অশ্রুর যদি বিচিত্র রঙ থাকত তাহলে মায়ানমার, ফিলিস্তিন, কাশ্মির, ইয়ামানের জন্য বিভিন্ন বর্ণের অশ্রু দেখা যেত। আমাদের অশ্রুর রঙটা আমাদের ভাগ্যের মতই অপরিবর্তনীয়। তাই আমাদের অশ্রু দেখে কান্নার হেতু বোঝার উপায় নেই। আমাদের অনেকের তরে কাঁদতে হয়। শুধু সময়, শত্রু আর দেশপরিচয় বদলায়, পরিণতি নয়। এতদিন দেখেছি অমুসলিমদের হাতে মুসলিমদের জুলুম, নির্যাতন, নিষ্পেষণ। এখন আর তাদের না হলেও চলে।
গত কয়েক বছর যাবত সৌদি জোট ইয়ামানে যে হিংস্র তান্ডব চালাচ্ছে, তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। সেখানে মানবতাবোধ চরমভাবে লংঘিত হয়েছে। হাজার কোটি পেট্রোডলার খরচ করে কাফেরদের অস্ত্র কিনে এবং ভাড়াটে সৈন্যদের দিয়ে মুসলমানদের হত্যা করানো হচ্ছে।
অথচ সভ্য পৃথিবী এব্যাপারে নিরব। এই নিরবতার মাঝে ইরানের হাঁকডাক সাধুবাদ পেতে পারত, যদি না তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এযুদ্ধে মদদ না দিত। ইয়ামানে গৃহযুদ্ধের মূল হোতাই তো ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের উপস্থিতি ও প্রভাব জোরদার করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে আব্দুল্লাহ মানসুর হাদিকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করতে ইন্ধন যোগায় ইরান। উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মান একীভূত হওয়ার পর তাদের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়ামান একীভূত হয়। কিন্তু তাদের এই সহাবস্থান কখনো সুখকর ছিলোনা। ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০ বার হুথিরা বিদ্রোহ করেছে, যার পেছনে ইরানের হাত ছিলো বলে মনে করা হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা ছিল সৌদি আরব সীমান্তবর্তী দেশটির উত্তরাঞ্চলে। শিয়া ধর্মাবলম্বী জাইদি সম্প্রদায়ের লোকজন ওই অঞ্চলে বসবাস করে। জাইদি সম্প্রদায় হুথি নামেও পরিচিত। তাদের এই পরিচিতি হয়েছে এই আন্দোলনের প্রবক্তা হোসেইন বদরুদ্দিন আল হুথির নাম থেকে। তারা মোট জনসংখ্যার ৩৪ পার্সেন্ট। আর অবশিষ্টরা সুন্নী ।
আর সৌদিকে কোণঠাসা করার জন্য ইরানের এর চেয়ে মোক্ষম সুযোগ আর মিলতনা। তাই তারা হুথিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করে। এতে পতন ঘটে সৌদির শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ হাদি মনসুরের।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ইরানের এমন কর্তৃত্ব মেনে নিতে পারেনি সৌদি আরব। তারা হুথিদের উপর হামলা শুরু করলো। তবে এই হামলা শুধু হুথিদের উপর ছিলোনা। এবং শুধু সশস্ত্র বাহিনীর উপর ছিলোনা। বহু সুন্নীও এই যুদ্ধে হতাহত হয়েছে। এবং হতাহত হয়েছে নারী, শিশু ও বৃদ্ধা সহ বহু বেসামরিক শিয়া সম্প্রদায়।
বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি রণাঙ্গনের মত এখানেও মানবাধিকার চরমভাবে লংঘিত হয়েছে। শুধু ইয়ামান নয় সমগ্র পৃথিবী জুড়ে এখন অমানবিকতা ও পাশবিকতার জয়জয়কার। ইয়ামানে সৌদি জোটের নির্বিচার হামলা কোনক্রমেই সমর্থনযোগ্য নয়।
ইয়ামান এখন যেন মৃত্যুপুরী। সেখানকার স্বাভাবিক জীবন-যাপন পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে। চলছে ইতিহাসের ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষ । এক মুঠো বউ চেষ্টা করেও মেলাতে পারছে না কেউ কেউ।
কর্মসংস্থান নেই, কাজের খোঁজে মানুষ হন্য হয়ে ঘুরছে। বড় বড় ডিগ্রীধারীদেরও একই অবস্থা। অবশ্য যেখানে বেঁচে থাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই সেখানে বেকারত্বের কথা বলে লাভ কী?
হুথি বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোয়
বিমান হামলার হার কথায় ভয়াবহ।
জাতিসংঘের দেয়া তথ্য অনুযায়ী সেখানে ১ কোটি ১৭ লক্ষ মানুষ খাদ্য সংকটে ভুগছে। যার মধ্যে ৬৮ হাজার মানুষের অবস্থা গুরুতর। জরুরি খাদ্য সহায়তা না পেলে তাদের অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে। এছাড়াও উদ্বাস্তু হয়েছে কয়েক লাখ মানুষ।
মেডিকেলগুলো জানিয়েছে চরম ওষুধ সংকটের কথা। বড় বড় হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে ওষুধের অভাবে। বিষেশত ডায়বেটিক রোগের ইনসুলিন এবং ক্যন্সারের ওষুধ ফার্মেসীগুলোতে পাওয়া যাচ্ছেনা। সৌদি জোটের অবরোধের কারণে এই অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
সবচে’ বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিশুরা। ইউনিসেফ জানিয়েছে, সৌদি জোটের হামলায় প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ৬ জন শিশু নিহত হয়। এছাড়াও প্রচুর সংখ্যক শিশু মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে । কলেরা এবং নিউমোনিয়া মহামারী আকার ধারণ করেছে। তারা জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতিও মানেনা। যেটা সাধারণভাবে ঈসরাইলের বৈশিষ্ট। সেই একই পথে হাঁটছে এখন মুসলিম রাষ্ট্রগুলোও।
মানবতার চরম এই বিপর্যয় আন্তর্জাতিক মহলের অনেকটা অগোচরেই রাখা হয়েছে। কারণ একদিকে বিশ্বমিডিয়া পুরোপুরি ইসলাম বিদ্বেষীদের নিয়ন্ত্রণে। অপরদিকে শিয়া মতাবলম্বী হওয়ার কারণে ইসলামপন্থী মিডিয়াগুলোর সুদৃষ্টি হতেও তারা বঞ্চিত। এর পুরো ফায়দা নিচ্ছে আমেরিকা ও ইসরাইল। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে তারা কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করতে পারছে। এবং সুন্নিদের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে এসব অঞ্চলে নিজেদের ব্যাবসার পথ সুগম করছে।
আর কতদিন এভাবে চলবে? আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়ামানের পর কি এক সময় তাদের পালা আসবেনা? যারা আজ আপন আপন প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে নিজের ভাইয়ের পিঠে ছুরি বসাচ্ছে, তারা কি অতীত ভুলে গেছে? এই তো সেদিনের কথা, একসময় ইরাক সমস্ত মুসলিম নেতৃবৃন্দের আরজি উপেক্ষা করে আমেরিকার নির্দেশে ইরানে অভিযান চালিয়েছিলো। কিন্তু ইরাক সেই আমেরিকার দ্বারাই ধ্বংস হয়েছে। যেসব মুসলিমরা এখন কাফেরদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে আপন ভাইয়ের উপর জুলুম করছে, এক সময় তারাও মাজলুম হবে, আমেরিকা ইসরাইলের স্বার্থে আঘাত লাগলে তারাও রেহাই পাবেনা,
প্রয়োজন শেষ হলে ঠিকই তাদের ছুঁড়ে ফেলে দিবে। তখন এদের জন্যও আমরা কাঁদবো। সেই একই বর্ণের অশ্রু ঝরবে। শুধু এই নিরন্তর অশ্রুধারার নতুন একটি হেতু অন্তর্ভুক্ত হবে, আর কিছু নয়।