জালিমের প্রতি ফেসবুকের পক্ষপাত ও আমাদের করণীয়

আমরা দূর্বল। বাহুবলের দিক থেকেও, ঈমানের দিক থেকেও। মাজলুমকে রক্ষায় আমাদের কোনো ভূমিকা রাখা সম্ভব হয় না৷ মাঝেমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় দুএকটা কথা লিখি দু:খ ভাগাভাগি করতে। কিন্তু ওই জালেমরা আমাদের সেই অধিকারটুকুও দিতে চায় না।

একদিকে ওদের মারণাস্ত্র মুসলিমদের উপর গণহত্যা চালায়। অপরদিকে মেইনস্ট্রিম ও সোশ্যাল মিডিয়া মাজলুমের আর্তচিৎকার গলাটিপে দাবিয়ে রাখার কাজ করে যায়। 

অফলাইনে তান্ডব চালায় ইসরায়েল, আমেরিকা, ভারত, রাশিয়ারা। আর অনলাইনে এইসব মানবতার দুশমনদের সহযোদ্ধা হিশেবে অগ্রণী ভূমিকা রাখে ফেসবুক।

ফিলিস্তিনিদের উপর ইসরায়েলের হামলার পিকচার-ভিডিও তারা ডিলিট করে দেয়। শুধু ফিলিস্তিন নয়, আফগানিস্তান, কাশ্মীর, আরাকান তথা নির্যাতিত মুসলমানের পক্ষে করা যেকোনো পোস্ট তারা সাধ্যানুযায়ী অপসারণ করে ফেলে। বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দেয়। একাউন্ট ব্যান করে ।

শুধু সাধারণ ব্যবহারকারীদের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তা না ৷ বড় বড় সংস্থাগুলোও একইরকম আচরণের শিকার হয়।

Mondoweiss নামে ফিলিস্তিনের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী একটি সংস্থার পোস্ট তারা ডিলিট করে আলোচনা তৈরি করে, যাতে ইসরায়েলের হামলার দৃশ্য ছিল। ফিলিস্তিনের সরকারী দল আল ফাতাহ ইয়াসির আরাফাতের বন্দুক হাতে থাকা একটা ছবি পোস্ট করলে তাদের পেজ শাটডাউন করে দেয়।

এই জালেম (ফেসবুক) এত শক্তিশালী হয়ে গেছে যে, সে মেইনস্ট্রিম মিডিয়াকেও গোণায় ধরে না। একব্যক্তি ইসরায়েল নিয়ে নিউয়র্ক টাইমসের একটা প্রতিবেদন পোস্ট করলে তাও ডিলিট করে দেয়। 

এক ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের হামলায় তার বসতভিটা  গুড়িয়ে যাওয়ার ভিডিও ধারণ করে পোস্ট করলে ডিলিট করে দেয়। এমন ঘটনা অজস্র।

ফিলিস্তিনি নির্যাতনের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অন্যতম সহযোগী আমেরিকান কোম্পানি এই ফেসবুক। ফেসবুক, গুগলের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পোস্টকারীদের খুঁজে বের করে ওদের সরকার। ২০১৫-১৬ সালে ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয় ফেসবুকের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে। ২০০ জনকে দণ্ডিত করা হয়। এর ভিতরে দারিন তাতুর নামক ব্যক্তিকে সাধারণ একটি কবিতা লেখার জন্য ৮ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এসবই তারা করে হেট স্পিচ ও কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের লেভেল লাগিয়ে। এই অমানুষরা নাকি আবার বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী।

ওদিকে ফিলিস্তিন ও আরবদের বিরুদ্ধে ইহুদিরা এক বছরে ৬ লক্ষ ৭৫ হাজার পোস্ট করলেও কোনো মামলা হয়নি। বরং ফেসবুক সেসব ঘৃণিত পোস্টগুলোকে প্রশ্রয় দিয়েছে। যার ভিতরে এধরনের পোস্টও ছিল 

“rape all Arabs and throw them in the sea (সকল আরবকে ধর্ষণ করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করো)” , এবং ইসরায়েলের বিচারমন্ত্রীর পোস্ট  “ফিলিস্তিনের যোদ্ধাদের মায়েদেরও হত্যা করা উচিত।” 

ডাটা এনালাইসিস করে দেখা গেছে, তথ্য সরবাহের ক্ষেত্রে অন্যান্য রাষ্ট্রের আবেদনে কম সাড়া দিলেও ইসiরায়েলের আবেদনে তারা বেশি সাড়া দেয়।

ফিলিস্তিনে অবৈধ বসতি নির্মাণ করে তা ভাড়া/বিক্রির জন্য দেয়া বিজ্ঞাপনও তারা নির্দ্ধিধায় প্রচার করে।

আর ফেসবুকের এ অন্যায় পক্ষপাত জায়নবাদের মতো হিন্দুত্ববাদের জন্যও প্রযোজ্য। উল্লেখ্য, হিন্দুত্ববাদী ভারত সেসব বিরল দেশের অন্তর্ভুক্ত যারা নিজ দেশের মুসলিমদের উপর ব্যাপক অত্যাচার চালায়।

ফেসবুক তো একটা প্লাটফর্ম। এর পেছনে কিবোর্ড নাড়ে মানবমস্তিস্ক। তো ফেসবুকের প্রধান মস্তিষ্কধারী মার্ক জাকারবার্গ সম্পর্কেও কিছু বিষয় জানা উচিত। 

জাকারবার্গ জন্মসূত্রে ইহুদি। একটা সময় পর্যন্ত ইহুদি ধর্ম পালন করেছে। মাঝখানে কিছুদিন নিজেকে নাস্তিক পরিচয় দিয়েছিল। কিন্তু বিগত ৭-৮ বছর ধরে ধর্মের প্রতি আস্থা ফিরে এসেছে বলে সে নিজেই জানিয়েছে। তাকে জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের উৎসব হানুক্কা সেলিব্রেট করতেও দেখা যায়। 

এখন আমাদের করণীয় কী? আমাদের করণীয় বোঝার আগে ফেসবুককে বুঝি। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। মেটার অধীনে আছে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ সহ অনেক কিছু। আমরা এই ৪টাই অধিক ব্যবহার করি। আমাদের উচিত হলো এই ৪ টার ৩ টাকেই (ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ) সরাসরি বয়কট করা। 

গত বছর (২০২২) ইনস্টাগ্রাম আয় করেছে ৫০ বিলিয়ন ডলার। মেসেজিং এপের ভিতর  হোয়াটসঅ্যাপ আয় করেছে ৩৩০ মিলিয়ন ডলার আর মেসেঞ্জার ২.৮৫ মিলিয়ন ডলার। 

যদিও অধিক পরিচিতির কারণে ফেসবুকের নাম নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি, কিন্তু বাস্তবে উপরুল্লোখিত অনেক কুকীর্তির কুশীলব  ইনস্টাগ্রাম। কিছুদিন আগে ফিলিস্তিনিদের একাউন্টের বায়োতে সন্ত্রাসী লিখে দিয়েছিল ইনস্টাগ্রাম।

ইনস্টাগ্রাম আমার মতে অপ্রয়োজনীয় এপ। এটি ব্যবহার করলে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। দুনিয়ার সকল বেহায়া মেয়েদের এখানে বিচরণ রয়েছে। সুতরাং এটা অবশ্যই বর্জন করা উচিত। 
হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার irreplaceable নয়। টেলিগ্রাম ভালোভাবেই এর বিকল্প হতে পারে। কিছু এক্সট্রা ফিচার টেলিগ্রামকে করেছে বাকিদের চেয়ে অনন্য। মেটার নিকট নিষিদ্ধ অনেক কন্টেন্টই এখানে উপলব্ধ। মুজাহিদিনরা তাদের স্টেটমেন্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে এই প্লাটফর্মটিকে প্রাধান্য দেয়। এখানে নিষেধাজ্ঞা কম। স্বাধীনতা বেশি।

যদি আপনি মুজাহিদিনের সঠিক তথ্য পেতে চান, তাহলে সরাসরি তাদের চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে রাখতে পারেন। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া বা বায়াসড সোশ্যাল মিডিয়া সেগুলো পাবলিশ হতে দেয় না। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যারা উৎস থেকে খবর গ্রহণ করে না, তারা মিডিয়ার হরিদ্রতার শিকার হয় সহজেই।

টেলিগ্রাম কি ইসলামপ্রেমী? মোটেও না। টেলিগ্রামের ইসলামের প্রতি প্রেম নেই, আবার বিদ্বেষও চোখে পড়ে না। এর কারণ হয়তবা ইসলাম ও টেলিগ্রামের স্বার্থের সংঘাত না থাকা৷ যদি কখনো ইসলামের কারণে স্বার্থে আঘাত আসে, তখন হয়ত তারাও হবে ফেসবুকের পথের পথিক। আমার টেলিগ্রাম ব্যবহারের আপিলের মেয়াদও শেষ হবে সেদিনই। ইতোমধ্যেই টেলিগ্রামের উপর অনেক দেশে চাপ সৃষ্টি করেছে। আমেরিকার প্লে স্টোরও তাদের বিভিন্ন নীতিমালায় বেঁধে রেখেছে। 

সতর্কতা: টেলিগ্রামে পর্নোগ্রাফির বিস্তার বেশি। সন্ত্রাসীদের আনাগোনাও রয়েছে। আছে অস্ত্র ও মাদক বিকিকিনির অভিযোগ। প্রতারকরা অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কৌশলও আপনার উপর এপ্লাই করতে পারে। খারেজিরা আসতে পারে মগজ ধোলাই করতে। সুতরাং এসব থেকে দূরে থাকবেন।

বাকি রইলো সাপের মাথা ফেসবুক। আসলে ফেসবুক ফুলেফেঁপে এত বিশালত্ব লাভ করেছে যে, এর সম্পর্কে বলাই যায় you can hate him, but you can’t ignore him (তাকে ঘৃণা করতে পারো, কিন্তু উপেক্ষা করতে পারবে না)।

ফেসবুকের আপন দুনিয়ায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। টুইটারকে কিছু কিছু দেশে বিরোধী দলের মনোনয়ন দেয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টুইটার ফেসবুকের কাছে সেভাবেই ধরাশায়ী হবে যেভাবে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ধরাশায়ী হয়েছিল ব্যারিস্টার কামাল।

আমরা নিজেরা ফেসবুকের মত কোনো প্লাটফর্ম নির্মাণ করে সেখানে নিজেদের ইচ্ছেমতো পোস্ট করতে পারি। তবে সরকার সেটা বন্ধ করে দিবে। এবং পোস্টগুলোও সর্বশ্রেণীর মানুষের কাছে পৌঁছবে না। তাই ফেসবুককে আমাদের এমনভাবে চালানো উচিত যাতে এটি ব্যবহার করে আমরা ফায়দা গ্রহণ করতে পারি। কিন্তু আমাদের ব্যবহার করে ফেসবুক তেমন ফায়দা গ্রহণ করতে না পারে। 
এবং অবশ্যই পরাজিত মানসিকতা নিয়ে বসে না থেকে ফেসবুকের কোমর ভেঙ্গে দেয়ার কৌশল খুঁজতে হবে। টুইটার (x) ব্যবহার বাড়ানো যায়। যদিও তাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের ক্রাইমের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তারা ফেসবুকের থেকে তুলনামূলক ভাল। 

আমরা একান্ত প্রয়োজন না হলে ফেসবুককে স্পন্সর না করার চেষ্টা করব। তার বদলে সরাসরি ভালো ভালো কন্টেন্ট স্পন্সর করব। অনেক ভাই ফেসবুকে, ইউটিউবে এবং ওয়েবসাইট খুলে দ্বীনী কাজ করে যাচ্ছে। তাদের অডিয়েন্সও আছে। কিন্তু আফসোস! তাদের স্পনসর নেই। একসময় জীবিকার নির্মম তাগাদায় সেসব মহৎ কাজ বন্ধ করে নেমে পড়ে অন্নসংস্থানে। যদি ইসলামী অডিয়েন্স টার্গেট না হয়, সর্বসাধারণ টার্গেট হয় সেজন্যও বাংলাদেশে এ ধরনের ডিসেন্ট কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের অভাব নেই। তবু সরাসরি ফেসবুক বা গুগলকে টাকা দেওয়ার চেয়ে কোন ডিসেন্ট বাংলাদেশীর পকেটে টাকা যাওয়া ভালো।

প্রশ্ন হতে পারে, আমরা তো হোয়াটসঅ্যাপ ফ্রিতে চালাই,  তারা তো আমাদের কাছ থেকে কোনো টাকা নিচ্ছে না। সুতরাং বয়কটের দরকার কী। প্রিমিয়াম ভার্সন না চালালেই হয়। উত্তর হলো, আপনি ফ্রি ভার্সন চালান ঠিক আছে। কিন্তু আপনাকে টার্গেট করেই লোক প্রিমিয়াম ভার্সন কিনে। ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জারের ক্ষেত্রেও উত্তর এরকমই: আপনি হয়ত ফেসবুকে বিজ্ঞাপন প্রচার করছেন না। কিন্তু প্রচারিত বিজ্ঞাপন দেখার মাধ্যমে সহযোগিতা করছেন। 

সম্পূরক প্রশ্ন হতে পারে, এই যুক্তিতে প্রায় সকল জায়ান্ট কোম্পানিই বয়কট করতে হয়। আমি বলবো, সাধ্য থাকলে অবশ্যই করেন। সাধ্য না থাকলে যথাসাধ্য করেন।

কেউ কেউ বলবে, ফেসবুক বয়কটের ডাক দিচ্ছেন ফেসবুক ব্যবহার করেই? উত্তর হলো, হ্যাঁ, আমরা ফেসবুককে ব্যবহার করেই ফেসবুকের ক্ষতি করব ইনশাআল্লাহ। যেভাবে মুজাহিদরা ছদ্মবেশে শত্রুর আস্তানায় ঢুকে আক্রমণ চালায়। 

প্রিয় ভাই! বাকিদের দিকে তাকিয়ে না থেকে আপনি একাই বয়কটের সিদ্ধান্ত নিন। আপনাকে যাদের প্রয়োজন তারা আপনার পর্যন্ত পৌঁছার জন্য বাধ্য হবে বিকল্প প্লাটফর্ম ইউজ করতে। এভাবে একজন থেকেই জ্বলে উঠা বয়কটের স্ফুলিঙ্গ আগুন লাগিয়ে দিবে জালিমের হেডকোয়ার্টারে। 

লেখক: উমর ফারূক তাসলিম

তথ্যসূত্র: 

https://shorturl.at/iqW26

https://shorturl.at/fkuv4

https://shorturl.at/eijU6

https://shorturl.at/gmQY0

https://t.ly/Rs_1A

https://t.ly/4rRhB

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *