মাদ্রাসা-পালানোর দিনগুলো

জীবন থেকে ততদিনে অতীত হয়ে গেছে প্রায় ১৩টি ঘনমুখর বর্ষা।
২০০৮ সালের এক বিকেল। সোনালী আবরণে ঢাকা পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ছে সূর্য। আর আমি মাঠে বসে উপভোগ করছি ব্যাট-বলের সংঘর্ষ।

এমন সময় এক সহপাঠী এসে খবর দিলো, হুজুর আমাকে খুঁজছেন। জানা ছিলো কী জন্য খুঁজছেন। আসরের আগেই যে একটা অন্যায় করে এসেছি। কামণা ছিলো, নালিশটা না পৌঁছুক হুজুর পর্যন্ত। কিন্তু কামণা রয়ে গেলো অপূর্ণ। নালিশ পৌঁছে গেল অযাচিত গন্তব্যে।

সিদ্ধান্ত নিলাম, পালাতে হবে। কোনোভাবেই মার খাওয়া যাবে না। অবিলম্বে উল্টোদিকে হাঁটা দিলাম। বিদায়বেলার সঙ্গী শুধু পরিধিত কাপড়গুলো আর দুটি শূন্য পকেট।

আমার সেই সুদীর্ঘ বন্ধুর যাত্রা সূচিত হয়েছিল এমনই কপর্দকহীন অবস্থায়।

জীবনে কখনো পালিয়ে বাড়িতে যাইনি, কারণ বাড়িতে সেই প্রশ্রয় ছিলো না। আত্মীয় স্বজনের কাছে গেলে তারা বাড়িতে খবর দিয়ে দিবে বলে সেখানেও যেতাম না। তাই আমাকে মাথা গুঁজার জন্য ঠাঁই নিতে হত সম্পূর্ণ অচেনা জায়গায়।

ঢাকা থেকে স্বল্পমূল্যে বের হতে রেলের বিকল্প নেই। সুতরাং কমলাপুর রেলস্টেশনে উপস্থিত হলাম।

প্লাটফর্মে সাপের মতো শুয়ে আছে ট্রেনগুলো। সর্বপ্রথম যেটি চলতে শুরু করে তার গন্তব্য ছিল চাঁদপুর। আমি তাতে চড়ে বসি।

ঝিকঝিক শব্দে ট্রেন চলতে শুরু করলো। জানালায় যেন প্লে হচ্ছে একের পর চলচ্চিত্র। কোথাও সবুজ গাছপালা, কোথাও সোনালী ধান, কোথাও বাচ্চারা খেলাধুলা করছে।
আমার চোখে অন্তহীন মুগ্ধতা।

অপরিচিত পথ। ট্রেন কোথায় থামবে ভাবছিলাম। যেতে যেতে একেবারে মেঘনা নদির তীরে এসে থামে ট্রেন। গন্তব্যে পৌঁছে মানুষ হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়ে। চলে যায় যে যার ঠিকানায়। আমি তো ছিলাম ঠিকানাবিহীন। তাই আমি রয়ে যাই স্টেশনেই।

প্লাটফর্মের পূর্ব দিকে একটা চা স্টল ছিলো। কয়েকজন লোক সেখানে বসে চা খাচ্ছিলো। আমি তাদের পাশে টুলে গিয়ে বসি। আমাকে বসতে দেখে একজন বলে উঠে, “সবাই পকেট সাবধান। স্টেশনের পোলাপান কিন্তু পাশে বসে পকেট মারে।” আমি একটু গোস্বা হয়ে বলি “যে যেমন তার ধারণাও তেমন।” এতে লোকটা ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে মারতে আসে।

স্টেশনে আরো কয়েকবার লোকটার সাথে দেখা হয়, তার বাড়ি কাছেই। সে বুঝতে পারে আমি প্লাটফর্মের অন্যান্য ছেলেদের থেকে আলাদা। এতে আমার প্রতি তার আচরণ নম্র হয়ে আসে। সে আমাকে পাশের এক হোটেলে চাকরি দিয়ে দেয়।

কাজ হলো টেবিল পরিষ্কার। আমার ডিউটি সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ; অর্থাৎ সারারাত।

আমার আবার রাত জাগার অভ্যাস ছিলো না, ৯টা বাজলেই চোখ ভেঙে ঘুম নামতো, এখনো তাই।

স্টেশনে সারারাতই ট্রেন আসত। আর ট্রেন আসলেই কাস্টমার বেড়ে যেত। আমি দুয়া করতাম যেন কাস্টমার কম আসে। ১০/১১টা পর্যন্ত খুব চাপ থাকত। তারপর কাস্টমার কমে আসলে একটু আধটু ঝিমিয়ে নেওয়ার সুযোগ মিলত। সকাল ৬টা থেকে শুরু হতো ঘুমানোর টাইম। ঘুমানোর জায়গা প্লাটফর্ম। কিন্তু সেখানে মানুষের এত কোলাহল থাকত যে, ঠিকমতো ঘুমানো যেত না। তার উপর আমার ঘুম খুবই পাতলা।

একটা বিষয় ভেবে আনন্দিত ছিলাম, যেহেতু হোটেলে কাজ করব, তাই খাবারের কষ্ট থাকবে না। আমি ছোটবেলা থেকেই মুখরোচক খাবারের দিওয়ানা ছিলাম। আর ওই হোটেলে দেশি খাবার ছাড়াও বিরিয়ানি, খিচুড়ি, দই-মিষ্টি ইত্যাদি পাওয়া যেত। আমি ভেবেছিলাম কর্মচারীরা যা ইচ্ছা খেতে পারে। কিন্তু পরে দেখি তেমনটা না, সাধারণমানের খাবারের একটি তালিকা করা আছে। তালিকার বাইরে খেতে হলে টাকা দিতে হয়।

আমার বেতন ছিলো দৈনিক ৩০ টাকা। প্রতিদিনের বেতন প্রতিদিন উঠানো যেত, ইচ্ছা করলে কয়েকদিনেরটা একত্রেও উঠানো যেত।

আমি কয়েকদিনের বেতন না উঠিয়ে বিনিময়ে এক প্লেট ভুনা খিচুড়ি খেয়ে নেই।

সেখানে চা-ও পাওয়া যেত। এক কর্মচারী অনেকগুলো কাপে কনডেন্স মিল্ক ঢেলে রাখত। যাতে কাস্টমার আসলে শুধু লিকার-চিনি দিয়ে তাড়াতাড়ি পরিবেশন করা যায়। আমার আবার কন্ডেন্স মিল্ক খুব পছন্দ। রাতে বিদুৎ চলে গেলে জেনারেটর ছাড়ার আগ পর্যন্ত যে অন্ধকার কয়েক সেকেন্ড – তার ভেতর আমি দু একটা কাপ থেকে কন্ডেন্স মিল্ক খেয়ে ফেলতাম। লোকটা মনে করত সে কনডেন্স মিল্ক ঢালেইনি ওগুলোতে।

হোটেলের অদূরে একটি মসজিদ ছিল। নামাযের জন্য সেখানে যেতাম। একইসাথে ওজু ইস্তিঞ্জার প্রয়োজনও পূরণ হয়ে যেত। কিন্তু মসজিদের ইস্তিঞ্জাখানা তো আর সর্বদা খোলা থাকে না। একবার রাত দশটার দিকে আমার টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। মসজিদ তখন বন্ধ। আমি সিনিয়র এক কর্মচারীকে বলি, আপনারা কোথায় টয়লেটে যান, আমাকে সেখানে নিয়ে চলেন। তিনি বললেন, অপেক্ষা করো। আমি অপেক্ষা করতে থাকি। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর জোঁকের মতো দীর্ঘায়িত হতে থাকে। কারণ একের পর এক কাস্টমার আসছে। আমি তাকে বারবার তাগাদা দেই। প্রায় রাত একটার দিকে সে আমাকে টয়লেট দেখানোর জন্য বের হয়। সঙ্গে নেয় এক বোতল পানি। আমি ভাবলাম খাওয়ার জন্য নিয়েছে।

সে রেললাইন ধরে অগ্রসর হতে থাকে, পেছনে আমি। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর জনসমাগম থেকে দূরে এক জায়গায় এসে থামে। তারপর রেললাইনের পাশেই প্রয়োজন সারতে বলে এবং পানির বোতল দিয়ে বলে এটা ইস্তিঞ্জায় ব্যবহারের জন্য। আমি প্রচন্ড অবাক হই এবং রাগ হই। তিন ঘণ্টা বসিয়ে রেখে আমাকে এখানে নিয়ে আসলো! সে বলল, কী সমস্যা! আমরা তো এখানেই করি। আমি বললাম, জীবন গেলেও তা সম্ভব না।

রাত একটায় আমি বেরিয়ে পড়ি টয়লেটের খোঁজে। হায়! অদৃষ্টের লিখন! যখন বিছানায় আরামের ঘুমে বিভোর থাকার কথা, তখন আমি খুঁজে ফিরছি টয়লেট।

অবশেষে একটা মার্কেট পাই, যার ভেতর টয়লেটের ব্যবস্থা আছে। সেখানের নাইটগার্ডকে অনুরোধ করি ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিতে। সে বলে, রাত্রেবেলা কাউকে মার্কেটে ঢুকতে দেওয়া নিষেধ। কিন্তু আমার অনুনয় বিনয় নিষেধাজ্ঞার পর্দা উন্মুক্ত করে দেয়। খুলে দেয়া হয় মার্কেটের তালা।

রেলস্টেশনে থাকা জটাজুট চুল, ময়লা ছেড়া জামা পড়া লোকদের আমরা পাগল ভাবি। অথচ তাদের অনেকেই সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কের। এরকম একজনের সাথে পরিচয় হয়। আমি তাকে প্রথমে পাগল মনে করেছিলাম।

আরো দুএকজন টোকাইয়ের সাথেও পরিচয় হয়। আমরা একসাথে চলাফেরা করতাম, গল্প করতাম। যদিও আমি বেশিরভাগ থাকতাম শ্রোতার ভূমিকায়।

দিনের বেলা প্লাটফর্মে সময় কাটতো না। আর জটওয়ালা চাচা ও টোকাইদের সাথে দীর্ঘ সময় আলাপ জমানোও সম্ভব ছিলো না। কেননা আমাদের রুচিগত ভিন্নতা অনেক। তাই খাতা-কলম কিনে অবসর সময়ে কবিতা লিখতে থাকি। বেশকিছু কবিতা লেখা হয়ে যায়। একদিন প্লাটফর্মে বসে লিখছিলাম, এমন সময় পাশ দিয়ে কলেজ বা ভার্সিটির কিছু ছাত্র অতিক্রম করে। তারা একটা টোকাই টাইপ ছেলেকে কবিতা লিখতে দেখে চমৎকৃত হয়। তারা ভেবেছিল আমি মাতাপিতাবিহীন এক অসহায় পথশিশু। খাতা নিয়ে তারা কিছু কবিতা পড়ে। এবং ট্যালেন্ট বিকশিত করার তাগাদা অনুভব করে।

তারা আমাকে সঙ্গে নিতে চায়; জানায় আমার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে লেখাপড়ার সুযোগ করে দিবে। আমি বললাম, মাদ্রাসায় পড়ালে যাব। তারা বলে, স্কুলে পড়াবে। আমি বলি, তবে থাক। তারা চলে যায়।

একবার রেস্টুরেন্টে পার্শ্ববর্তী মাদ্রাসার এক আলেম খেতে আসেন। তিনি চেহারা দেখে বুঝে ফেলেন, আমি মাদ্রাসার ছাত্র। তিনি বললেন , কোন পর্যন্ত পড়েছ? বললাম হিফজ শেষ। তিনি তিলাওয়াত শুনতে চাইলেন। আমি সূরা কাহাফের শেষাংশ শুনাই। তিনি পছন্দ করেন। এবং তার খাবার থেকে আমাকেও খেতে দেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন মাদ্রাসায় পড়তে চাও? আমি বললাম জি। তিনি তার মাদ্রাসার ঠিকানা দিয়ে চলে যান। পরদিন হাজির হই তার মাদ্রাসায়, তিনি বাইরে কোনো কাজে ছিলেন। আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চলে আসি।

সেখানে আর ভাল লাগছিল না। এত কষ্টের কাজ। আর সারাটা রাত নির্ঘুম থাকতে হয়। কয়েকদিনের বেতন জমা ছিলো। সেগুলো উঠিয়ে রওয়ানা দেই লাকসাম, খালার বাসায়।

শুধু জানা ছিল খালার বাসা লাকসাম। আর কিছু জানা ছিলো না। এতবড় লাকসামে তাদের খুঁজে বের করব কীভাবে?

লাকসাম রেলস্টেশনে একদিন থাকি। যদিও পার্শ্ববর্তী আবাসিক হোটেলে থাকার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তাতে ৫০টি টাকা খরচ হয়ে যাবে। তাই প্লাটফর্মেই শুয়ে পড়ি।

কিন্তু রাতে দানবাকৃতির মশাদের নির্যাতনে টিকতে না পেরে ৫০ টাকার মায়া ত্যাগ করতে হয়। অনন্তর আবাসিক হোটেলে উঠে যাই।

পরদিন বাসে লাকসাম যাই। কোথায় নামব ঠিক করতে পারছিলাম না। হেল্পার বলল, বাইপাস নামবেন? বললাম, ঠিক আছে, নামান।

মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। সঙ্গে বেয়ারা বাতাস। গাছের পাতা কাঁপছে। আমিও কাঁপতে কাঁপতে বাস থেকে নামলাম। বৃষ্টির এক ঝাপটাতেই ভিজে একাকার হয়ে গেলাম।

মানুষের কাছে খালুর নাম বলে খোঁজাখুঁজি করার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু মানুষ কোথায়? রাস্তায় মানুষের বদলে চলছে ঘোলা পানির স্রোত।

সর্বপ্রথম যার সাথে দেখা হলো সে একজন তরুণ।আল্লাহর কুদরত, তাকে জিজ্ঞেস করতেই সে খালুকে চিনে ফেলে। কাছেই বাসা।

কিন্তু সে শুধু ঠিকানা বলে ক্ষান্ত হলো না। আমাকে পৌঁছে দেয়ার জন্য সঙ্গে রওয়ানাও হলো। যদিও তার কাছে এই আবদার আমি করিনি।

সে আমাকে প্রথমে একটি বিরান বাড়ির আঙ্গিনায় নিয়ে যায়। এবং বলে তোমার জামাকাপড় যেভাবে ভিজেছে এগুলো খুলে নিংড়ে আবার পড়ো। নইলে সর্দি লাগবে। আমি পাঞ্জাবি নিংড়ালাম। কিন্তু লুঙ্গি নিংড়ানো সম্ভব ছিলো না। কারণ আমার কাছে আর কোনো লুঙ্গি ছিলো না। সে বলল, তোমার পরনে লম্বা পাঞ্জাবি, লুঙ্গি খুলে নিংড়ালে সমস্যা হবে না। আমি মানা করলাম। সে পীড়াপীড়ি করতে থাকলো। একসময় সে আমার বাল্যচিন্তাকে ইনফ্লুয়েন্স করতে সক্ষম হয়। আমি একটি ঘরের আবডালে গিয়ে লুঙ্গি নিংড়াতে থাকি। এমন সময় সে আবডাল পার হয়ে এপাশে চলে আসে। এতে আমি অত্যন্ত বিরক্ত হই এবং তার উদ্দেশ্য বুঝে ফেলি। তাকে বলি, দূর থেকেই বাড়ি দেখান। আপনার যাওয়ার দরকার নেই। সে দূর থেকে বাড়ি দেখিয়ে বিদায় হয়।

খালার বাসায় কিছুদিন থাকি, তারা আমাকে নিজ বাসায় ফিরে যেতে বলে। কিন্তু আমি বাসায় ফিরতে রাজি নই। তাদের পীড়াপীড়ির কারণে একদিন সেখান থেকে বের হয়ে যাই।

কুমিল্লা বিশ্বরোডের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। দীর্ঘ ২৩ কিলোমিটার রাস্তা। কিছু হেঁটে, কিছু গাড়িতে যাই। হেঁটে যাওয়ার উদ্দেশ্য লালমাই পাহাড় ভালোভাবে দেখা। বিশ্বরোড এসে টাকার অভাবে ঢাকার বাসে উঠতে পারছিলাম না। এসময় একটা কৌশল করি। বাস ছাড়ার শেষ মুহুর্তে পেছন দিকের সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে যাই।

প্রথমে ছাদে আমি একা ছিলাম, পরে আরো মানুষ উঠে। ভেবেছিলাম হেল্পার ভাড়া কাটতে ছাদে আসবে না। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে হেল্পার ছাদে উঠে যায়।

সে সবার কাছ থেকে ভাড়া নেয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আমার কাছে ভাড়া চায়নি। আমিও হাফ ছেড়ে বাঁচি।

কিছুদূর যাওয়ার পর সবাইকে ছাদ থেকে নেমে ভিতরে ঢুকতে বলা হয়। সম্ভবত ওই বাসের ছাদে যাত্রী নেওয়া নিষিদ্ধ। এব্যাপারে কোন অভিযোগ আসায় তারা ছাদ থেকে যাত্রী নামিয়ে দেয়।

বাসের ভেতর আগে থেকেই কিছু মানুষ দাঁড়ানো ছিল। ছাদের যাত্রী ভিতরে ঢোকার পর প্রচণ্ড ভিড় হয়। পা রাখারও জায়গা থাকে না। উপরন্তু পুরো পথ দাঁড়িয়ে যেতে হয়।

আমার পরিচিতজনরা জানে, দাঁড়িয়ে থাকা আমার জন্য কত কঠিন। আমি প্রচুর হাঁটতে পারি। কিন্তু অল্প সময়ও দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। এছাড়া ছিল তীব্র গরম।

সেদিন যে কষ্ট হয়েছিল, জীবনে আর কোনো বাসযাত্রায় এত কষ্ট হয়নি।

রাত একটায় কি দুইটায় বাস ঢাকায় প্রবেশ করে। গাড়ি তার অন্তিম স্টপেজের কাছাকাছি আসছিল, আর আমি পেরেশান হচ্ছিলাম। কোথায় নামলে ভাল হয়? এত রাতে কোথায় যাব? অবশেষে সিদ্ধান্ত নেই এমন কোনো জায়গায় নামার যেখানে মানুষের আনাগোনা রয়েছে। সে হিশেবে শনির আখড়ার দিকে একটা পেট্রোল পাম্পের সামনে নামি।

পাম্পের এক কর্মচারীর সাথে কথা হয়। সে আমাকে থাকার জায়গা দিতে চায়। আমি রাজি হই। সে আমাকে তার রুমে নিয়ে যায়। কলা রুটি খেতে দেয়।

রাতে শোয়ার পর বুঝতে পারি, লোকটি সমকামিতা রোগে আক্রান্ত, এজন্যই আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। আমি কৌশল করে তার দিকে কাত (মুখোমুখি) হয়ে শুই। কেননা ওপাশ ফিরে শুলেই সে গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করে। মুখোমুখি হওয়ায় সে সুবিধা করতে পারলো না। তার থেকে হেফাজত থাকতে আমাকে প্রায় সারারাত জাগ্রত অবস্থায় কাটাতে হয়। একটু চোখ লেগে আসলেই সে স্পর্শ করে।

একসময় রাত্রীশেষের বার্তা নিয়ে মসজিদ থেকে ভেসে আসে তাওহিদের সওগাত। আকাশ থেকে মিইয়ে যায় অন্ধকার। পূবাকাশে হেসে উঠে রঙিন ভোর।

রাতে তার প্ল্যান শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ করে দেয়ায় সকালে পত্রপাঠ বিদায় করে দিবে ভেবেছিলাম। কিন্তু সকালে সে ভাল আচরণ করে আমাকে অবাক করে। বিদায়ের সময় হোটেল থেকে নাস্তাও খাইয়ে দেয়।

পরদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করি। রাত হলে এশার নামায পড়ি বাবুবাজার ব্রিজের নিচে থাকা প্রাচীন আমলের মসজিদটিতে। এশার পর খাদেমের চোখ ফাঁকি দিয়ে মসজিদের ছাদে গিয়ে শুয়ে পড়ি। কিন্তু একটুপর খাদেম উপরে এসে আমাকে দেখে ফেলে। ভেবেছিলাম তাড়িয়ে দিবে। কিন্তু না তাড়িয়ে সে আমাকে একটা কাঁথা দেয়, আর বলে মসজিদে কিছু না বিছিয়ে শোয়া ঠিক না। কেননা…। তার কথা শুনে লজ্জা পাই। সে রাতে মশা আমাকে কামড়ে ভুত বানিয়ে দেয়।

আসি কাঁচপুর। অনেক ক্ষুধার্ত ছিলাম। তাই একটা হোটেলের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকি। সেখানেও একটা লোকের সাথে পরিচয় হয়। সে আমাকে হোটেলে খাবার খাওয়ায়।

পরদিন রাতে ঘুমানোর জন্য জায়গা খুঁজতে থাকি। কদমতলির দিকে একটা পুরোনো বিল্ডিং পাই, সেখানে রিকশাওয়ালারা ঘুমায়। আমি ঘুমাতে চাইলে তারা জায়গা করে দেয়।

মধ্যরাতে মধ্যবয়সী এক মহিলার আগমন ঘটে। একটু পরপর রিকশওয়ালারা পালাক্রমে ওই মহিলার কাছে যায়।

তমসাচ্ছন্ন রজনীকেও কালিমালিপ্ত করে চলতে থাকে তাদের ব্যাভিচার। রিকশাওয়ালাদের অধিকাংশই এই কাজে লিপ্ত হয়। আমি অত্যন্ত অবাক হই। এভাবে প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হতে একটুও লজ্জাবোধ হচ্ছে না?

কিছুক্ষণ পর মহিলাটা বেরিয়ে আসে। তাকে দেখি টাকাপয়সার লেনদেন নিয়ে রিকশাওয়ালাদের সাথে তর্ক বিতর্ক করতে।

দুপুরবেলা আবার ক্ষুধা লাগলে কাঁচপুর সেই হোটেলের সামনে যাই। সেই লোকটা আবারও খাওয়ায়। সে হোটেলের পাশে একটি দোকানে কাজ করে।

দ্বিতীয় দিন খাওয়ানোর পর সে তার আসল মনোভাব প্রকাশ করে। অনেকক্ষণ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কী কী বলেছিল এখন মনে নেই। একটা কথা মনে আছে ‘মানুষ কিছু দেয়, কিছু পাওয়ার জন্য।’ আমি বুঝেও না বুঝার ভান ধরে চলে আসি।

কাঁচপুর ছিল আমার মেঝো খালার বাড়ি। প্রতিবার আমি কাঁচপুর যেতাম ঠিকই, কিন্তু তার বাড়িতে যেতাম না। অবশেষে থাকা খাওয়ার জায়গা না পেয়ে তার বাড়িতে উঠি। আমার মা খবর পান। বলেন পাশেই কোনো মাদ্রাসা খুঁজে ভর্তি হয়ে যেতে। সকালে খালা আমাকে মাদ্রাসা খুঁজতে পাঠান। আমি বের হই সেখান থেকে পালানোর নিয়তে।

মদনপুরের দিকে হাঁটতে থাকি। নিয়ত করি হেঁটে চট্টগ্রাম যাব। আর রাস্তায় গাছের পাতা খাব। অনেক দূর যাই এভাবে। কয়েকবার পাতা খাই। একসময় হাঁটার কষ্ট ও পাতার বিস্বাদের কারণে দমে যাই। এবং পুনরায় খালার বাসায় ফিরে আসি। বলি মাদ্রাসা খুঁজে পাইনি।

এরপর সিদ্ধান্ত হয়, আমি নানাবাড়ি যাবো, আমার মাও সেখানেই ছিলেন। খালা আমাকে ভাড়ার টাকা দিয়ে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু আমার নানাবাড়িতে যাওয়ার পাকা নিয়ত ছিলো না, তাই খাওয়া দাওয়া করে ওই টাকা শেষ করে ফেলি।

বিকেল বেলা কাঁচপুর থেকে হেঁটে রওয়ানা দেই। পোস্তগোলা আসতে আসতে রাত হয়ে যায়।

পোস্তগোলা ব্রিজের ওপার বামপাশে ভিতরে একটা মার্কেট নির্মিত হচ্ছিল। সেটার ছাদে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেই। কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর দেখি, একটি লোক ছাদে আসল। সে প্রাথমিক কিছু কথা বলার পর ইঙ্গিতে আমাকে কুপ্রস্তাব দেয়। আমিও ইঙ্গিতেই তা প্রত্যাখ্যান করি। সে বলে, এখানে মশার কামড় না খেয়ে আমার রুমে চলো। খাবার আছে, ফ্যান আছে, মশারি আছে, সকালে ভাড়ার টাকাও দিয়ে দিব, শুধু আমাকে খুশী করতে হবে। আমি বলি, আপনি কী করলে খুশী হন তা তো জানি না। সে বলে আমি জানিয়ে দিব। আমি বললাম, আমার জানার কোনো ইচ্ছা নেই।

এভাবে অনেকক্ষণ পীড়াপীড়ির পর হঠাৎ সে আশ্চর্যজনক কথা বলে। বলে, এতক্ষণ আমি তোমাকে পরীক্ষা করছিলাম। এখানে রাত্রেবেলা অনেক ছেলেই ঘুরঘুর করে। তাদেরকে আমি পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে খারাপ প্রস্তাব দেই। প্রায় সবাই রাজি হয়ে যায়। আর রাজি হওয়া মাত্রই থাপ্পড় দিয়ে এখান থেকে তাড়িয়ে দিই। কিন্তু তুমি ভালো ছেলে। চলো তোমাকে খাবার খাওয়াবো। এই বলে সে আমার হাতে টাকা দিয়ে হোটেল থেকে দুজনের খাবার আনায়। ছাদে বসে সে আর আমি খাই। সে সকালে ভাড়ার জন্য কিছু টাকা দিয়ে চলে যায়। আমি ঘুমিয়ে পড়ি।

সকালে উঠে আমি নাস্তা খেয়ে ওই টাকাও শেষ করে ফেলি। এবং শুরু করি বেদম হাঁটা। ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ে ধরে প্রায় ৩০ কিলোমিটারের বেশি হেঁটে গিয়ে নানাবাড়ি উপস্থিত হই। পথিমধ্যে অনেক জায়গায় পানিপানের বিরতি নেই।

দুপুরের দিকে হাইওয়ের পাশে থাকা একটি কবরস্তান পর্যন্ত পৌঁছি। যাত্রাপথে বাসের জানালা থেকে প্রতিবারই কবরস্তানটি দেখতাম। কিন্তু নামার সুযোগ হতো না। আজ পায়দল চলায় সুযোগ হলো।

একটি কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। কিছু আয়াত পাঠ করি। তারপর মুনাজাত ধরি। চোখের পানি থামতে চায় না।

আমার বয়স যখন ছয়, এখানেই বাবাকে মাটি দিয়ে গিয়েছিলাম। তখন তেমন একটা খারাপ লাগেনি। কিন্তু যত বুঝমান হয়েছি ক্রমান্বয়ে দু:খবোধ বেড়েই চলেছে।

যখন কোনো শিশু পিতামাতা হারায়, তাদের জন্য সবাই খুব সহমর্মী হয়। শিশুরা কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে হারানোর বেদনা টের পায় না। যত দিন যায় তার দু:খবোধ বাড়তে থাকে। এবং তা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

কবরস্তান থেকে বের হওয়ার পর হাইওয়ের পাশে বিশাল একটা গাছ দেখি। দুপুরের অগ্নীঝরা রোদের মধ্যে গাছটির ছায়ায় বসতে ইচ্ছে হয়। ঝিরিঝিরি একটা বাতাস ছাড়ে।
বাঙ্গালী তো! বসার পর শুইতেও মনে চায়। শীতলতা পেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। যখন ঘুম ভাঙ্গে, ততক্ষণে সূর্য তেজ হারিয়ে হয়ে গেছে অশীতিপর বৃদ্ধ।

রাত সম্ভবত ১০ টার দিকে নানাবাড়ির কাছে এসে উপস্থিত হই। বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি কে কী করছে । কিন্তু ঢুকার সাহস না পেয়ে চলে আসি বাজারে।

রাত্র তার নিরবতা ক্রমেই গাঢ় করছে। সূর্য সরে যাচ্ছে একটু একটু করে – দূর থেকে বহুদূরে। শেষ দুয়েকটা দোকান খোলা। আমি বাজারে এলোপাথারি হাঁটাহাঁটি করতে থাকি। এ দেখে নাইটগার্ডরা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

একজন দোকানি আমার নানার নাম শুনে চিনে ফেলে এবং আমাকে বাসায় দিয়ে আসে।

এভাবেই পলায়নের প্রথম পর্যায় সমাপ্ত হয়।

দ্বিতীয় দফায়ও ঢাকার একটি মাদ্রাসা থেকে পালাই। এবার মস্তিষ্কে প্রথমেই হানা দেয় রাত্রীযাপনের চিন্তা।

কাকরাইল মারকাজের কথা মনে পড়ে। সেখানে থাকার ব্যবস্থা হলে হতেও পারে।

বিকেলে যখন মারকাজে আসি, প্রচুর মানুষ ছিল সেখানে। কিন্তু রাত বাড়তে থাকে আর ভীড় কমতে থাকে। একটি উদভ্রান্ত বাচ্চাকে দেখে পাহারাদাররা এসে বিভিন্ন প্রশ্ন করে। বললাম, রাতে এখানে থাকতে এসেছি। তারা বলে, এরকম জামাতবিহীন লোকদের এখানে থাকার সুযোগ নেই।

আমি পাহারাদারদের এড়াতে কখনো সিঁড়িতে, কখনো ওজুখানায়, কখনো অন্য কোথাও বসে থাকি।

এসময় এক বৃদ্ধ মসজিদে প্রবেশ করে। সম্মুখের গ্রীলে হাতব্যাগটা ঝুলিয়ে নামাযে দাঁড়ায়। একাকি এশার নামায আদায় করে। আমি তার পেছনেই বসে ছিলাম। সে নামায শেষে আমাকে কাছে ডাকে। জানতে চায়, এখানে কী করছি? বললাম, রাত্রীযাপনের জায়গা খুঁজছি। তিনি বললেন, তুমি রাজি থাকলে আমি থাকার ব্যবস্থা করব। আমি বিনাবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে তিনি হাঁটতে থাকলেন। কোথা হতে এসেছি, কোথায় যাবো কিচ্ছু জিজ্ঞেস করলেন না। আমিও জানতে চাইলাম না, কে আপনি? কোথায় নিয়ে যাবেন?

তার পায়ে সমস্যা। লাঠি ভর করে হাঁটছেন। আমি তাকে অনুসরণ করে চলছি। হঠাৎ তিনি বললেন, ব্যাগটা সাবধানে রাখো।

ঢাকা শহর তার যানজটপর্ব শেষ করে বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বয়সের দুই প্রান্তে থাকা দুজন মানুষ ধীরলয়ে এগিয়ে চলছে রাজপথ ধরে।

একটু পর বৃদ্ধ বললেন, ব্যাগ খুলে দেখো ভিতরে কী? খুলে দেখি ব্যাগভর্তি ৫০০ টাকার বান্ডেল; কয়েক লক্ষ টাকা। জীবনে কখনো এতটাকা একসঙ্গে দেখিনি।

তিনি খুবই আপার ক্লাশের একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেন। ময়দানের মত বিশাল রেস্টুরেন্টে আমরা দুজন ছাড়া কোনো ভোক্তা ছিলো না। খাবারের মেন্যু আসল। এই প্রথম খাবারের মেন্যু দেখলাম। তিনিই অর্ডার করলেন।

হোটেল সম্পর্কে আমার ২টা জ্ঞান ছিল। এক: উন্নত খাবার মানেই ভাত-মাংস। দুই: অর্ডার করার সাথে সাথে খাবার আসা।

কিন্তু বৃদ্ধ আমার ধারণা ভুল প্রমাণ করতেই যেন এখানে এনেছেন। দেখলাম অর্ডার নেয়ার পর রান্না বসিয়েছে। এবং অনেকক্ষণ পর ভাত মাংস নয়, বরং অদ্ভুত এক খাবার দেয়া হয়েছে (সম্ভবত ফ্রেঞ্চ)।

কিছুক্ষণপর! রহস্যময় কয়েকজন লোকের আগমন ঘটল বৃদ্ধের কাছে। সকলে একত্রিত হয়ে কোনো গোপন মিটিং করল। আমাকে কিছুটা দূরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো, যাতে তাদের কথা শুনতে না পাই। আমার মনে হলো, তারা কোনো বেআইনি কাজ করার জন্য একত্রিত হয়েছে। মিটিং শেষে আমরা বৃদ্ধের গাড়িতে করে চলে আসি তার বনশ্রীর বাসায়। তিনি গ্যারেজে আরো একটা গাড়ি দেখালেন, যার মূল্য নাকি ৮০ লাখ টাকা।

বাসায় বৃদ্ধ একাই থাকে। ছেলেমেয়ে, স্ত্রী পরিজন অদূরের আরেক ফ্ল্যাটে থাকে। তবে তার খেদমতের জন্য রয়েছে ৩ জন কিশোর। আরেকজন নওজোয়ান আলেম রয়েছেন তাকে জামাতে নামায পড়ানোর জন্য। কেননা তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতে চান, আবার জামাতও তরক করতে চান না।

কামরায় প্রবেশের সাথে সাথে খাদেমরা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার সেবায়। হাত পা, মাথা টিপে দেয়। চুল টেনে দেয়। কে বেশি খেদমত করতে পারে তার একটা প্রতিযোগিতা হয়ে যায়। আমাকে তিনি ৪ নম্বর খাদেম হিসেবে নিয়োগ দিলেন। (অবশ্য তার খেদমতের দায়িত্ব আমি খুব কমই পালন করেছি, অন্য ৩ খাদেমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়ও কখনো অবতীর্ণ হইনি।)

ইমাম সাহেব ও খাদেমরা আলাদা রুমে ঘুমাতো। বৃদ্ধ আমাকে তার সাথে ঘুমাতে বললেন।

তিনি রাতে মাঝেমধ্যে আমার উপর হাত পা উঠিয়ে দিতেন। এবং সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে করতেন বলেই মনে হয়েছে। অস্বস্তিতে রাতে ঠিকমতো ঘুম হতো না আমার।

মাঝেমধ্যে বাসায় কিছু লোক আসত। অত্যন্ত গোপনীয় কোনো মিটিং করত তারা।

কোনো কোনো রাতে গাড়িতে কাস্তে কোদাল নিয়ে চলে যেতো গোরস্তানে। কবর খোদাই করত। সম্ভবত লাশের হাড্ডি বা কাফনের কাপড় চুরি করত। এবং এগুলোকে তন্ত্রমন্ত্রের কাজে ব্যবহার করত।

তিনি জিন-যাদুর কাজও করতেন। একাকি রুম বন্ধ করে কথা বলতেন। একদিন জিজ্ঞেস করলে বলেন, জিনের সাথে কথা বলি। আমিও জিনের সাথে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করি। কিন্তু তিনি বলাননি।

একদিন বললেন, একটা কাগজে কিছু লিখে বুকের সাথে লাগাও। আমি বলে দেব কী লিখেছ। তার কথামতো কাগজে কিছু ফুল-ফলের নাম লিখে বুকের সাথে লাগাই। তিনি সত্যি সত্যিই বলে দেন কী লিখেছি।

বৃদ্ধ লোকটি আমাকে অনেক স্বপ্ন দেখাতে চাইত। বলত আমি বিভিন্ন দেশে সফরে যাই, সেসব সফরে তোমাকে আমি খাদেম হিশেবে নিব। কিছুদিন পর হজ্জে যাব, সেখানেও তুমি সঙ্গে থাকবে। কথায় কথায় জানান, তিনি একটা মাদ্রাসা চালান। আর তিনি আলেমও। তার আলেম হওয়ার প্রমাণ পাই একটা ঘটনায়।শেখ সাদীর বোস্তার একটা শের আমার প্রিয় ছিল, যার দ্বিতীয় লাইন হলো, بداران بنیکان ببخشد کریم কিন্তু এর প্রথম লাইন মনে পড়ছিলো না, বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলে তিনি প্রথমলাইন বলে দেন…
شنیدم که در روز امید وبیم
সেদিন বিশ্বাস করি যে, তিনি আলেম।

আমার প্রতি বৃদ্ধের বেশি এটেনশন দেখে অন্য খাদিমরা হিংসা করতে শুরু করে।

বৃদ্ধের খাবার আসত বাসা থেকে। খাদিমরা নিজেদের খাবার নিজেরা রান্না করত। তারা আমাকেও রান্নায় অংশগ্রহণ করতে বলে, অথচ আমি রান্নার কিছুই জানতাম না। খাদেমরা আমাকে খাবারও কম দিতে থাকে।

একদিকে বৃদ্ধের অস্বস্তিকর আচরণ, অপরদিকে খাদিমদের হিংসা, একদিন কাউকে না জানিয়েই সেখান থেকে চলে যাই।

সায়দাবাদ আসি । জানা ছিল, সায়দাবাদ থেকে দূরপাল্লার গাড়ি ছাড়ে।

ঠিক করলাম, যে গাড়ি সামনে পড়বে তাতেই উঠে যাব। পকেটে ছিল ১০০ টাকা। সিলেটগামী গ্রীন লাইনের একটা বাস দেখে তাতে উঠতে চাই। কিন্তু তারা ১০০ টাকায় নিতে রাজি হয় না। আমি অদূরে দাঁড়িয়ে থাকি। যখন বাস ছাড়ার টাইম হয় তখনও তা অর্ধেকের বেশি ফাঁকা। যেহেতু খালিই যাবে তাই ১০০ টাকাতেই আমাকে উঠিয়ে নেয়।

সিলেট যখন পৌঁছি, মানুষ তখন সবেমাত্র ঘুমের জগতে প্রবেশ করেছে। বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। অদূরে এক জায়গায় আলো দেখে এগিয়ে যাই।

সেটি একটি খাবার হোটেল ছিলো। হোটেলটি তখন বন্ধ হওয়ার দোরগোড়ায়। দুএকজন কর্মচারী আমার দিকে এগিয়ে আসে। কিছু প্রশ্নোত্তর হয়। একজন আমাকে হোটেলে খাবার খাওয়ায় এবং রাতে থাকার ব্যবস্থা করার জন্য তার বাসায় নিয়ে যায়।

বাসায় গিয়ে দেখি লোকটি খুবই গরীব। মুলির বেড়া দিয়ে বানানো ছোট্টো একটা ঘর। সেখানে গাদাগাদি করে তার স্ত্রী সন্তানেরা ঘুমাচ্ছে।

লোকটি মালের গরিব হলেও মনটা বড় ছিল। সে আমাকে লালন-পালন করতে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং মাদ্রাসায় ভর্তি করার ও জামাকাপড় বানিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু আমি তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেই। পরদিন সকালে তার থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি সিলেট রেলস্টেশনে।

স্টেশনের পাশে একটা মাদ্রাসা দেখি। যাতে শুধু মক্তব ও হেফজখানা রয়েছে। আমি মাদ্রাসায় ঢুকে ছাত্রদের সাথে কথাবার্তা বলি। তাদের মধ্যে একজনের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায়। এই মাদ্রাসার একটা বিষয় আমাকে অবাক করে, মাদ্রাসায় টিভি – ভিসিয়ার ছিল। তাদেরকে জিজ্ঞেস করি, মাদ্রাসায় টিভি কেন? তারা বলে, বিখ্যাত ক্বারীদের সিডি চালিয়ে এখানে মাশক্ব করানো হয়।

ছাত্রটি আমাকে হজরত শাহজালালের কবর দেখাতে নিয়ে যায়। সেখানে গেটের সামনে প্রচুর মিষ্টান্ন (তবারক) বিক্রি হয়। কিছু কিনে সে নিজেও খায়, আমাকেও দেয়।

রাতে মাদ্রাসায় থাকি। বৃহস্পতিবার হওয়ায় হুজুররা ছুটিতে ছিলেন। তাই ছাত্ররা টেলিভিশনের অপব্যবহারের সুযোগ পায়।

পরদিন আমি আর সেই ছাত্রটি মাদ্রাসার ছাদে বসা। সেখান থেকে মাদ্রাসার পেছনের বাড়িটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বাড়িতে বেশকিছু মেয়ে। তাদের কাপড়চোপড় খুবই অশালীন। চলন-বলনে বেহায়পনার ছাপ।

আমার ঘনিষ্ঠ ছাত্রটি বলে এরা পতিতা৷ এটা পতিতাবাড়ি। ছাদ থেকে এদেরকে দেখা যায় বলে মাদ্রাসার পক্ষ থেকে ছাদে আসায় নিষেধাজ্ঞা আছে। আমি তখন পতিতা শব্দের অর্থ বুঝতাম না। বললাম পতিতা মানে কী? সে ব্যাখ্যা করলো। আমি বুঝতে পারলাম।

নিষেধ হওয়া সত্ত্বেও আমি বিকেলে মাদ্রাসার ছাদে গিয়ে বসি। তাও পতিতা বাড়ির দিকে ফিরে। একটু পর মাদ্রাসার বাবুর্চি ছাদে আসে এবং আমাকে এখানে দেখতে পেয়ে ধমক দেয়। আমি ছাদ থেকে নেমে যাই এবং সেই মাদ্রাসা থেকেই চলে যাই। কারণ ছাত্ররা শুনলে ভাববে আমি বেশ্যাদেরকে দেখার জন্য গিয়েছি, যা লজ্জাজনক।

এবার সিলেট থেকে ঢাকায় ফেরার পালা। ঘনিষ্ঠ ছাত্রটি বিদায়ের সময় আমাকে (সম্ভবত) ৫০ টাকা দেয়। সেই টাকা রেখে বিনা টিকিটে ট্রেনে উঠি।

জানালা থেকে সিলেটের যে সৌন্দর্য সেদিন দেখেছিলাম তা আর কী বর্ণনা করবো। এখনো যেন চোখে লেগে আছে।

আখাউড়া স্টেশন আসার পর ট্রেন থেকে নামি টয়লেটের উদ্দেশ্যে। ট্রেনের টয়লেট ব্যবহারের আগ্রহ পাচ্ছিলাম না।

টাকার বিনিময়ে পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। এদিকে আমার ট্রেন মিস হয়ে যায়। পরবর্তী ট্রেন ছিল লোকাল। সেটাতেই উঠি এবং সীমাহীন কষ্টে পতিত হই। কারণ সেটা প্রত্যেক জায়গায়ই থামছিল।

এদিকে আমার চোখে ঘুম, মাথাব্যথা, গরম। তার উপর যাচ্ছি দাঁড়িয়ে। সব মিলে…

টিকেট চেকার আসলে লুকিয়ে পড়তাম। এভাবে বেশিরভাগ পথ চলে যায়। শেষ পর্যন্ত ঢাকার কাছাকাছি এসে চেকারের কাছে ধরা পড়ে যাই। এতে আমাকে (সম্ভবত) ২৫ টাকা দামের একটা টিকেট কাটতে হয়।

ঢাকায় নামার পর আমার অবস্থা হলো, চোখে ঘুম, পেটে ক্ষুধা। রাত পর্যন্ত ক্ষুধা এত বৃদ্ধি পায় যে চোখে অন্ধকার দেখতে থাকি। ক্রমশঃ তা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়। তখন আমি এমন একটা কাজ করি যা আগেপরে আর কখনো করিনি। পকেটে টাকা নেই জানা সত্ত্বেও একটা দোকানে গিয়ে কলা রুটি খাই এবং চুপচাপ কিছু না বলে হাঁটা দেই। দোকানদার পেছন থেকে ডাক দেয়। বলে টাকা দিয়ে গেলেন না? আমি বললাম, টাকা নেই। এমন সময় দোকানের আরেক কাস্টমার এগিয়ে এসে বলে, “নিশ্চয়ই সে ভুলে টাকা ফেলে এসেছে। বিল দেয়ার সময় পকেটে হাত দিয়ে দেখে টাকা নাই। আমারও অনেক সময় এমন হয়।” এই বলে সে বিল পরিশোধ করে দেয় এবং আরো কিছু খেতে চাইলে খেতে বলে।

এরপর দোহার পল্লী বাজার আসি। নিয়ত করি, ইবনে বতুতার মত শুধু সামনের দিকে হাঁটতে থাকবো। যতদূর যাওয়া যায়। যেসব এলাকা পার হবো সেগুলোর নাম লিখে রাখব। এ উদ্দেশ্যে কলম খাতা কিনি। একটার পর একটা এলাকা পার হই আর খাতায় লিখতে থাকি। পথ চলতে চলতে দেশের অন্যতম বৃহদাকার বিল “আড়িয়াল বিল” পাড়ি দেই।

প্রায় ১০ কিলোমিটার গাছ-গাছড়া বিহীন পথ। রোদে শরীর পুড়ে যায়। এভাবে ২০ কিলোমিটারের অধিক হেঁটে গালিমপুর পৌঁছি। সিদ্ধান্ত নেই সেখানে কিছুদিন থাকার। দেখি পকেটে ৬০ টাকা অবশিষ্ট আছে। ভাবলাম খুব হিশেব করে খরচ করতে হবে। এই টাকায় ৩০ দিনের খাবারের ব্যবস্থা করবো। কীভাবে? প্রতিদিন ২ টাকা দামের একটা বিস্কুট খাবো। এরপর সারাদিন শুধু পানি খাওয়া। কিন্তু ক্ষুধা এত প্রবল ছিল যে, প্রতিজ্ঞা ভুলে গিয়ে হোটেলে যাই এবং পুরো ৬০ টাকা খরচ করে ভাত খেয়ে ফেলি। গালিমপুর বাজারে একটা মসজিদের দ্বিতীয় তলার নির্মাণ কাজ চলছিল। এশার পর চুপে চুপে সেখানে উঠে ঘুমাই। পরদিন যে পথে এসেছিলাম সে পথেই হেঁটে ফিরে আসি।

এক ফ্রেন্ডের কাছে ১৫শ টাকা পেতাম। তাকে টাকা দিতে বলি। সে এক জায়গায় দেখা করে টাকা দিয়ে দেয়। সেই টাকা নিয়ে রওয়ানা দেই মাওয়ার দিকে। কারণ সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল রাত্রীযাপন। মাওয়ায় সেই সমস্যার সমাধান ছিল। সেখানে ফেরিতে বারবার আসা-যাওয়া করে রাত পার করা যেত। আর খাবারের জন্য পদ্মার উভয় পাড়ে প্রচুর হোটেল তো ছিলোই। ফেরিতেও হোটেল ছিল।

মাওয়া বেশকয়েকবার আসি। ফেরিতে রাত কাটাতে হতো দাঁড়িয়ে বা হাঁটাহাঁটি করে। এজন্য ফেরিঘাট সংলগ্ন পাচ্চর মসজিদে এক রাত্রে ঘুমাই। আমার কোমরে মানিব্যাগ ছিল। রাতে কে যেন সেখানে থাকা সকল টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। কিন্তু মানিব্যাগ কোমরেই ছেড়ে যায়।

টাকা কে নিয়েছে তা জানার জন্য কবিরাজ খোঁজ করি। মুন্সিগঞ্জের হাঁসারায় একজন কবিরাজের সন্ধান পাই। সে নাকি বলে দিতে পারে কে টাকা চুরি করেছে। তার কাছে যাওয়ার পর সে বলে, যে মসজিদে ঘুমিয়েছো সেই মসজিদের ইমাম সাহেব চুরি করেছে। আমি ওই কবিরাজের কথা বিশ্বাস করি এবং পাচ্চর ফিরে এসে সেই মসজিদের এক মুসল্লিকে বলি যে, কবিরাজ বলেছে, ইমাম সাহেব আমার টাকা চুরি করেছে। মুসল্লী বলে, এই কথা আর কাউকে বলো না। মাইর খেতে পারো। (আসলেই তো। একজন ভন্ড কবিরাজের কথার উপর ভিত্তি করে একজন ইমাম সম্পর্কে এমন ধারণা করা মহা অন্যায়।)

কয়েকদিন পর বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। আমার হাতে একটা নতুন লুঙ্গি ছিল। এটা কীভাবে হাতে এসেছিল মনে নেই। ফরিদপুরের ভাঙ্গা আসার পর বাসের জানালা দিয়ে লুঙ্গিটা পড়ে যায়। আমি বাস থামাতে বলি। এবং নেমে লুঙ্গিটা তুলে নেই। তারপর বাসকে চলে যেতে বলি।

আমার যেহেতু সুনির্দিষ্ট গন্তব্য ছিলো না৷ তাই বাগেরহাট নামলেই কী? ফরিদপুর নামলেই কী?

যাইহোক, ভাঙ্গা ঘোরাফেরা করতে থাকি। আশেপাশে থাকা মাদ্রাসাগুলো দেখতে যাই। আমার স্বভাব ছিল, যেখানেই যেতাম সেখানের মাদ্রাসাগুলোতে উপস্থিত হতাম।

এরপর বাগেরহাট আসি। বাগেরহাট বাসস্ট্যান্ডে একটা চায়ের দোকান সারারাত খোলা থাকে। সেখানে বসে রাত কাটিয়ে দেই। রাতের শেষ প্রহরে বাসস্ট্যান্ড মসজিদ খুলে দেয়া হয়। ফজরের আজান হয়। আমি মসজিদে প্রবেশ করি।

ফজর নামাজের পর ইমাম সাহেবের সাথে কথা হয়। ইমাম সাহেব বুঝতে পারেন আমি মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে এসেছি। তিনি আমাকে তার বাড়িতে আশ্রয়ে দেন। তার পরিবারের মানুষগুলো বেশকিছুদিন আমাকে আদরে-আপ্যায়নে রাখে।

এরমধ্যে একদিন ইমাম সাহেব আমাকে ফুঁসলিয়ে বাড়ির নম্বর নেন, এবং বাড়িতে ফোন দিয়ে আমার অবস্থান জানিয়ে দেন। পরদিন ভোরবেলা আমার বাসার লোকেরা এসে হাজির হয় এবং আমাকে নিয়ে যায়।

বাসায় ফেরার পর তাদের এই উপলব্ধি হয় যে, আমার মাদ্রাসায় পড়ার ইচ্ছা নেই। এজন্যই বারবার পালিয়ে যাই। তাছাড়া তখন শিক্ষাবর্ষের মাঝপথ ছিল। যা কোথাও ভর্তি হওয়ার উপযুক্ত সময় না। তাই পরবর্তী বছরের শুরুতে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর পরিকল্পনা করা হয়।

কিন্তু চলতি বছর শেষ হতে যে ৬ মাস বাকি, এই দীর্ঘ সময় বাসায় থাকলে বিপথগামী হওয়ার শংকা ছিল। এজন্য আমাকে কোন কাজে লাগিয়ে দেয়ার চিন্তাভাবনা করা হয়।

কী কাজে দেয়া যায় ভাবা হচ্ছিলো। এ সময় আমার মনে পড়ে এক তরুণের কথা, যার নাম সুমন বাপ্পি। পলায়নের দিনগুলোতে কমলাপুর রেলস্টেশনে তার সাথে পরিচয় হয়েছিল। সে বলেছিলো তাদের দোকানে একজন কর্মচারী দরকার। অবশ্য কর্মচারী হিশেবে নয়, বাড়ির ছেলের মতো রাখবে। দিনে দোকান দেখাশোনা করব। প্রয়োজনে রাত্রে মাদ্রাসায় পড়ার ব্যবস্থা করে দিবে। তার বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও। সে আমাকে একটা ফোন নম্বর দিয়েছিল। বলেছিল গফরগাঁও নেমে যেন ফোন দেই।

ময়মনসিংহ যাই। ট্রেনের ছাদে করে যাওয়ায় নতুন অভিজ্ঞতা হয়।

ময়মনসিংহ পৌঁছার পর সুমন বাপ্পি ফোন রিসিভ করলো না।

শুধু ফোন নম্বরের ভরসাতেই গিয়েছিলাম। বাড়ির ঠিকানা জানতাম না। এবার কী হবে?

তাকে খোঁজাখুঁজি করে হতদ্যম হয়ে পড়ি। এদিকে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। রাত্রিযাপনের ব্যাপারেও চিন্তিত হই। গফরগাঁও রেলস্টেশনের কাছাকাছি একটা মসজিদ আছে। তার বারান্দায় শোয়ার ব্যাপারে ভাবছিলাম। এর মধ্যে স্টেশনে এক স্থানীয় লোকের সাথে দেখা হয়। কিছু কথাবার্তার পর তিনি আমাকে প্রস্তাব দেন তার বাসায় ঘুমানোর৷ আমি রাজি হই।

গ্রামের অন্ধকার রাস্তা ধরে সে আর আমি হাঁটছি। দিগন্ত বিস্তৃত নির্জনতা। সে কিছু কিছু কথা বলছে, যার সবই অপ্রাসঙ্গিক। আমার ব্যাপারে সে বাসায় জেরার মুখে পড়ার আশংকা করছিলো।

সে বলে, তার বাসার মানুষ যদি জিজ্ঞেস করে ছেলেটি কে? তখন সে বলবে আমি তার বন্ধু। আমিও যেন তাই বলি। কী হাস্যকর কথা! উনার বয়স ৩৫ প্লাস। আর আমি এক কিশোর। উনি কীভাবে আমার বন্ধু হতে পারে।

সে অকারণ অনুগ্রহও করতে চায়। যেমন আমাকে পরবর্তী দিন বাড়িতে ফেরার জন্য গাড়ি ভাড়া দিতে চায়।

ধীরে ধীরে তার কুমতলব প্রকাশিত হতে থাকে। আমি তার সঙ্গ পরিত্যাগ করি। বলি আপনার সাথে যাব না। সেও বিশেষ জোড়াজুড়ি করেনি। কেননা সে বাসায় জবাবদিহির ব্যাপারে ভয় পাচ্ছিল।

চলে আসি স্টেশনের পাশের মসজিদে। বারান্দায় ঘুমাই। শেষ রাতে কেন যেন ঘুম ভেঙ্গে যায়। শোয়া থেকে উঠে বাইরে তাকাই। দেখি, পাশের দীঘির জলে চাঁদের প্রতিবিম্ব দোল খাচ্ছে। দৃশ্যটা ভাল লেগেছিল। সেই রাত্রের গভীরতায় কত যে বিচিত্র চিন্তা মাথায় আসতে থাকে। একসময় কল্পনার জগত পেরিয়ে প্রবেশ করি ঘুমের রাজ্যে।

সকালে ভাবতে থাকি ফেরার টাকা কীভাবে ব্যবস্থা হবে। আমি ফেরার ভাড়া নিয়ে আসিনি, কেননা আমার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল না।
তখন মোবাইলও ব্যবহার করতাম না। হঠাৎ মনে পড়ে মশাখালী নামক গ্রামের কথা। আমার জন্মের পরপর সেখানে ৩-৪ বছর ছিলাম। সেখানে আমাদের কিছু আত্মীয়ও রয়েছে।

মশাখালী গফরগাঁও থানার অন্তর্গত – এতটুকু শুধু জানা ছিল। আর কিছু জানতাম না। খবর নিলাম। প্রায় আট-দশ কিলোমিটার দূর।

গফরগাঁও থেকে হেঁটে মশাখালি যাই।

সেই ৩-৪ বছর বয়সে এই গ্রাম ছেড়েছিলাম। তারপর আজ আসা। এখান থেকে যাওয়ার পর এই গ্রামের সাথে সম্পর্ক রাখার মতো কোনো মাধ্যম ছিলো না। এমনকি এর ব্যাপারে কারো সাথে আলোচনাও হতো না।

গ্রামের ঘরবাড়ি, বৃক্ষরাজির দিকে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করি। কিন্তু চিনতে পারি না৷ এলাকার কারো নামও মনে নেই যে, জিজ্ঞেস করবো।

মানুষকে বলি, ভাই! এই এলাকায় প্রায় এক দশক আগে বড় ধরনের একটা মারামারি হয়েছিলো সেই স্থানটা কোথায়? কেউ বলতে পারলো না।

মনে আছে, আমি যখন অতি ক্ষুদ্র, একটা মাঠে তীব্র মারামারি হয়েছিল। সেখানে রামদা দিয়ে কুপিয়ে বেশকিছু মানুষ মারা হয়। আমি পাশে দাঁড়িয়েই সেই ঘটনা দেখেছি। গফরগাঁওয়ের মানুষ তখন মারামারির জন্য সারা দেশে বিখ্যাত।

চিনতে না পারায় হতাশা ঘিরে ধরতে থাকে, তবু চলা অব্যাহত রাখি। গ্রামের এক প্রান্ত পার হয়ে অপর প্রান্তে যখন প্রবেশ করি, মনে হলো, লুকিয়ে থাকা স্মৃতিরা সাড়া দিচ্ছে।

একটা পুকুরে দেখি কয়েকজন গোসল করছে। মনে পড়ে, এই পুকুরেই আমার বাবা আমাকে গোসল করিয়ে দিতেন। আর ওই মাঠে হয়েছিল ভয়ংকর মারামারি।

সেই ঘরও চিনে ফেললাম যেখানে আমার শৈশব কেটেছে। ঘরটি মাটির। আমরা সেখানে ভাড়া থাকতাম।

নিশ্চয়ই সেখানে এখন অন্য কোন পরিবার থাকে। দুরু দুরু বুকে এগিয়ে গেলাম। উঠানে কিছু মহিলা বসা। তাদের সালাম দিলাম। ভাবছিলাম এটাই কি সেই ঘর নাকি অন্য কোন বাড়িতে এসে পড়লাম? কার নাম বলবো? কারো নামই তো মনে নেই। হঠাৎ মনে পড়লো শৈশবের আমার দুজন খেলার সাথীর কথা। একজনের নাম তাসলিমা, অপরজনের নাম সিবিন।

জিজ্ঞেস করি, এটা কি তাসলিমাদের বাড়ি? তারা আমার দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায়। আমার ভাবনায় ছিল না যে, তাসলিমা তো আর এখন শিশু নেই। বরং পূর্ণাঙ্গ কিশোরী। কারো বাড়ি খুঁজতে হলে পুরুষ মানুষের নাম বলতে হয়, কিশোরী মেয়েদের নাম বললে সন্দেহ তো হবেই। দ্বিতীয় যে নামটি বললাম সেটিও একজন কিশোরীর। তাদের অস্বস্তি বৃদ্ধি পায়। ভাবে, এই ছেলে শুধু কিশোরী মেয়েদের কেন খুঁজছে। এরপর বুদ্ধি খাটিয়ে আমি আমার বাবার নাম বলি।

বাবার নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা আমাকে চিনে ফেলে। আমাকে দেখে খুশি হয়। তারা বলে, তাসলিমারা তো কয়েক মাস আগে এখান থেকে চলে গেছে। তবে দ্বিতীয়জন আছে (যেহেতু সে স্থানীয়)।

মহিলারা আমাকে ঘরে নিয়ে খেতে বসায়। একটি কিশোরী মেয়ে খাবার বেড়ে দেয়। মহিলারা বলে এটাই তোমার ছোটবেলার বান্ধবি। অবাক হলাম, কারণ ছোটবেলায় মেয়েটির চেহারা “অন্যরকম” ছিল। আসলে আল্লাহ তায়ালা কৈশোরে ও তারুণ্যে মেয়েদের ভেতর এক ধরনের সৌন্দর্য সৃষ্টি করে দেন, যাতে তাদের বিয়ে দেয়া সহজ হয়। কিন্তু অনেক মানুষ এই সৌন্দর্য অপাত্রে ব্যবহার করে। আর শৈশবে মানুষকে দেন কিউটনেস, যাতে তার অক্ষমতা, অপূর্ণতা সত্ত্বেও রিজিকের অভাব না পড়ে, আদরের অভাব না পড়ে।

যাইহোক, যেহেতু ছোটবেলার অকৃত্রিমতা আর ছিল না, বরং একটা জড়তা ছিল উভয়ের মধ্যে। তাই তার সাথে তেমন একটা কথা হলো না।

মশাখালী গ্রাম আমার আবেগকে স্পর্শ করল। আমি ফিরতে থাকি হারানো শৈশবে। মনে পড়তে থাকে সেই চিন্তাভাবনা-হীন দিনগুলো, মনে পড়তে থাকে নির্দোষ হাসি, কান্না আর আনন্দগুলো।

ভাবি, এই মাটি, এই বৃক্ষরাজী একদিন যে অবুঝ শিশুকে খেলাধুলা করতে দেখেছে তারা কি চিনতে পারছে তাকে বড় হওয়ার পর? আমি যেমন তাদের মিস করেছি সর্বদা, তারাও কি মনের মণিকোঠায় রেখেছে আমায় জাগরূক?

ওই মহিলারা আমার এক আত্মীয়ের বাসার সন্ধান দেয়। আত্মীয়দের মধ্যে দুএকজন আমাকে সন্দেহ করে যে, এত বছর পর আমি হঠাৎ একাই উপস্থিত হলাম কেন? জামা কাপড় ময়লা, চেহারা ধুলোমলিন, রহস্য কী?

আমার আগমনটা অস্বাভাবিক মনে হয় তাদের কাছে। সন্দেহ করে, আমি পালিয়ে এসেছি। তারা আমার তেমন যত্ন আত্তি করল না। সকালবেলা অবশ্য ভাড়ার টাকা দিয়ে দেয়। এবং আমি ফিরে আসি বাসায়।

ময়মনসিংহের কাজটা পেলাম না। অতএব আমাকে ঢাকা এলিফ্যান্ট রোডে একটা পোশাক কারখানায় নিযুক্ত করা হয়।

সাত তলা বিল্ডিংয়ের উপরতলায় ৯-১০ জন কর্মচারীর এক সংসার। আমার পজিশনের নাম পিচ্চি। এ ধরনের কারখানায় কারিগরের বাইরে একটা পদ পিচ্চি। তার ডিউটি হলো কারিগরদের যখন যা দরকার তা আনা নেওয়া করা। চা-বিস্কুট, সিগারেট হোক অথবা পার্সোনাল কোন জিনিস। এছাড়া সুতা কেনা, সুতা কাটা, বোতাম লাগানো, প্যাকেজিং ও লেভেলিং এবং মাল ডেলিভারি দেওয়া। বিনিময়ে তারা আমার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করবে।

এই জগতটা ছিল আমার জানাশোনা জগত থেকে আলাদা। যার সাথে আমার বিন্দুমাত্র পরিচয় ছিল না। এখানকার মানুষগুলো ছিলো ধর্মীয় ভাবনা থেকে যোজন যোজন দূরে। আষ্টেপৃষ্ঠে ছিল পাপাচার ও অশ্লীলতায় ক্লেদ। পক্ষান্তরে আমি মাদ্রাসার ভুবনের মানুষ, যেখানে বিরাজ করে কুরআন হাদিসের নূর।

তারা মাঝেমধ্যে ভিসিআর ভাড়া করে এনে সিনেমা দেখত। রাত যত গভীর হতো সিনেমার ধরন পাল্টাতে থাকত। অবশ্য আমার উপস্থিতিতে লজ্জা পেত। কিন্তু আমি ঘুমানোর পর চালু করতো অশ্লীল সিনেমা ও পর্ন।

সাধারণত কারিগররা পিচ্চিদের কাজ শেখায় না। কেউ চাইলে নিজ আগ্রহে শিখতে হয়। যেহেতু আমার গার্মেন্টসের কারিগর হওয়ার ইচ্ছে ছিলো না, তাই কাজ শেখার চেষ্টা করিনি। আমি জীবনে যত যাই করেছি, এক মুহুর্তের জন্যও আলেম ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় ধারণ করার চিন্তা করিনি।

তবে শখ করে মাঝেমধ্যে মেশিনে বসতাম এবং টুকরো কাপড় সেলাই করতাম। একবার এক কারিগর বাইরে গেলে তার মেশিনে বসি। কাজ করতে গিয়ে তার মেশিনের সুঁইটা ভেঙ্গে ফেলি।

বিকেলবেলা ফ্লোরে ঘুমাচ্ছিলাম। ওই কারিগর এসে আমার কোমরে লাত্থি দেয়। ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে আমাকে বকাঝকা করে। এই ঘটনায় আমি সোজা বাড়িতে এসে মায়ের কাছে বিচার দেই। এরপর মা ওই লোকটিকে ফোন করে শাসিয়ে দেন। এবং ভবিষ্যতে এরকম করার ব্যাপারে সাবধান করে দেন।

লোকটার ভিতরও অনুশোচনা তৈরি হয়, সে আমাকে জানায়, এই সুঁইটা সে ১৭ বছর যাবত ব্যবহার করছে। তাই এটা ভাঙ্গার খবর শুনে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। সে নানাভাবে আমাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে। আমিও মাফ করে দেই।

আমাদের সাথে এক বৃদ্ধা মহিলা অনাবাসিকভাবে কাজ করত। সবাই তাকে নানি বলতো। তার বেতন ছিল মাত্র ২৫০০ টাকা। তার আর আমার পজিশন ছিল অনেকটা একই। অর্থাৎ আমরা দুজনই সর্বনিম্ন শ্রেণীর কর্মচারী ছিলাম। সুতরাং আমাদের মধ্যে তো সংঘাত অনিবার্যই ছিল।

আমরা একে অপরকে অপছন্দ করতাম। একবার সে আমার সাথে একটা দুর্ব্যবহার করে। ফলে আমি রাগান্বিত হয়ে তার মাথার চুলের কিছু অংশ কেটে ফেলি।

তার মাথায় এমনিতেই চুল কম ছিলো। তার উপর স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধ বয়সে চুলের কদর বেশি থাকে।

অতএব সে ভয়ানক ক্ষেপে যায়। আমার নামে মালিকের কাছে নালিশ করে। মালিক আমাকে কান ধরে উঠবস করতে বলে। (এই ঘটনা মনে পড়লে খুব খারাপ লাগে, আমি বুড়ি মানুষটিকে কেন যে এই কষ্টটা দিয়েছিলাম!)

কাজের প্রয়োজনে সাত তলা থেকে প্রতিদিন অনেকবার উঠানামা করতে হতো; কখনো কখনো ভারী জিনিসপত্র নিয়ে। আমার পরিশ্রমের অভ্যাস ছিল না। ফলে শরীরে প্রচুর ঘামাচি উঠে ।

শবে বরাতের সময় মালিক আমাদের সবাইকে তার বাসায় দাওয়াত করে খাওয়ায় এবং কিছু বোনাস দেয়।

মনে আছে, আমি শার্ট-প্যান্ট পড়ে তার বাসায় গিয়েছিলাম। যদিও এতে অনভ্যস্ত ছিলাম, কিন্তু শার্টের কারখানায় কাজ করার দরুন রিজেক্টেড শার্ট সহজেই সংগ্রহে এসে যেত। ফলে বহুদিন পর সেদিন শার্ট-প্যান্ট পড়া হয়।

দেখতে দেখতে রমজান মাস চলে আসে এবং পোশাক কারখানার কাজের চাপ ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। দিন নেই, রাত নেই, আমি বড় বড় কার্টুন মাথায় নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করি। রমজানে আমরা কাজ করতাম রাত তিনটা পর্যন্ত।

এমনও হয়েছে, ঘড়িতে রাত একটা/দুইটা বাজে, আমি এলিফ্যান্ট রোডে শার্টের স্তুপ মাথায় নিয়ে যাচ্ছি।

কাজ শেষ হলে কারিগররা তাশ খেলতে বসতো। আমি থাকতাম দর্শক। ঘন্টাখানেক খেলার পর সবাই সাহরি খেত। রোজাটা সকলেই রাখত। আর কিছু না হোক, সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসলামের এই বিধানটি কেন যেন পালনের চেষ্টা দেখা যায়।

তাদের একটা ভালো গুণ ছিলো, কাজের চাপ থাকলেও আমাকে কখনো নামাযে বাঁধা দিতো না। এশা ও তারাবিহর জন্য লম্বা ছুটি দিত।

কারখানার বেশিরগভাগ লোকই ছিল ধূমপায়ী। কেউ কেউ চেইন স্মোকার। সবার সিগারেট কেনার দায়িত্ব ছিল আমার। আমি সকল সিগারেটের মূল্য জানতাম। একদিন মনে হলো, সিগারেট খেয়ে দেখি কেমন লাগে। তো গোসলখানায় গিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে টান দেই। জঘন্য লাগে। আমি গোসলখানা থেকে বেরোনোর পরপর অন্য কারিগর সেখানে গিয়ে সিগারেটের গন্ধ পায় এবং হাঁকডাক শুরু করে, “গোসলখানার ভেতরে কে সিগারেট খেয়েছে?” ধরা পড়ার ভয় আমাকে বিচলিত করে তুলে। আর কখনো সিগারেট মুখে নেইনি।

একবার কারখানায় একটা মোবাইল চুরি হয়। আমি ভয় পেয়ে যাই। কারণ বয়সে ও পজিশনে আমি সবার ছোট। তাছাড়া আমি ছাড়া সবারই মোবাইল আছে। সুতরাং সন্দেহের তীর আমার দিকেই তাক হওয়ার কথা। আমার এই ভীতি – যার মোবাইল হারিয়েছে তার চোখে পড়ে। ফলে তার সন্দেহ আরো ঘনিভূত হয় যে, আমিই চুরি করেছি। কিন্তু বাকি কারিগররা বলে, না, এই ছেলে চুরি করার কথা না।

যার মোবাইল হারিয়েছিল তার কাকার নাম আলমগীর। তিনি রাতে আমাদের সাথেই থাকতেন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন ক্যাডার। এলাকার আবাসিক হোটেলেগুলোতে তিনি বিনা টাকায় থাকতেন। এবং যেকোনো খাবার হোটেলে বিনা টাকায় খেতেন। কখনো কখনো আমাকে দিয়ে খাবার আনাতেন। তার নাম বললেই খাবার দিয়ে দিত, টাকা চাইতো না। তিনি মাঝেমধ্যে গল্প শোনাতেন, বিএনপির আমলে কীভাবে পুলিশের সাথে মারামারি করেছেন। কাকে গুলি করেছেন, কোথায় বোমা মেরেছেন – এইসব।

আলমগীর ভাই এলিফ্যান্ট রোড এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা তুলতেন। বাটা সিগনালের দিকে একটা ক্যাসিনো ছিল। বাইরে থেকে মনে হতো বন্ধ দোকান। কিন্তু শাটার উঠালে ভিতরে বিশাল এক ক্যাসিনো। তাতে প্রচুর মানুষ জুয়া খেলতো। এখান থেকে তিনি প্রতিদিন ১০০ টাকা চাঁদা নিতেন। স্বাভাবিক কারণেই তিনি সেখানে স্বশরীরে যেতেন না। বরং টাকা তোলার দায়িত্ব আমার উপর ন্যাস্ত করেছিলেন। আমি প্রতিদিন সেখানে গিয়ে ১০০ টাকা এনে ৮০ টাকা তাকে দিতাম। আর ২০ টাকা রেখে দিতাম। এই ভাগাভাগি তার নির্দেশেই হতো।

আলমগীর ভাই যখন শুনলেন তার ভাগ্নের মোবাইল হারিয়ে গেছে, তখন তিনি আমাকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করলেন না। তিনি সন্দেহ করলেন কাটিং মাস্টারকে। আসলে অধিকাংশ লোক কাটিং মাস্টারকেই সন্দেহ করছিল।

আলমগীর ভাই একটা গালি দিয়ে কাটিং মাস্টারকে বললেন, স্বীকার না করলে গুলি করে মেরে ফেলবো। এতে ভয়ে কাটিং মাস্টার মোবাইল চুরির দায় নিয়ে জরিমানা দেয়। আমার নির্দোষিতা প্রমাণিত হয়ে যায়।

আমি নিউমার্কেট, মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার, সুবাস্তু আর্কেড, ইস্টার্ন মল্লিকা, আলপনা প্লাজা সহ অনেক জায়গায় মাল ডেলিভারি করতাম। যখন ঈদ ঘনিয়ে এলো তখন কেউ কেউ আমাকে বলল যে, এদিকে কালচার হলো পিচ্চিরা উপরের পজিশনের কারিগর-ম্যানেজারদের কাছে বোনাস চাইতে পারে। কেননা সারা বছর তাদের সেবা করেছে। আর ঈদের আগে যে সমস্ত দোকানে মাল ডেলিভারি করবে সেখান থেকেও বোনাস চাইতে পারে। কিন্তু স্বভাব-লজ্জার কারণে এই বোনাস চাওয়া আমার পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। তবু একদিন অনেক সংকোচের পর নিউমার্কেটের এক দোকানদারের কাছে বোনাস চাই। তিনি বলেন, বেচাকেনা ভালো যাচ্ছে না, এই-সেই।

এরপরে আর কারো কাছে বোনাস চাইনি।

এখানে ৬ মাস ছিলাম। রমাজানের সাতাইশায় বিদায় নেই। শেষদিন মালিক শার্ট প্যান্ট উপহার দেয়। তার দোকান থেকে বেছে যেকোনো শার্ট-প্যান্ট নিতে বলে, মূল্য যতই হোক। আমি তো এইসব পড়তাম না। তাই নিয়ে আরেকজনকে দিয়ে দেই।

সেই জগতটি ছিলো ঘুটঘুটে আঁধারে ঘেরা মারিয়ানা ট্রেঞ্চ। যার প্রভাবে আমার ভেতর থেকে ওই আলো হ্রাস পেতে থাকে যা আমি মাদ্রাসা থেকে লাভ করেছিলাম। অপরাধবোধ নষ্ট হতে থাকে। খারাপ কাজের উপর থেকে ঘৃণাবোধ কমতে থাকে। সময়টা ছিল বয়সন্ধিকাল। সেটাই হতে পারত মাদ্রাসা-জীবন থেকে আমার চির বিদায়। হতে পারতো অন্ধকার জগতে আমার অনুপ্রবেশ।

কিন্তু আল্লাহ তাআলা রক্ষা করলেন। গুনাহের ময়লায় মাখামাখি আমাকে আবারও ইলমের আবে-হায়াতে বিধৌত হওয়ার সুযোগ দিলেন।

কিন্তু আমি অধম তৃতীয়বারও পালাই। তখন বয়সে খানিকটা বড়। পলায়নের প্রথম স্টপেজ ছিলো দোহার ফুলতলা মসজিদ। সেখানে একদল তাবলীগ জামাতের লোক অবস্থান করছিলো। আমি তাদেরকে সংগীত গেয়ে শোনানোর পর তারা খুব পছন্দ করে এবং আমাকে তাদের সাথে রাখে। জামাতের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও তারা আমাকে ছাড়লো না। সাথে করে নিজ এলাকায় নিয়ে যায়।

তাবলীগের সাথীরা একেকদিন একেকজনের বাড়িতে আমাকে মেহমানদারি করে। এমনকি কিছুটা কাড়াকাড়ি হয় আমাকে নেয়ার জন্য।

কিন্তু কতদিন আর এভাবে থাকা যায়। সেখান থেকেও বিদায় নেই। আসি ঢাকা সদরঘাট। সেখানে ঘাটের পাশে একটা মসজিদ প্লাস মাদ্রাসা রয়েছে, যার একাংশ বুড়িগঙ্গা নদির উপরে। এই মাদ্রাসাটা চলার পথে দেখতাম। তাই ভর্তি হওয়ার জন্য এখানে আসা।

শুনলাম এখানে থাকা খাওয়া, কাপড়-চোপড়, তেল, সাবান, চিরুনি, জামা টুপি সবকিছু ফ্রী। কেউ নিজের টাকায় কেনা জামাকাপড় গায়ে দিতে পারে না। এমনকি নিজের টাকায় তেল সাবানও কিনতে পারে না। যা কিছু লাগে সব মাদ্রাসা থেকে নিতে হয়।

কিন্তু এখানে ভর্তির কোটা শেষ। তাই কর্তৃপক্ষ আমাকে ভর্তি করতে অপারগতা প্রকাশ করে এবং মুন্সিগঞ্জের বিবন্দী নামক এলাকায় একটা মাদ্রাসার সন্ধান দেয় ও ভর্তি হতে পাঠায়।

আমি প্রায় ৩০ কিলোমিটার হেঁটে ও ৫-৬ কিলোমিটার গাড়িতে চড়ে ওই মাদ্রাসায় পৌঁছি। আমার কাছে একটি টাকাও ছিল না। সুতরাং আমি অত্যন্ত ক্ষুধিত ও ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় সেখানে উপস্থিত হই। উস্তাজ আমাকে দেখে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন, “অন্য কথা পরে, আগে ওর খাবারের ব্যবস্থা করো।” তিনি টাকা বের করে দেন চা-বিস্কুট আনার জন্য।

এরপর উস্তাজ বললেন, এখানে খাবার ফ্রি, তবে ভর্তির টাকা দিতে হয়। আমি বললাম, আমার কাছে টাকা নেই। উস্তাজ বললেন অল্প কিছুও কি দিতে পারবে না? আমি বললাম জিনা। আমার অক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য করে তিনি ভর্তির টাকা মওকুফ করে দেন।

উস্তাজ জানতেন না যে, আমার পরনের জামা ছাড়া আর কোন পোশাক নেই, কিন্তু ছাত্ররা জানতে পারে, এবং তারা তাদের অতিরিক্ত লুঙ্গি, গেঞ্জি, পাঞ্জাবি, কাঁথা-বালিশ আমাকে দেয়।

ওই মাদ্রাসায় মাঝেমধ্যেই কুরআনের খতম আসত। যেহেতু আমি হাফেজ ছিলাম, মাদ্রাসার পক্ষ থেকে আমাকেও খতমে পাঠানো হতো। সেখান থেকে যা হাদিয়া আসতো তা দিয়ে আমার হাতখরচ চলতো।

তখন শীত আসি আসি করছে। কেউ কেউ অলরেডি লেপ-কম্বল ব্যবহার শুরু করেছে। আমি তখনও পাতলা কাঁথা গায় দেই। এক রাতে প্রচন্ড ঝড় হয় এবং আচানক শীত জাঁকিয়ে বসে। গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। পাতলা কাঁথায় শীত মানছিলো না। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি প্রচন্ড ঝড়-তুফান হচ্ছে। কী গায়ে দিব খুঁজতে থাকি। অবশেষে উস্তাজ যেই তোশকে বসে ক্লাশ নেন সেটা গায়ে দেই।

উস্তাজও রাত্রেবেলা কোন কারণে ঘুম থেকে উঠেছিলেন। দেখেন আমি তার তোশক গায়ে দিয়ে ঘুমাচ্ছি। এই দৃশ্য তাকে ব্যাথিত করে। পরদিনই তিনি আমার জন্য লেপের ব্যবস্থা করেন।

আমি বিভিন্ন কারণে কুরআন মাজিদ ভুলতে বসেছিলাম। কিন্তু এই উস্তাজের পড়ানোর মান এত ভাল ছিলো যে, বছরের শেষদিকে একটানা ২৫ পারা নির্ভুল শুনাই।

মাদ্রাসায় সাপ্তাহিক একটা পরীক্ষা হতো, ত্রৈমাসিক পরীক্ষা তো ছিলোই। এই হিশেবে বছরে প্রায় ৪০ প্লাস পরীক্ষা। এর মধ্যে কোনো পরীক্ষাতে কুরআন মাজিদের কোথাও আটকাইনি।

অন্য মাদ্রাসার কোনো হুজুর আসলে উস্তাজ আমাকে ডাকতেন। তারপর সেই হুজুরকে বলতেন আমাকে প্রশ্ন করতে। এই পরীক্ষাতেও কখনো আটকাইনি। এর ক্রেডিট উস্তাজের। আর, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।

উস্তাজ আমাকে অনেকভাবে সাহায্য করার পরও তার সাথে শেষটা ভালো যায়নি। ঘটনা হলো, মাদ্রাসায় পরীক্ষার পর ছুটি দেয়া হয়। বন্ধের মধ্যে আমি এবং আরেকটা ছাত্র মাদ্রাসায় থাকি। সেই ছাত্রের সাথে কোন একটা বিষয়ে আমার দ্বন্দ হয়। মাদ্রাসা খোলার পর সে আমার নামে মিথ্যা কথা বানিয়ে বিচার দেয়। ছাত্রটা ছিল উস্তাজের দেশী। এজন্য উস্তাজ তার পক্ষ নেন এবং আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। আমি কসম করার পরও তিনি আমার কথা বিশ্বাস করেননি। সে থেকে আমাদের মধ্যে দূরত্ব শুরু হয়।

উস্তাজ এমন মানুষ ছিলেন, কারো সাথে সুসম্পর্ক থাকলে তার জন্য সাধ্যের চেয়ে বেশি করতেন। আর কারো সাথে দুশমনি থাকলে তার প্রতি তীব্র আক্রোশ দেখাতেন।

অতএব বিভিন্ন বিষয়ে তিনি আমার ভুল ধরতে থাকেন। আমিও একই ক্যাটাগরির ছিলাম, বরং আরো বেশি ঘাড়ত্যাড়া ছিলাম। আমিও তার বিভিন্ন অনিয়মের ব্যাপারে প্রিন্সিপালকে জানাই।

তার অগুনতি অনিয়ম ছিলো। একটা বলি, তিনি হেফজাখানার সবার কাছ থেকে ভর্তির টাকা নিতেন। অথচ সেখানে ভর্তি ফ্রি। টাকাটা তিনি ফান্ডে দিতেন না, নিজে নিতেন। এছাড়া মাদ্রাসায় কোনো দান আসলেও মাঝেমধ্যে তিনি রেখে দিতেন। প্রিন্সিপাল সবই জানতো, কিন্তু ভয়ে কিছু বলতো না।

তিনি কতটা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছিলেন তার একটা উদাহরণ দেই, আমি যখন কপর্দকশূন্য অবস্থায় মাদ্রাসায় এসেছিলাম, তখন তিনি একজন ধনী মুসল্লির কাছ থেকে আমার জন্য পাঞ্জাবির কাপড় এনেছিলেন। দ্বন্দের পর সেটা আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি ধনী মুসল্লিকে বলেন, এই ছাত্রের চেয়ে অন্য ছাত্রের বেশি প্রয়োজন। সুতরাং তারটা ফেরত নিয়ে অন্য ছাত্রকে দিয়ে দিব। ধনী মুসল্লী বলেন, কাউকে কিছু দেয়ার পর ফেরত নেওয়াটা ভালো দেখায় না। ওই ছাত্রকে প্রয়োজনে আরেকটা দিব। তিনি অনেক চেষ্টা করেও কাপড়টা আমার কাছ থেকে নিতে ব্যর্থ হন।

তিনি পারলে আমাকে বহিষ্কার করে দিতেন। কিন্তু সেটা সম্ভব ছিল না। কারণ মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল তাকে অপছন্দ করতো, আর আমি তার শত্রু হওয়ায় প্রিন্সিপালের অনুরাগ-ভাজন ছিলাম।

শেষ পর্যন্ত এই লড়াইয়ে আমি বিজয়ী হই। আমার বিরোধিতাই তার মাদ্রাসা থেকে বিদায়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রেক্ষাপট এভাবে তৈরি হয় যে, তিনি অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন বাড়িতে থাকেন। যদিও অসুস্থতা ছিলো অল্প। মূলত আলসেমি করেই মাদ্রাসায় আসতে দেরি করছিলেন।

প্রিন্সিপাল তো তাকে বিদায় করার সুযোগ খুঁজছিলই; তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি সেই সুযোগ এনে দেয়। প্রিন্সিপাল নিজ ভাগ্নেকে শিক্ষক হিশেবে নিয়ে আসে এবং উস্তাজকে ফোন দিয়ে বলে, ছাত্ররা আপনার নামে বিভিন্ন অভিযোগ জানিয়েছে, আপনি আর না আসলে ভাল হয়।

বিষয়টিকে সে নিজের দিকে সম্পৃক্ত না করে ছাত্রদের উপর চাপিয়ে দেয়। কেননা তিনি উস্তাজকে ভয় পেতেন।

উস্তাজ বলেন, কোন ছাত্র? নাম বলেন। প্রিন্সিপাল আমার নাম বলে। আমিও সেটা শুনে একসেপ্ট করে নেই।

উস্তাজ অদ্ভুত মানুষ ছিলেন, আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি করতেন। পার্শ্ববর্তী মসজিদ মাদ্রাসার হুজুরদের নিয়ে প্রতিদিন নাস্তা খেতেন, সব সময় বিল তাকেই দিতে দেখা যেত।

এইসব কারণে তিনি সর্বদা ঋণগ্রস্ত থাকতেন। আর বেতন সাধারণত অগ্রিম নিয়ে নিতেন। প্রিন্সিপালও দিতে বাধ্য থাকতো।

বিকেলে আমরা ক্রিকেট খেলতাম। মাঝেমধ্যে তিনিও অংশ নিতেন। ব্যাটিংয়ে নামলে সহজে আউট দিতে চাইতেন না। সবাই দেখেছে আউট, কিন্তু তিনি অস্বীকার করতেন। তিনি ভালো ফুটবলও খেলতেন।

গুলতি চালানোতে এত দক্ষ ছিলেন যে, তার জুড়ি আর দেখিনি। প্রতিদিনই দুএকটা জালালি কবুতর মেরে খেতেন।

পরিবারের প্রতি তার তেমন দায়িত্ববোধ ছিলো না। ছেলেমেয়েদের খেয়াল রাখতেন না। আমরা যে বছর পড়তাম, সে বছর উনার বড় মেয়ে পাশের বাসার একটা ছেলের সাথে প্রেম করে পালিয়ে যায়। ছোট মেয়েটি মাঝেমধ্যে মাদ্রাসায় আসতো, আমরা আদর করতাম। কয়েক বছর পর শুনেছিলাম, ছোট মেয়েটিও একজনের সাথে চলে গেছে।

মাদ্রাসা-মসজিদের মক্তবে একঝাঁক কিশোরী পড়তে আসত। তাদের একজন খুবই দুষ্টপ্রকৃতির ছিল। নাম উল্লেখ করছি না। মাঠে, ঘাটে, রাস্তায় যেখানেই দেখা হতো, একটা না একটা অনর্থক মন্তব্য করতো। যেমন “ভাব দেখায়, ঢং, পাগল” ইত্যাদি। আমি কখনো উত্তর দেইনি। একবার হেঁটে কোথাও যাচ্ছিলাম, সে সামনাসামনি পড়ে। আমাকে বলে “হাফ লেডিস”। শুনে রাগ উঠে। আমি ফ্রেন্ডদের কাছে গিয়ে বিষয়টা বলি। তারা আমাকে যে রিপ্লাই শিখিয়ে দেয় তা বলা খুব কঠিন মনেহয়। তবু বলতে রাজি হই।

মেয়েটা মক্তব শেষে ঝাড়ু দিচ্ছিলো, আমি গিয়ে বলি “হাফ লেডিস নাকি পূর্ণাঙ্গ পুরুষ তা বুঝতে হলে…”।

এদিনের পর নতুন এক উপদ্রব শুরু করে সে; তার ভাইকে দিয়ে প্রচুর লাভ লেটার পাঠাতে থাকে। এতে সে হৃদয় উজাড় করা ভালবাসা প্রকাশ করে৷ তার ছোটভাই আমাদের সাথেই পড়তো। আমি দুএকটা চিঠির উত্তর দেই। তাতে লিখি, আপনি আমার চেয়ে বয়সে বড় হবেন। আর বয়সে বড় কারো সাথে প্রেম করা সম্ভব না (এটা ছিল বাহানা)।

ভালবাসতে পারবো না বলে আমি তার কাছে দু:খপ্রকাশ করি, কিছু সান্ত্বনা-মূলক কথা লিখি তার কষ্ট লাঘবের জন্য। কিন্তু সে নাছোড়বান্দী। চিঠি পাঠাতেই থাকে। যেখানেই দেখা হতো নানা রকম ইশারা দিত।

এমনকি বছর শেষে যখন আমি মামাবাড়ি ফিরে গিয়েছিলাম, তখনও নিজ ভাইয়ের মাধ্যমে নম্বর নিয়ে আমার মামিদের সাথে কথা বলত।
তাদের কাছে আমার প্রেমিকা বলে পরিচয় দেয়।

তার এইসব কর্মকাণ্ডে বাসায় হেনস্তা হতে হয়।

তখনো জানা ছিলো না যে, ভবিষ্যতে আমার জন্য বিশাল এক টুইস্ট অপেক্ষা করছে।

আমি ওই মাদ্রাসা ছেড়ে আসার বেশকিছু পর যখন সে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, আমি তার ভালবাসা একসেপ্ট করবো না, হঠাৎ একদিন ফোন দিয়ে বলে, “আজ একটা সত্য কথা বলবো। আপনার প্রতি আমার কোনো ভালোবাসা ছিলো না, এতদিন শুধু অভিনয় করেছি। মনে আছে? আমার ব্যাপারে একটা অশ্লীল মন্তব্য করেছিলেন, তার জন্য আমি চরম প্রতিশোধ নেয়ার সংকল্প করি। এজন্য আপনাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিলাম। আপনি যখন সম্পূর্ণরূপে প্রেমে বিভোর হয়ে যেতেন, তখন হঠাৎ একদিন আপনার কাছে সত্যটা প্রকাশ করতাম। একারণেই তো বাড়িতে ফোন দিয়ে আপনাকে হেনস্তা করেছি৷”

আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহ বাঁচাইছে। শুরু থেকেই আমার বুঝে আসতো না, এই মেয়ে কেন আমার জন্য এত পাগল হলো? এই তাহলে আসল ঘটনা।

উস্তাজদের যাওয়া-আসায় অনেকদিন পর্যন্ত হিফজ বিভাগ শিক্ষকশূন্য থাকে। তারপর নতুন যিনি জয়েন করেন, তার সেই প্রভাব প্রতিপত্তি কিছুই ছিলো না। স্বজনপ্রীতি কোটায় খেদমত পাওয়ায় ইয়াদও ছিলো না। পক্ষান্তরে আমাদের প্রত্যেকেরই কুরআন মাজিদ খুব ভালো ইয়াদ ছিলো। ফলে তিনি হীনমন্যতায় ভুগতেন।

এইসবের সুযোগ নিয়ে আমরা মুক্তহংস হয়ে জলে সাঁতার কাটতে থাকি। অর্থাৎ আমাদেরকে ক্লাশে কম, জলে বেশি দেখা যেতো।

খুলে বলি, বিবন্দী গ্রামসহ পুরা অঞ্চলটিই ছিলো নিম্নভূমি। বর্ষাকালে সেখানে ভিটাগুলো ছাড়া সবকিছু পানির নিচে চলে যেত। তখন চলাচলের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠতো নৌকা। মাদ্রাসার নিজস্ব একটা নৌকা ছিলো। আমরা কয়েকজন সেটি নিয়ে পুকুর খাল-বিল- ঝিল পারি দিয়ে বহুদূর চলে যেতাম।

কলমি ভেজা জলরাশি কেটে নৌকা নিয়ে এগিয়ে চলা, পাটাতনে বসে নক্ষত্রভরা আকাশ দেখা – কী যে অপার্থিব অনুভূতি!

রাত্রীবেলা মাদ্রাসার ছাদে গল্পের আসর বসতো। বছরের অন্তিম সময়ে এমনই এক আসরে সবাই মিলে প্রচুর গল্প করি। মেঘমুক্ত আকাশ ছিলো। চাঁদ থেকে যেন তুষারপাতের মতো আলোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা ঝরছিলো। সবাই হৃদয়ের ঝাঁপি খুলে কথা বলে। একজন তার কৈশোরের প্রেমকাহিনী শোনায়। আরেকজন ভুতের গল্প। রাত প্রায় দুইটা বেজে যায়! একসময় আমি চাঁদের নিয়ন আলোমাখা সহপাঠীদের প্রিয় চেহারাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলি, আমি জানি তোমরা সবাই এই মূহুর্তগুলো ভুলে যাবে। কিন্তু আমি যতদিন বাঁচবো, এই অনিন্দ্য সুন্দর স্মৃতিগুলো আমার হৃদয়ে ঝিলিমিলি করতে থাকবে। জীবন আমাদের কবে কোথায় নিয়ে যাবে তাতো জানি না, কারো
সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, কেউ চলে যাবে দেশের বাইরে, কেউ দুনিয়ার সকল বাঁধন ছিড়ে চলে যেতে পারে না ফেরার দেশে। কিন্তু যতদিন চাঁদ থাকবে ততদিন অনুভব করিও, আমরা আছি একই চাঁদের তলায়।

এতবছর পর পেছনে তাকালে কাউকেই দেখতে পাই না, ওই ব্যাচের কারো সাথেই যোগাযোগ নেই।

হায়! জানি না জীবনের শ্রেষ্ঠ মূহুর্তগুলো পার করে ফেলেছি কিনা। জীবন যত এগিয়ে চলছে, দু:খের বোঝা ততই উচ্চতা লাভ করছে। সুখ হয়ে যাচ্ছে প্রহেলিকা।

প্রিয় পাঠক! আগে বলা হয়নি, এই মাদ্রাসায় থাকাকালীন একসময় এসে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। অনেক দ্বিধা সংকোচের পর আমি তার সাথে যোগাযোগ করি। তিনি ফোনে কান্নাকাটি করেন এবং ফিরতে বলেন। তার সাথে দেখা করে এসে পড়াশোনা অব্যাহত রেখেছিলাম।

এই মাদ্রাসায় এক বছর ছিলাম। তারপর বিদায় নেই।

এই ছিলো সংক্ষিপ্তাকারে আমার পলায়নের কড়চা।

এরপরেও জীবনে বহু বিচিত্র ঘটনা ঘটেছে। অনেক আলো-আঁধারি পেরিয়ে, অনেক উজান-ভাটি মুকাবেলা করে কীভাবে যেন নাও ভিরিয়েছি দাওরা-ইফতা উপকূলে। উলামাদের কাফেলায় থাকার যোগ্য আমি ছিলাম না, তবু কেন আমাকে এই কাফেলায় রাখা হলো বুঝতে পারি না; সত্যিই বুঝতে পারি না। এর শুকরিয়া আদায় করার জন্য যদি আজীবন সিজদায় পড়ে থাকি, তবু কম হয়ে যাবে।

লেখক: উমর ফারূক তাসলিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *