্যে সজ্জিত হবে।
@ বৃদ্ধার সাথে কৌতুক
عَنِ الْحَسَنِ ، قَالَ : أَتَتْ عَجُوزٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَقَالَتْ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، ادْعُ اللَّهَ أَنْ يُدْخِلَنِي الْجَنَّةَ ، فَقَالَ : ” يَا أُمَّ فُلانٍ ، إِنَّ الْجَنَّةَ لا تَدْخُلُهَا عَجُوزٌ ” ، قَالَ : فَوَلَّتْ تَبْكِي , فَقَالَ : ” أَخْبِرُوهَا أَنَّهَا لا تَدْخُلُهَا وَهِيَ عَجُوزٌ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى , يَقُولُ : إِنَّا أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنْشَاءً ( 35 ) فَجَعَلْنَاهُنَّ أَبْكَارًا ( 36 ) عُرُبًا أَتْرَابًا
হাসান (রাঃ) হতে বর্ণিত। একবার এক বৃদ্ধা মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কাছে দু’আ করুন যেন আমি-জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। তিনি বললেন, ওহে! কোন বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। বর্ণনাকারী বলেন, (তা শুনে) সে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে এ মর্মে খবর দাও যে, তুমি বৃদ্ধাবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কারণ, আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “আমি তাদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি। আর তাদেরকে করেছি কুমারী— (সূরা ওয়াক্বিয়া- ৩৬)। [শামায়েলে তিরমিযী: ১৭৯]
@ আলোকিত চেহারা ও দুজন করে স্ত্রী
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ إِنَّ أَوَّلَ زُمْرَةٍ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ضَوْءُ وُجُوهِهِمْ عَلَى مِثْلِ ضَوْءِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ وَالزُّمْرَةُ الثَّانِيَةُ عَلَى مِثْلِ أَحْسَنِ كَوْكَبٍ دُرِّيٍّ فِي السَّمَاءِ لِكُلِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ زَوْجَتَانِ عَلَى كُلِّ زَوْجَةٍ سَبْعُونَ حُلَّةً يُرَى مُخُّ سَاقِهَا مِنْ وَرَائِهَا ” ..
আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেনঃ
“কিয়ামতের দিনে সর্বপ্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের মুখমণ্ডল হবে পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মতো উজ্জ্বল। দ্বিতীয় দল হবে আকাশে উদিত সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দীপ্তিমান। তাদের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য থাকবে দুইজন স্ত্রী; প্রত্যেক স্ত্রীর গায়ে থাকবে সত্তর জোড়া পোশাক, আর সেই পোশাকের ভিতর থেকে তার পায়ের মজ্জাও দেখা যাবে।” (তিরমিজি, সহীহ)
– পোশাকের ভিতর থেকে পায়ের মজ্জা দেখা যাওয়া – এই সৌন্দর্য দুনিয়ার মাপকাঠিতে মাপা যাবে না। দুনিয়ার সাধারণ বুঝ এতে খাটবে না, এটা ভিন্ন ধরনের সৌন্দর্য।
@ হুর
سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ لَوْ أَنَّ مَا يُقِلُّ ظُفُرٌ مِمَّا فِي الْجَنَّةِ بَدَا لَتَزَخْرَفَتْ لَهُ مَا بَيْنَ خَوَافِقِ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ وَلَوْ أَنَّ رَجُلاً مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ اطَّلَعَ فَبَدَا أَسَاوِرُهُ لَطَمَسَ ضَوْءَ الشَّمْسِ كَمَا تَطْمِسُ الشَّمْسُ ضَوْءَ النُّجُومِ
সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতে যা আছে এর থেকে একটি নখ যা উঠাতে পারে এতটুকু পরিমাণ জিনিসও যদি (লোকদের সামনে) প্রকাশ পেত তা হলে আকাশ ও পৃথিবীর সব দিক সুসজ্জিত হয়ে যেত। জান্নাতেবাসীদের কেউ যদি পৃথিবীর দিকে উঁকি দিত এবং তার কংকন যদি প্রতিভাত হত তাহলে সূর্যের আলো যেমন তারার আলোকে স্নান করে দেয় তেমনিভাবে তা সূর্যের আলোকেও স্নান করে দিত। (তিরমিজি, সহীহ)
وَلَوْ أَنَّ امْرَأَةً مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ اطَّلَعَتْ إِلَى أَهْلِ الأَرْضِ لَاضَاءَتْ مَا بَيْنَهُمَا وَلَمَلَاتْهُ رِيْحًا وَلَنَصِيْفُهَا عَلَى رَأْسِهَا خَيْرٌ مِنْ الدُّنْيَا وَمَا فِيْهَا
যদি জান্নাতী কোন মহিলা যমীনের অধিবাসীদের দিকে তাকাতো তবে আসমান ও যমীনের মাঝের অংশ আলোতে ভরপুর হয়ে যেত, সুগন্ধিতে ভরে দিত। এমনকি তার মাথাস্থিত। উড়না দুনিয়া ও তার মধ্যে যা আছে তা থেকে উত্তম।” [বুখারী: ২৭৯৬]
সঙ্গমের শক্তি
أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” يُعْطَى الْمُؤْمِنُ فِي الْجَنَّةِ قُوَّةَ كَذَا وَكَذَا مِنَ الْجِمَاعِ ” . قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَوَيُطِيقُ ذَلِكَ قَالَ ” يُعْطَى قُوَّةَ مِائَةٍ ”
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতে প্রত্যেক মুমিনকে এত এত সঙ্গম শক্তি দেওয়া হবে। বলা হয়ঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তা করতে সক্ষম হবে কি? তিনি বললেনঃ তাকে তো একশ’ জনের শক্তি দেওয়া হবে। (তিরমিজি, হাসান)
কুরআনে এসেছে
وَ حُوۡرٌ عِیۡنٌ ﴿ۙ۲۲﴾
আর তাদের জন্য থাকবে ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট হূর।
کَاَمۡثَالِ اللُّؤۡلُوَٴ الۡمَکۡنُوۡنِ
যেন তারা সুরক্ষিত মুক্তা(১),
অন্যত্র আল্লাহ্ বলেন, “মনে হয় যেন তারা সুরক্ষিত ডিম্ব।” [সূরা আস-সাফফাত: ৪৯]
আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন, “তারা যেন পদ্মরাগ ও প্রবাল।” [সূরা আর-রাহমান: ৫৭]
সুন্দর চোখ
হুর বলতে এমন চোখের অধিকারীকে বোঝায়, যাদের চোখের সাদা অংশ পুরোপুরি সাদা থাকে এবং কালো অংশ পুরোপুরি কালো থাকে অর্থাৎ চোখ সুন্দর থাকে।
পবিত্র
لاَ يَبْصُقُونَ فِيهَا وَلاَ يَمْتَخِطُونَ وَلاَ يَتَغَوَّطُونَ
রাসূল সা. তারা সেখানে থুথুও ফেলবে না, তাদের নাকের ময়লাও ঝাড়তে হবে না এবং পেশাব পায়খানাও করতে হবে না। (তিরমিজি, সহীহ)
দুনিয়ার স্ত্রীরা
– দুনিয়াতে যারা যাদের স্ত্রী ছিল তারা আখেরাতে তাদের স্বামীরা যদি জান্নাতে যায় তখন তারাও তাদের স্ত্রী হিসেবে থাকবে। এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী, “স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তানসন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকাজ করেছে তারাও, এবং ফিরিশতাগণ তাদের কাছে উপস্থিত হবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে,” [সূরা আর-রাদ: ২৩] সুতরাং তারা জান্নাতে পরস্পর আনন্দে বসবাস করবে। মহান আল্লাহ বলেন, “তারা এবং তাদের স্ত্রীগণ বলেন, “তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণগণ সানন্দে জান্নাতে প্ৰবেশ কর।” [সূরা আয-যুখরুফ: ৭০]
দুনিয়াতে যদি কোন মহিলা পরপর কয়েকজনের স্ত্রী ছিল, তারপর যদি সে সমস্ত পুরুষেরা সবাই জান্নাতে যায় এবং সবাই মহিলার জন্য সমপর্যায়ের হয়, তবে সে মহিলা তাদের মধ্যকার সর্বশেষ ব্যক্তিটির স্ত্রী হবে। স্বামীর জান্নাতে যাওয়ার কারণে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে, সে তার স্ত্রীর সাথে ভাল ব্যবহার করেছে। সুতরাং মহিলা তার সর্বশেষ যে স্বামীর সাথে ঘর করা অবস্থায় মারা গেছে তার সাথে সে জান্নাতে থাকবে। এর প্রমাণ রাসূল এর বাণী; তিনি বলেন, যে মহিলার স্বামী মারা যাওয়ার পরে অন্য স্বামী গ্ৰহণ করেছে সে তার সর্বশেষ স্বামীর সাথে জান্নাতে থাকবে। [ত্বাবরানী: আল-আওসাত: ৩/২৭৫, নং ৩১৩০, মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৪/২৭০] { তাফসীরে জাকারিয়া থেকে}
স্ত্রীদের কণ্ঠে গান
“إن أزواج أَهْلِ الْجَنَّةِ لَيُغَنِّينَ أَزْوَاجَهُنَّ بِأَحْسَنِ أَصْوَاتٍ سَمِعَهَا أحد قط، وإن مما يغنين: نحن الخالدات فلا نموت، نحن الآمنات فلا نخاف، نحن المقيمات فلا نظعن”.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “জান্নাতীদের স্ত্রীগণ (হুরগণও এতে শামিল) তারা এমন সুন্দর স্বরে গান ধরবে যা কোনদিন কেউ শুনেনি। তারা যা বলবে, “আমরা অনিন্দ সুন্দরী, সুশীলা, সন্মানিত লোকের স্ত্রী, যারা আমাদের দিকে চক্ষু শীতল করার জন্য তাকায়” তারা আরও বলবে, “আমরা চিরস্থায়ী সুতরাং আমরা কখনো মরবনা, আমরা নিরাপদ সুতরাং আমাদের ভয় নেই, আমরা স্থায়ী অধিবাসী সুতরাং আমরা চলে যাব না” [ আন নিহায়া ফিল ফিতান ওয়াল মালাহিম ২/৩৩৯, তাবরানী: মুজামুস সাগীর: ২/৩৫, নং: ৭৩৪, আল আওসাত: ৫/১৪৯, নং ৪৯১৭, মাজমাউয যাওয়ায়িদ; ১০/৪১৯]
হুরদের প্রতিবাদ
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: “لَا تُؤْذِي امْرَأَةٌ زَوْجَهَا إِلاَّ قَالَتْ زَوْجَتُهُ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ: ‘لَا تُؤْذِيهِ، قَاتَلَكِ اللَّهُ، فَإِنَّمَا هُوَ عِنْدَكِ دَخِيلٌ أَوْشَكَ أَنْ يُفَارِقَكِ إِلَيْنَا.'”
দুনিয়াতে কোন জান্নাতী পুরুষকে কোন নারী কষ্ট দিলে জান্নাতের হুরীরা সে জন্য কষ্ট অনুভব করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোন মহিলা যখনই কোন জান্নাতী পুরুষকে দুনিয়াতে কষ্ট দেয় তখনি তার জান্নাতী হুর স্ত্রী বলতে থাকে, “তোমার ধ্বংস হোক, তুমি তাকে কষ্ট দিও না, সে তো তোমার কাছে সাময়িক অবস্থান করছে, অচিরেই সে তোমাকে ছেড়ে আমাদের নিকট চলে আসবে”। [তিরমিযী: ১১৭৪, ইবনে মাজাহ: ২০১৪]
কুমারী, প্রেমময়ী, সমবয়স্কা
اِنَّاۤ اَنۡشَاۡنٰهُنَّ اِنۡشَآءً
নিশ্চয় আমি হূরদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করব।
فَجَعَلۡنٰهُنَّ اَبۡکَارًا
আর তাদেরকে করেছি কুমারী, -(তাইসিরুল)
উদ্দেশ্য এই যে, জান্নাতের নারীদেরকে কুমারী করে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদেরকে কেউ কখনো স্পর্শ করেনি। অথবা তাদেরকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হবে যে, প্রত্যেক সঙ্গম-সহবাসের পর তারা আবার কুমারী হয়ে যাবে। [কুরতুবী]
عُرُبًا اَتۡرَابًا ﴿ۙ۳۷﴾
প্রেমময়ী ও সমবয়স্কা।
এখানে عرب শব্দটি عروبة এর বহুবচন। অর্থ স্বামী সোহাগিনী ও প্রেমিকা নারী। আরবী ভাষায় এ শব্দটি মেয়েদের সর্বোত্তম মেয়েসুলভ গুণাবলী বুঝাতে বলা হয়। এ শব্দ দ্বারা এমন মেয়েদের বুঝানো হয় যারা কামনীয় স্বভাব ও বিনীত আচরণের অধিকারিনী, সদালাপী, নারীসুলভ আবেগ অনুভূতি সমৃদ্ধা, মনে প্রাণে স্বামীগত প্রাণ এবং স্বামীও যার প্রতি অনুরাগী। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]
আর أتراب শব্দটি ترب এর বহুবচন। অর্থ সমবয়স্ক। এর দুটি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হচ্ছে তারা তাদের স্বামীদের সমবয়সী হবে। অন্য অর্থটি হচ্ছে, তারা পরস্পর সমবয়স্ক হবে। অর্থাৎ জান্নাতের সমস্ত মেয়েদের একই বয়স হবে এবং চিরদিন সেই বয়সেরই থাকবে। যুগপৎ এ দু’টি অর্থই সঠিক হওয়া অসম্ভব নয়। অর্থাৎ এসব জান্নাতী নারী পরস্পরও সমবয়সী হবে এবং তাদের স্বামীদেরকেও তাদের সমবয়সী বানিয়ে দেয়া হবে। [ইবন কাসীর] “ তাফসীরে জাকারিয়া
فِیۡهِنَّ قٰصِرٰتُ الطَّرۡفِ ۙ لَمۡ یَطۡمِثۡهُنَّ اِنۡسٌ قَبۡلَهُمۡ وَ لَا جَآنٌّ ﴿ۚ
সেসবের মাঝে রয়েছে বহু আনত নয়না, যাদেরকে আগে কোন মানুষ অথবা জিন সম্পর্শ করেনি। (আর রহমান)
– যেসব নারী মানুষের জন্যে নির্ধারিত তাদেরকে ইতিপূর্বে কোন মানুষ এবং যেসব নারী জিনদের জন্য নির্ধারিত তাদেরকে ইতিপূর্বে কোন জিন স্পর্শ করেনি। কুরতুবী, যাকারিয়া
کَاَنَّهُنَّ الۡیَاقُوۡتُ وَ الۡمَرۡجَانُ
তারা যেন পদ্মরাগ ও প্রবাল।
کَاَنَّهُنَّ بَیۡضٌ مَّکۡنُوۡنٌ
তারা যেন সুরক্ষিত ডিম্ব।(১)
@ খাদ্য, ফল
وَ بَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَهُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِهَا الۡاَنۡهٰرُ ؕ کُلَّمَا رُزِقُوۡا مِنۡهَا مِنۡ ثَمَرَۃٍ رِّزۡقًا ۙ قَالُوۡا هٰذَا الَّذِیۡ رُزِقۡنَا مِنۡ قَبۡلُ ۙ وَ اُتُوۡا بِهٖ مُتَشَابِهًا ؕ وَ لَهُمۡ فِیۡهَاۤ اَزۡوَاجٌ مُّطَهَّرَۃٌ ٭ۙ وَّ هُمۡ فِیۡهَا خٰلِدُوۡنَ
আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদেরকে শুভ সংবাদ দিন যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। যখনই তাদেরকে ফলমূল খেতে দেয়া হবে তখনই তারা বলবে, আমাদেরকে – পূর্বে জীবিকা হিসেবে যা দেয়া হত এতো তাই’। আর তাদেরকে তা দেয়া হবে সাদৃশ্যপূর্ণ করেই এবং সেখানে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্র সঙ্গিনী। আর তারা সেখানে স্থায়ী হবে। (বাকারা ২৫)
– জান্নাতের তলদেশে নদী প্রবাহিত’ বলে এটাই বোঝানো হয়েছে যে, এর গাছের নীচ দিয়ে ও এর কামরাসমূহের নীচ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জান্নাতের নদী-নালাসমূহ মিশকের পাহাড় থেকে নির্গত। [সহীহ ইবনে হিব্বান: ৭৪০৮] আনাস ও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত যে, ‘জান্নাতের নহরসমূহ খাদ হয়ে প্রবাহিত হবে না। [সহীহুত তারগীব] অন্য বর্ণনায় এসেছে, হাউজে কাউসারের দুই তীর লালা-মোতির গড়া বিরাট গম্বুজ বিশিষ্ট হবে। [বুখারী: ৬৫৮১] আর তার মাটি হবে মিশকের সুগন্ধে ভরপুর। তার পথে বিছানো কাঁকরগুলো হলো লাল-জহরত, পান্না-চুন্নি সদৃশ। [ইবনে কাসীর] {তাফসিরে যাকারিয়া}
– কোন কোন মুফাসসিরীনে কিরাম লিখেছেন, দুনিয়ায় আমরা যে সমস্ত ফল খাই, দেখতে অনুরূপ ফল জান্নাতেও পাওয়া যাবে। তখন মুমিনগণ বলবে এই ফল তো আমরা পূর্বে খেয়েছি। আসলে সেগুলো দেখতে দুনিয়ার ফলের মত হলেও স্বাদে এর চেয়ে অনেক ব্যাতিক্রম হবে।
(আবু হাতিম, তাবারী)
– জান্নাতের স্ত্রীলোকগণ দেহগত অপবিত্রতা থেকে মুক্ত থাকবে, যেমন—ঋতুস্রাব, প্রস্রাব-পায়খানা নেই, থুতু, নাকের ময়লা, দুর্গন্ধ।
চরিত্রগত অপবিত্রতা থেকেও মুক্ত থাকবে। তারা কখনো রাগ-অভিমান বা খারাপ ব্যবহার করবে না। জান্নাতের স্ত্রীলোকরা হাসি-খুশি, সুন্দর, ভদ্র-স্বভাবের হবেন, আর তাদের মধ্যে ঈর্ষা ও কটুবাক্য থাকবে না। (তাফসিরে সাইদ বিন যুবায়ের, কুরতুবী, ইবনে কাসির)
ফল ফলাদি নাগালের ভেতরেই থাকবে
قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ
যার ফলরাশি অবনমিত থাকবে নাগালের মধ্যে। (হাক্কাহ ২৩)
– এখানে “دَانِيَةٌ” শব্দের অর্থ হলো—“নিকটবর্তী, সহজলভ্য”। জান্নাতের ফলসমূহ ডাল থেকে এমনভাবে ঝুলে থাকবে যে, জান্নাতবাসীরা বসা, শোয়া বা দাঁড়ানো যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, সর্বাবস্থায় তা নাগালের মধ্যে থাকবে। (ইবনে কাসির, কুরতুবী)
– আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতের নিয়ামতসমূহকে নিকটবর্তী করে দেবেন। জান্নাতবাসীদের খাটুনি, শ্রম বা কোনো পরিশ্রম করতে হবে না। সামান্য ইশারা বা ইচ্ছাতেই ফল তাদের কাছে চলে আসবে। (তাফসীর আস-সা‘দী)
প্রথম খাবার
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” تَكُونُ الأَرْضُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ خُبْزَةً وَاحِدَةً يَكْفَؤُهَا الْجَبَّارُ بِيَدِهِ كَمَا يَكْفَأُ أَحَدُكُمْ خُبْزَتَهُ فِي السَّفَرِ نُزُلاً لأَهْلِ الْجَنَّةِ ” . قَالَ فَأَتَى رَجُلٌ مِنَ الْيَهُودِ فَقَالَ بَارَكَ الرَّحْمَنُ عَلَيْكَ أَبَا الْقَاسِمِ أَلاَ أُخْبِرُكَ بِنُزُلِ أَهْلِ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ قَالَ ” بَلَى ” . قَالَ تَكُونُ الأَرْضُ خُبْزَةً وَاحِدَةً – كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم – قَالَ فَنَظَرَ إِلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ ضَحِكَ حَتَّى بَدَتْ نَوَاجِذُهُ قَالَ أَلاَ أُخْبِرُكَ بِإِدَامِهِمْ قَالَ ” بَلَى ” . قَالَ إِدَامُهُمْ بَالاَمُ وَنُونٌ . قَالُوا وَمَا هَذَا قَالَ ثَوْرٌ وَنُونٌ يَأْكُلُ مِنْ زَائِدَةِ كَبِدِهِمَا سَبْعُونَ أَلْفًا
আবু সাঈদ আল খুদরী (রাযিঃ) এর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সমস্ত ভূখণ্ড কিয়ামতের দিন একটি রুটির মতো হয়ে যাবে। আল্লাহ সেটি নিজ হাতে এপাশ-ওপাশ করবেন, যেমন তোমাদের মাঝে কেউ সফরের সময় নিজ রুটি এপাশ-ওপাশ করে। এ দিয়ে হবে জান্নাতবাসীর জন্য আতিথেয়তা। এমন সময় এক ইয়াহুদী লোক এসে বলল, হে আবুল কাসিম! রহমান আপনার প্রতি বারাকাত দান করুন। কিয়ামতের দিন জান্নাতবাসীদের আতিথেয়তা সম্পর্কে আপনাকে জানাব কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। ইয়াহুদী বলল, এ পৃথিবীটি একটি রুটির রূপ ধারণ করবে, যেমন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন। রাবী বলেন, তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে লক্ষ্য করে এমনভাবে হেসে দিলেন যে, তার মাড়ির মুবারক দাঁত প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল। ইয়াহুদী বলল, তাদের তরকারি কি হবে তা কি আপনাকে বলব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সে বলল, বালাম এবং নূন। সাহাবাগণ প্রশ্ন করলেন, তা কি? সে বলল, ষাড় এবং মাছ- যাদের কলিজার বাড়তি অংশ থেকে সত্তর হাজার লোক আহার করতে পারবে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৮০০, ইসলামিক সেন্টার ৬৮৫৪)
@ পানীয়
হাওজে কাওসার
أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ بَيْنَمَا أَنَا أَسِيرُ فِي الْجَنَّةِ إِذَا أَنَا بِنَهَرٍ حَافَتَاهُ قِبَابُ الدُّرِّ الْمُجَوَّفِ قُلْتُ مَا هَذَا يَا جِبْرِيلُ قَالَ هَذَا الْكَوْثَرُ الَّذِي أَعْطَاكَ رَبُّكَ فَإِذَا طِينُهُ أَوْ طِيبُهُ مِسْكٌ أَذْفَرُ شَكَّ هُدْبَةُ
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ আমি জান্নাতে ভ্রমণ করছিলাম, এমন সময় এক ঝর্ণার কাছে এলে দেখি যে তার দু’ধারে ফাঁপা মুক্তার গম্বুজ রয়েছে। আমি বললাম, হে জিবরীল! এটা কী? তিনি বললেন, এটা ঐ কাউসার যা আপনার প্রতিপালক আপনাকে দান করেছেন। তার ঘ্রাণে অথবা মাটিতে ছিল উত্তম মানের মিশক এর সুগন্ধি। হুদ্বা (রহ.) সন্দেহ করেছেন। (বুখারী)
– ইমাম ইবনু কাসীর ও অন্যান্য মুফাসসিরগণ বলেন যে, কাউসার হলো একটি জান্নাতের নদী, যা আল্লাহ তা’আলা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বিশেষ সম্মান হিসেবে দান করেছেন। এই নদী থেকে একটি হাউজ বা জলাধার প্রবাহিত হবে, যা কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মতের জন্য থাকবে। সেই হাউজটি থেকে তাঁরা পানি পান করবেন।
عَنْ أَبِي ذَرٍّ، قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا آنِيَةُ الْحَوْضِ قَالَ “ وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لآنِيَتُهُ أَكْثَرُ مِنْ عَدَدِ نُجُومِ السَّمَاءِ وَكَوَاكِبِهَا أَلاَ فِي اللَّيْلَةِ الْمُظْلِمَةِ الْمُصْحِيَةِ آنِيَةُ الْجَنَّةِ مَنْ شَرِبَ مِنْهَا لَمْ يَظْمَأْ آخِرَ مَا عَلَيْهِ يَشْخُبُ فِيهِ مِيزَابَانِ مِنَ الْجَنَّةِ مَنْ شَرِبَ مِنْهُ لَمْ يَظْمَأْ عَرْضُهُ مِثْلُ طُولِهِ مَا بَيْنَ عَمَّانَ إِلَى أَيْلَةَ مَاؤُهُ أَشَدُّ بَيَاضًا مِنَ اللَّبَنِ وَأَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ ”
عَنْ أَبِي ذَرٍّ، قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا آنِيَةُ الْحَوْضِ قَالَ “ وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لآنِيَتُهُ أَكْثَرُ مِنْ عَدَدِ نُجُومِ السَّمَاءِ وَكَوَاكِبِهَا أَلاَ فِي اللَّيْلَةِ الْمُظْلِمَةِ الْمُصْحِيَةِ آنِيَةُ الْجَنَّةِ مَنْ شَرِبَ مِنْهَا لَمْ يَظْمَأْ آخِرَ مَا عَلَيْهِ يَشْخُبُ فِيهِ مِيزَابَانِ مِنَ الْجَنَّةِ مَنْ شَرِبَ مِنْهُ لَمْ يَظْمَأْ عَرْضُهُ مِثْلُ طُولِهِ مَا بَيْنَ عَمَّانَ إِلَى أَيْلَةَ مَاؤُهُ أَشَدُّ بَيَاضًا مِنَ اللَّبَنِ وَأَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ ” .
আবু যার গিফারী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করেছি, হে আল্লাহর রসূল! হাওযের পাত্র কত হবে? তিনি বললেন, যার কবজায় আমার জীবন তার শপথ! সে হাওযের পাত্র মেঘবিহীন আঁধার রাতের আকাশের নক্ষত্র ও তারকারাজির চাইতেও বেশী। সে সব পাত্র জান্নাতেরই পাত্র। যে ঐ পাত্র হতে পান করবে শেষ পর্যন্ত আর তৃষ্ণার্ত হবে না। ঐ হাওযের মধ্যে জান্নাত হতে প্রবাহিত দু’টো নালার সংমিশ্রণ রয়েছে। যে লোক ঐ হাওয হতে পান করবে সে আর তৃষ্ণার্ত হবে না, সে হাওযের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান হবে। সে হাওযের প্রশস্থতা আম্মান থেকে আয়লার মাঝামাঝি ব্যবধানের সমতুল্য। তার পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও বেশি মিষ্ট। (মুসলিম)
৪টি নদি/সমুদ্র
مَثَلُ الۡجَنَّۃِ الَّتِیۡ وُعِدَ الۡمُتَّقُوۡنَ ؕ فِیۡهَاۤ اَنۡهٰرٌ مِّنۡ مَّآءٍ غَیۡرِ اٰسِنٍ ۚ وَ اَنۡهٰرٌ مِّنۡ لَّبَنٍ لَّمۡ یَتَغَیَّرۡ طَعۡمُهٗ ۚ وَ اَنۡهٰرٌ مِّنۡ خَمۡرٍ لَّذَّۃٍ لِّلشّٰرِبِیۡنَ ۬ۚ وَ اَنۡهٰرٌ مِّنۡ عَسَلٍ مُّصَفًّی ؕ وَ لَهُمۡ فِیۡهَا مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ …
মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত: তাতে আছে নির্মল পানির নহরসমূহ, আছে দুধের নহরসমূহ যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু মদের নহরসমূহ, আছে পরিশোধিত মধুর নহরসমূহ। এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে প্রত্যেক প্রকারের ফলমূল।
عَنْ حَكِيمِ بْنِ مُعَاوِيَةَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: ⦗٨٩⦘ «فِي الْجَنَّةِ بَحْرُ اللَّبَنِ، وَبَحْرُ الْعَسَلِ، وَبَحْرُ الْمَاءِ، وَبَحْرُ الْخَمْرِ، ثُمَّ تَشَقَّقُ الْأَنْهَارُ مِنْهَا بَعْدُ»
হাকিম বিন মুয়াবিয়া তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“জান্নাতে দুধের সমুদ্র, মধুর সমুদ্র, পানির সমুদ্র এবং মদের সমুদ্র রয়েছে। এরপর সেখান থেকে নদীগুলো প্রবাহিত হয়।”
(মুসনাদে আহমাদ, হাসান ইনদা শুয়াইব আরনাউত)
পবিত্র মদ
لَّا یُصَدَّعُوۡنَ عَنۡهَا وَ لَا یُنۡزِفُوۡنَ
তা পানে না তাদের মাথা ব্যথা করবে, আর না তারা মাতাল হবে। (ওয়াকিয়া)
صُدَاعٌ এমন মাথা ব্যথাকে বলে, যা মদের নেশা ও মাদকতার কারণে হয়ে থাকে। إِنْزِافٌ এমন জ্ঞানশূন্যতা যা নেশাগ্রস্ততার ফলে হয়ে থাকে। পার্থিব মদ পানে এই উভয় ক্ষতিই ঘটে থাকে। পক্ষান্তরে পরকালের শারাব বা সুরাপানে আনন্দ ও তৃপ্তি তো অবশ্যই হবে, কিন্তু এসব মন্দ জিনিসের কোন কিছুই ঘটবে না। (তাফসীরে
জাকারিয়া)
নদিগুলোর উৎস
الْجَنَّةُ مِائَةُ دَرَجَةٍ مَا بَيْنَ كُلِّ دَرَجَتَيْنِ مَسِيرَةُ مِائَةِ عَامٍ، وَالْفِرْدَوْسُ أَعْلَاهَا دَرَجَةً، وَمِنْهَا تَخْرُجُ الْأَنْهَارُ الْأَرْبَعَةُ، وَالْعَرْشُ فَوْقَهَا، فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ فَاسْأَلُوهُ الْفِرْدَوْسَ»
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“জান্নাতে একশোটি স্তর রয়েছে। প্রতিটি স্তরের মধ্যে দূরত্ব হলো একশো বছরের পথসমান। এর মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর হলো ফিরদাউস। সেখান থেকেই জান্নাতের চারটি নদী প্রবাহিত হয়, আর তার উপরে রয়েছে আরশ। তাই তোমরা যখন আল্লাহ্র কাছে জান্নাত প্রার্থনা করবে, তখন ফিরদাউসই প্রার্থনা করো।” (মুসনাদে আহমাদ, সহীহ ইনদাল আলবানী)
– আল্লাহর কাছে চাওয়ার সময় বড়টাই চাইতে হয়, একদম সর্বোচ্চ পর্যায়েরটা এবং সবচেয়ে বেশিটা টাকাও উচিৎ। দুনিয়ার বিষয়টা ব্যতিক্রম। দুনিয়ায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চাওয়া ঠিক না।
অনেকে আছে আল্লাহতালার কাছে কম চায়। কেউ কেউ আল্লাহ তায়ালাকে বিনিময়ে অফার করে। ইতিহাসের বইয়ে আছে, মোঘল বাদশাহ বাবরের ছেলে হুমায়ুন অসুস্থ হয়ে মুমূর্ষ অবস্থায় উপনীত হন। বাবর তখম হুমায়ুনের জন্য আল্লাহর কাছে হায়াত চেয়েছিলেন, তিনি এভাবে দোয়া করেছিলেন “হে আল্লাহ! আমার জীবনের বিনিময়ে তুমি হুমায়ুনকে জীবন দান করো।” আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া সেভাবেই কবুল করেন। কিছুদিন পরে বাদশাহ বাবর মারা যান এবং হুমায়ুন সুস্থ হয়ে ওঠে।
বাবর এমনিতেই আল্লাহর কাছে হুমায়ুনের জীবন প্রার্থনা করতে পারতেন। নিজের জীবনের বিনিময়ে প্রার্থনা করার প্রয়োজন ছিল না।
আল্লাহ তায়ালাকে এভাবে বিনিময় অফার করা অনুত্তম। যদি কোন সন্তান ক্ষুধার্ত হয়ে মায়ের কাছে এক প্লেট ভাত চায় এবং এর বিনিময়ে টাকা অফার করে। এটা মায়ের অপমান।
ইউসুফ আলাইহিস সালাম জুলাইখার চক্রান্ত থেকে বাঁচার জন্য দোয়া করেছিলেন
رَبِّ السِّجۡنُ اَحَبُّ اِلَیَّ مِمَّا یَدۡعُوۡنَنِیۡۤ اِلَیۡهِ
“হে আমার রব! এ নারীরা আমাকে যার দিকে ডাকছে তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে বেশী প্রিয়।”
আল্লাহ তায়ালা সেভাবেই দোয়া কবুল করেছিলেন। ইউসুফ আলাইহিস ওয়াসাল্লাম জেল খেটেছেন। মুফাসসিরীনে কেরাম লিখেছেন, ইউসুফ আলাইহিস সালাম যদি জেলের শর্ত ব্যতীত দোয়া করতেন, সম্ভবত সেভাবেই দোয়া কবুল হতো।
দুনিয়ার সাথে তুলনা
وَلَقَابُ قَوْسِ أَحَدِكُمْ مِنْ الْجَنَّةِ أَوْ مَوْضِعُ قِيْدٍ يَعْنِيْ سَوْطَهُ خَيْرٌ مِنْ الدُّنْيَا وَمَا فِيْهَا
তোমাদের কারোর ধনুকের কিংবা চাবুক রাখার মত জান্নাতের জায়গাটুকু দুনিয়া ও এর সব কিছু থেকে উত্তম। (বুখারী ২৭৯৬)
বৃক্ষরাজি
وَّ ظِلٍّ مَّمۡدُوۡدٍ
আর সম্প্রসারিত ছায়া
বিশাল বৃক্ষরাজি
أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِنَّ فِي الْجَنَّةِ لَشَجَرَةً يَسِيْرُ الرَّاكِبُ فِيْ ظِلِّهَا مِائَةَ عَامٍ لَا يَقْطَعُهَا
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন সব গাছ আছে, যার ছায়ায় কোন আরোহী শত বছর পর্যন্ত চললেও তা অতিক্রম করতে পারবে না। (বুখারী)
স্বর্ণের কাণ্ড
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ مَا فِي الْجَنَّةِ شَجَرَةٌ إِلاَّ وَسَاقُهَا مِنْ ذَهَبٍ ”
জান্নাতে যে সব গাছ আছে সেগুলোর কাণ্ড- হল স্বর্ণের। (তিরমিজি ২৫২৭, সহীহ)
কাঁটাবিহীন বরই
@ فِیۡ سِدۡرٍ مَّخۡضُوۡدٍ ﴿ۙ۲۸﴾
তারা থাকবে কাঁটা বিহীন বরই গাছগুলোর মাঝে, -(তাইসিরুল)
হাদীসে এসেছে, এক বেদুঈন এসে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনে একটি কষ্টদায়ক গাছের কথা উল্লেখ করেছেন। আমি মনে করিনি যে, জান্নাতে কষ্ট দায়ক কিছু থাকবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেটা কি? বেদুঈন বলল: বরই। কেননা তাতে কাঁটা রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সেটা হবে কাটাহীন বরই গাছ। প্রতিটি কাটার জায়গায় একটি করে ফল থাকবে। এটা শুধু ফলই উৎপাদন করবে। ফলের সাথে বাহাত্তরটি বাহারী রং থাকবে যার এক রং অন্য রংয়ের সাথে সাদৃশ্য রাখবে না।” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৪৭৬]
وَّ طَلۡحٍ مَّنۡضُوۡدٍ
এবং কাদি ভরা কলা গাছ
@ দিদার
قَالَ ” إِذَا دَخَلَ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ نَادَى مُنَادٍ إِنَّ لَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ مَوْعِدًا . قَالُوا أَلَمْ يُبَيِّضْ وُجُوهَنَا وَيُنَجِّنَا مِنَ النَّارِ وَيُدْخِلْنَا الْجَنَّةَ قَالُوا بَلَى . قَالَ فَيُكْشَفُ الْحِجَابُ قَالَ فَوَاللَّهِ مَا أَعْطَاهُمْ شَيْئًا أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِنَ النَّظَرِ إِلَيْهِ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে দাখিল হয়ে যাবে তখন এক আহবানকারী হেঁকে বলবেঃ আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য আরো ওয়াদা রয়েছে।
জান্নাতীরা বলবেঃ তিনি কি আমাদের চেহারা সমুজ্জ্বল করে দেন নি? আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে নাজাত দেননি এবং জান্নাতে দাখিল করেননি? আহ্বানকারী বলবেঃ অবশ্যই। অনন্তর (আল্লাহর দীদারের জন্য) পর্দা তুলে দেওয়া হবে। আল্লাহর কসম, আল্লাহর দীদার অপেক্ষা প্রিয় আর কোন জিনিস তিনি তাদের দিবেন না। (তিরমিজি, সহীহ)
@ বসা
مُّتَّکِـِٕیۡنَ عَلَیۡهَا مُتَقٰبِلِیۡنَ
তারা হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখোমুখি হয়ে।(ওয়াকিয়া)
– জান্নাতে তো আর কোন কাজ নেই, দেখা যাবে মানুষ বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে। সে সময় কি তাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হবে? না, হবে না। কেন? উত্তর আছে নিচের আয়াতে।
وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَىٰ سُرُرٍ مُّتَقَابِلِينَ
আর আমি তাদের অন্তর হতে বিদ্বেষ দূর করব। তারা ভাইয়ের মত পরস্পর মুখোমুখি হয়ে আসনে অবস্থান করবে। (হিজর ৪৭)
– জান্নাতে ঢোকার পর আল্লাহ জান্নাতীদের অন্তর থেকে সব ধরনের হিংসা, বিদ্বেষ, কুচিন্তা দূর করে দেবেন। ফলে তারা হবে একাত্ম, ভাই ভাই, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসায় পূর্ণ।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “মু’মিনদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়ার পর তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে পুল/সিরাতের কাছে আটকানো হবে। সেখানে দুনিয়াতে তাদের একজন অপরজনের উপর যে সমস্ত অত্যাচার করেছে সেগুলোর কেসাস নেয়া হবে। তারপর যখন তারা সম্পূর্ণভাবে সাফ ও স্বচ্ছ হয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাতে ঢুকার অনুমতি দেয়া হবে। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, তাদের প্রত্যেকে দুনিয়ায় তাদের অবস্থানস্থলের চেয়েও বেশী ভালোভাবে জান্নাতে তাদের অবস্থানস্থলের পথ পেয়ে যাবে।” [বুখারীঃ ৬৫৩৫]
لاَ اخْتِلاَفَ بَيْنَهُمْ وَلاَ تَبَاغُضَ قُلُوبُهُمْ قَلْبُ رَجُلٍ وَاحِدٍ
রাসূল সেখানে তাদের পরস্পর কোন মতবিরোধ ও হিংসা থাকবে না। সকলের হৃদয় হবে যেন একজনেরই হৃদয়। (তিরমিজি, সহীহ)
তাদের আসন সম্পর্কে বলা হয়েছে।
عَلٰی سُرُرٍ مَّوۡضُوۡنَۃٍ
স্বর্ণ- ও দামী পাথর খচিত আসনে, (ওয়াকিয়া)
@ উৎফুল্লতা
فَوَقٰهُمُ اللّٰهُ شَرَّ ذٰلِکَ الۡیَوۡمِ وَ لَقّٰهُمۡ نَضۡرَۃً وَّ سُرُوۡرًا
পরিণামে আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করবেন সে দিনের অনিষ্ট হতে এবং তাদেরকে প্ৰদান করবেন হাস্যোজ্জ্বলতা ও উৎফুল্লতা।(১) (ইনসান/দাহর)
@ আবহাওয়া
لَا یَرَوۡنَ فِیۡهَا شَمۡسًا وَّ لَا زَمۡهَرِیۡرًا
তারা সেখানে খুব গরম অথবা খুব শীত দেখবে না।
– কারণ খুব গরম ও খুব শীত তো জাহান্নাম থেকে নিৰ্গত হয়। জান্নাতবাসীরা সেটা কোনক্রমেই পাবে না। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “জাহান্নাম তার রবের কাছে অভিযোগ করল যে, হে রব! আমার একাংশ (গরম অংশ) অপর অংশ (ঠাণ্ডা অংশ)কে শেষ করে দিল। তখন তাকে দুটি নিঃশ্বাস ফেলার অনুমতি দেয়া হলো। একটি শীতকালে অপরটি গ্ৰীষ্মকালে। সেটাই তা তোমরা কঠিন গরম আকারে গ্ৰীষ্মকালে পাও এবং কঠিন শীত আকারে শীতকালে অনুভব করা।” [বুখারী: ৩২৬০, মুসলিম: ৬১৭] তাফসিরে যাকারিয়া থেকে
– নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশ। দুনিয়াতে এমন কিছু দিন প্রতিবছরই আমরা দেখি, যেদিন আবহাওয়া খুব সুন্দর থাকে। গরমও না, ঠান্ডাও না। জান্নাতে সেটা সব সময় থাকবে।
@ অভূতপূর্ব
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ اللهُ أَعْدَدْتُ لِعِبَادِي الصَّالِحِيْنَ مَا لَا عَيْنٌ رَأَتْ وَلَا أُذُنٌ سَمِعَتْ وَلَا خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ – فَاقْرَءُوْا إِنْ شِئْتُمْ فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ-
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন: “আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন সব জিনিস প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরে তার কল্পনাও উদয় হয়নি।”
এরপর তিনি বলেন, “তোমরা চাইলে এই আয়াতটি পাঠ করতে পারো: ‘কেউ জানে না তাদের জন্য কী কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, যা তাদের চোখ জুড়িয়ে দেবে’।”
(সহীহ বুখারী)
কুরতুবী (রহ.) লিখেছেন, এ হাদিস ও আয়াত প্রমাণ করে যে জান্নাতের নিয়ামত আমাদের জানা সব কিছুর বাইরে। তাই দুনিয়াতে জান্নাতের বর্ণনা যতই দেওয়া হোক, তা কেবল আনুমানিক উদাহরণ; বাস্তবে তা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আরও শ্রেষ্ঠ। (আল মুফহিম)
ইমাম ত্বিবী (রহ.) লিখেছেন, হাদিসটি জান্নাতের নিয়ামতের পরিপূর্ণ গোপনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে। মানুষকে শুধু আকর্ষণ ও প্রেরণার জন্য কিছু বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার আসল রূপ আল্লাহই জানেন। (শারহে মেশকাত)
@ স্থায়িত্ব
مَنْ يَدْخُلْهَا يَنْعَمْ وَلاَ يَبْأَسْ – وَيُخَلَّدْ وَلاَ يَمُوتْ لاَ تَبْلَى ثِيَابُهُمْ وَلاَ يَفْنَى شَبَابُهُمْ
রাসূল সা. বলেন, জান্নাতে প্রবেশকারীগণ অত্যন্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দে থাকবে, কোন দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন তাদের স্পর্শ করবে না। তারা অনন্তকাল এতে অবস্থান করবে, মৃত্যুবরণ করবে না। না তার পরনের পোশাক পুরাতন হবে আর না তার যৌবন শেষ হবে (তিরমিজি সহীহ)
فَإِذَا أَدْخَلَ اللَّهُ أَهْلَ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ وَأَهْلَ النَّارِ النَّارَ قَالَ أُتِيَ بِالْمَوْتِ مُلَبَّبًا فَيُوقَفُ عَلَى السُّورِ الَّذِي بَيْنَ أَهْلِ الْجَنَّةِ وَأَهْلِ النَّارِ ثُمَّ يُقَالُ يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ . فَيَطَّلِعُونَ خَائِفِينَ ثُمَّ يُقَالُ يَا أَهْلَ النَّارِ . فَيَطَّلِعُونَ مُسْتَبْشِرِينَ يَرْجُونَ الشَّفَاعَةَ فَيُقَالُ لأَهْلِ الْجَنَّةِ وَأَهْلِ النَّارِ هَلْ تَعْرِفُونَ هَذَا فَيَقُولُونَ هَؤُلاَءِ وَهَؤُلاَءِ قَدْ عَرَفْنَاهُ هُوَ الْمَوْتُ الَّذِي وُكِّلَ بِنَا . فَيُضْجَعُ فَيُذْبَحُ ذَبْحًا عَلَى السُّورِ الَّذِي بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ ثُمَّ يُقَالُ يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ خُلُودٌ لاَ مَوْتَ وَيَا أَهْلَ النَّارِ خُلُودٌ لاَ مَوْتَ ”
রাসূল সা. বলেন, আল্লাহ্ তা’আলা জান্নাতীদেরকে জান্নাতে এবং জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে দাখিল করে দিবেন। তখন মওতকে গলায় কাপড় বেঁধে টেনে নিয়ে আসা হবে এবং জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীদের মাঝে অবস্থিত প্রাচীরে সেটিকে রাখা হবে। পরে ডাক দেয়া হবে। হে জান্নাতবাসীগণ! তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে নিজ নিজ আবাস থেকে বের হয়ে আসবে। পরে ডাক দেয়া হবে, হে জাহান্নামবাসীগণ! তারা শাফাআতের আশায় আশান্বিত হয়ে খুশীতে নিজ নিজ আবাস থেকে বের হয়ে আসবে। যা হোক, পরে জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীদের বলা হবেঃ তোমরা এটাকে চিন?
এরা ওরা সবাই বলবেঃ আমরা একে চিনেছি। এ-ই হল মৃত্যু যা আমাদের উপর ন্যাস্ত করে দেওয়া হয়েছে। পরে এটি শোয়ানো হবে এবং ঐ প্রাচীরের উপর এটিকে যবেহ করে দেওয়া হবে। এরপর বলা হবেঃ হে জান্নাতবাসীগণ! অনন্তকালের জন্য হল তোমাদের এই জান্নাত, মৃত্যু নেই আর। হে জাহান্নামবাসীগণ! অনন্তকালের জন্য হল তোমাদের এই জাহান্নাম, মৃত্যু নেই আর। (তিরমিজি, সহীহ)
فَلَوْ أَنَّ أَحَدًا مَاتَ فَرَحًا لَمَاتَ أَهْلُ الْجَنَّةِ وَلَوْ أَنَّ أَحَدًا مَاتَ حَزَنًا لَمَاتَ أَهْلُ النَّارِ ”
কেউ যদি আনন্দে মারা যেত তবে জান্নাতবাসীরা (তা দেখে খুশীতে) অবশ্যই মারা যেত। আর দুঃখে যদি কেউ মারা যেত তবে জাহান্নামীরা (তা দেখে দুঃখে) অবশ্যই মারা যেত। (তিরমিজি, সহীহ)
লিখন: উমর ফারূক তাসলিম