শাতিমে রাসূলকে তাওবা করার পরও কি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে হবে? চার মাজহাবের অবস্থান

بَيَانُ مَوْقِفِ الحَنَفِيَّةِ فِي ٱسْتِتَابَةِ شَاتِمِ خَيْرِ ٱلْبَرِيَّةِ

সূচি
মালেকী মাজহাবের অবস্থান
হদ হিশেবে হত্যা মানে কী?
শাফেঈ মাজহাবের অবস্থান
হাম্বলি মাজহাবের অবস্থান
হানাফী মাজহাবের প্রথম মত
হানাফি মাজহাবের দ্বিতীয় মত
হদ হিশেবে হত্যা করলে তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে
হানাফি মাজহাবের প্রথম মতের খন্ডন
বায্যাযিয়া প্রণেতা এই মত কোথায় পেলেন
প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত
দ্বিতীয় মতটিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ
আখিরাতে মাফ পাবে কিনা
যিন্দিক হিশেবে হত্যা করা যাবে কিনা
বারবার তাওবা ভঙ্গ করলে
তাজির হিশেবে হত্যা করা যাবে কিনা
তাহলে সমকামীদের কেন তাজিরান মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়
দারুল উলূম দেওবন্দের ফাতাওয়া

শাতিমে রাসূল তাওবার আগ পর্যন্ত কাফের ও মুবাহুদ দাম (হত্যাযোগ্য) এবিষয়ে সকল মুজতাহিদগণ একমত। কিন্তু তাওবা করার পরও কি তাকে হত্যা করতে হবে? তার তাওবা কি গ্রহণযোগ্য হবে?

এবিষয়ে প্রথমে আমরা অন্যান্য মাজহাবের মতামত জেনে নেই

মালেকী মাজহাব

ইমাম মালেক র. থেকে দুই ধরনের বর্ণনা এসেছে এক: তাওবার পরও হত্যা করা হবে না। দুই: হত্যা করা হবে।

প্রথম মতটি ওয়ালিদ বিন মুসলিম র. ইমাম মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম মালেক বলেছেন, শাতিমের হুকুম মুরতাদের মত। অর্থাৎ তাওবা করলে হত্যা করা হবে না। (আশ শিফা বি তারিফি হুকুকিল মুস্তফা, কাজী ইয়াজ ২/৫৫৭)
এই মতটি দূর্বল।

দ্বিতীয় মত: তৃতীয় শতকের প্রসিদ্ধ মালেকি ফকীহ মুহাম্মাদ বিন সাহনুন বলেছেন, মালেকী মাজহাবের প্রসিদ্ধ অভিমত হলো হদ্দান হত্যা করা হবে। একই কথা কাজী ইয়াজ বলেছেন। (প্রাগুক্ত ২/৫৪৮)

তাকিউদ্দীন সুবকী র. লিখেছেন, ইমাম মালেক বলেছেন…
من سب النبي صلى الله عليه وسلم أو غيره من النبيين من مسلم او كافر قتل ولم يستتب

যে ব্যক্তি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অথবা অন্য কোন নবীকে গালি দিবে তাকে হত্যা করতে হবে। চাই সে কাফের অবস্থায় গালি দিক অথবা মুসলমান অবস্থায়। মুসলমান অবস্থায় দিয়ে থাকলে তাওবা করতে বলা হবে না। (আস সাইফুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল, তাকিউদ্দীন সুবকী ১০১)

বাস্তবেও মালেকি মাজহাবের ফাতওয়া এই মতের উপরেই যে, তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। হত্যা করতে হবে।

শাফেঈ মাজহাব

শাফেঈ মাজহাবের ফাতওয়া হলো, তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে। এবং হত্যা করা হবে না। (আস সাইফুল মাসলুল ১৬৮)

হাম্বলি মাজহাব

হাম্বলি মাযহাবে বিষয়টি মালেকী মাযহাবের মতই। অর্থাৎ ইমাম আহমদের একমত অনুযায়ী তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু প্রসিদ্ধ ও হাম্বলী মাজহাবে বিশুদ্ধ মত হলো তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না, হত্যা করা হবে।

আব্দুল্লাহ র. তার পিতা আহমদ বিন হাম্বল র. কে শাতিমে রাসূল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন
قد وجب عليه القتل ولا يستتاب 
তাকে হত্যা করা আবশ্যক। এবং তাকে তাওবা করতে বলা হবে না। (আস সোরিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল, আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ১/৩০৮)

উল্লেখ্য, আল্লামা ইবনে তাইমিয়ার মত মালেকী ও হাম্বলী মাজহাবের অনুরূপ।

হানাফি মাজহাব

হানাফী মাজহাবে মৌলিকভাবে দুটি মত রয়েছে

হানাফী মাজহাবের প্রথম মত

তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না, হত্যা করতে হবে। অর্থাৎ মালেকী-হাম্বলীর মতের অনুরূপ।

মুহাম্মাদ আল কুর্দি আল বায্যায তার ফাতাওয়ায়ে বায্যাযিয়াতে (২/৪৪৩) লিখেছেন…
إذا سب الرسول صلى الله عليه وسلم أو واحدا من الأنبياء عليهم السلام فانه يقتل حدا ولا توبة له أصلا… كالزنديق لانه حد وجب فلا يسقط بالتوبه

যদি কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অথবা অন্য কোন নবীকে গালি দেয় তাকে হদ হিশেবে হত্যা করা হবে। তার তাওবার কোন সুযোগ নেই। তার বিধান যিন্দীকের মত। কেননা এটি হদ, যা তাওবার কারণে রহিত হয় না।

উপরের ইবারত হুবুহু লিখেছেন মোল্লা খসরু তার আদ দুরার ওয়াল গুরারে (১/২৯৯-৩০০)। এর হাশিয়াতে আল্লামা শুররুম্বুলালিও একই মত পোষণ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন আল্লামা শামী।

একই মত খতীবে তুমুরতাশীর, তিনি তার মুইনুল মুফতী আলা জাওয়াবিল মুস্তাফতী-তে (২৪৮)লিখেছেন…
من بغض رسول الله صلى الله عليه وسلم بقلبه كان مرتدا فالساب بالطريق الاولى ثم يقتل حدا عندنا فلا تقبل في اسقاط القتل

যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অন্তরে ঘৃণা পোষণ করবে সে মুরতাদ হয়ে যাবে। এবং আমাদের মতে অবশ্যই তাকে হদ হিশেবে হত্যা করা হবে। হত্যা রহিতের ক্ষেত্রে তার তাওবা কার্যকর হবে না।

তিনি তার অপর কিতাব তানভিরুল আবসারে একই ধরনের কথা লিখেছেন…
(وكل مسلم إرتد فتوبته مقبولة إلا) جماعة: من تكررت ردته على ما مر، و (الكافر بسب نبي) من الانبياء فإنه يقتل حدا ولا تقبل توبته

যদি কোন মুসলমান মুরতাদ হয়ে যায় তার তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে। তবে এমন লোকজন ব্যতীত যারা বারবার তওবা থেকে ফিরে এসে মুরতাদ হয়ে যায়। যদি কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বা অন্য কোন নবীকে গালি দেওয়ার মাধ্যমে কাফের হয়ে যায়, তাকে হদ হিশেবে হিসেবে হত্যা করা হবে এবং তার তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। (আদ দুররুল মুখতার মাআ তানভিরিল আবসার ৩৪৫)

আন নাহরুল ফায়িক প্রণেতা একই মত পোষণ করে লিখেছেন (৩/২৫৩)…
(فإن أسلم) رفع عنه القتل هذا الإطلاق يستثنى منه ما لو ارتد بسببه صلى الله عليه وسلم ثم تاب فإنه يقتل حدا ولا تقبل توبته في ‌إسقاط ‌القتل عنه

ইবনু নুজাইম মিসরী তার আল আশবাহ ওয়ান নাজাইরে এই মত পোষণ করেছেন (১৮৫)।…
‌الرِّدَّةَ بِسَبِّ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَإِنَّهُ يُقْتَلُ وَلَا يُعْفَى عَنْهُ

একই লেখক তার আল বাহরুর রায়িকে লিখেছেন (৫/১৩৬)…
الثَّانِيَةُ الرِّدَّةُ بِسَبِّ الشَّيْخَيْنِ أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ رضي الله عنهما وَقَدْ صَرَّحَ فِي الْخُلَاصَةِ وَالْبَزَّازِيَّةِ بِأَنَّ الرَّافِضِيَّ إذَا سَبَّ الشَّيْخَيْنِ وَطَعَنَ فِيهِمَا كَفَرَ وَإِنْ فَضَّلَ عَلِيًّا عَلَيْهِمَا فَمُبْتَدِعٌ وَلَمْ يَتَكَلَّمَا عَلَى عَدَمِ قَبُولِ تَوْبَتِهِ وَفِي الْجَوْهَرَةِ مَنْ سَبَّ الشَّيْخَيْنِ أَوْ طَعَنَ فِيهِمَا كَفَرَ وَيَجِبُ قَتْلُهُ ثُمَّ إنْ رَجَعَ وَتَابَ وَجَدَّدَ الْإِسْلَامَ هَلْ تُقْبَلُ تَوْبَتُهُ أَمْ لَا قَالَ الصَّدْرُ الشَّهِيدُ لَا تُقْبَلُ تَوْبَتُهُ ‌وَإِسْلَامُهُ ‌وَنَقْتُلُهُ وَبِهِ أَخَذَ الْفَقِيهُ أَبُو اللَّيْثِ السَّمَرْقَنْدِيُّ وَأَبُو نَصْرٍ الدَّبُوسِيُّ وَهُوَ الْمُخْتَارُ لِلْفَتْوَى اهـ.
وَحَيْثُ لَا تُقْبَلُ تَوْبَتُهُ عُلِمَ أَنَّ سَبَّ الشَّيْخَيْنِ كَسَبِّ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَلَا يُفِيدُ الْإِنْكَارُ مَعَ الْبَيِّنَةِ كَمَا تَقَدَّمَ عَنْ فَتْحِ الْقَدِيرِ لِأَنَّا نَجْعَلُ إنْكَارَ الرِّدَّةِ تَوْبَةً إنْ كَانَتْ مَقْبُولَةً كَمَا لَا يَخْفَى

উপরের এবারত থেকে বোঝা যায় ফকিহ আবু লাইস সমরকন্দি ও আবু নাসর দাবুসির মতও তাই।

ইবনুল হুমাম র. ফাতহুল কাদিরে (৬/৯৮) অনুরূপ মতের পক্ষে লিখেছেন…
كل ‌من ‌أبغض ‌رسول ‌الله صلى الله عليه وسلم بقلبه كان مرتدا، فالسباب بطريق أولى، ثم يقتل حدا عندنا فلا تعمل توبته في إسقاط القتل. قالوا: هذا مذهب أهل الكوفة ومالك، ونقل عن أبي بكر الصديق رضي الله عنه، ولا فرق بين أن يجيء تائبا من نفسه أو شهد عليه بذلك، بخلاف غيره من المكفرات فإن الإنكار فيها توبة فلا تعمل الشهادة معه، حتى قالوا: يقتل وإن سب سكران ولا يعفى عنه، ولا بد من تقييده بما إذا كان سكره بسبب محظور باشره مختارا بلا إكراه، وإلا فهو كالمجنون. وقال الخطابي: ولا أعلم أحدا خالف في وجوب قتله. وأما مثله في حقه تعالى فتعمل توبته في إسقاط قتله

হানাফি মাজহাবের দ্বিতীয় মত

দ্বিতীয় মত হল, শাতিম ও অন্য মুরতাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অতএব শাতিমের তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে, তাওবা করলে তাকে হত্যা করা হবে না।

এমতের পক্ষে প্রথমে আমরা অন্য মাযহাবের কিতাবাদী থেকে দলিল দেব।

ইমাম সুবকী বলেন (আস সাইফুল মাসলুল ১৮৫)
وللحنفية في قبول التوبة قريب من الشافعية ولا يوجد للحنفية غير قبول التوبة

তাওবা গ্রহনযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে হানাফিদের মত শাওয়াফের মতই। এবং কোন হানাফী ফকিহ তাওবা অগ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে মত দিয়েছেন বলে জানা যায় না।

অর্থাৎ তাওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে হানাফিদের ইজমা রয়েছে।

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া বলেন (আস সোরিম১/৩০৯)
وكذلك ذكر جماعة آخرون من أصحابنا أنه يقتل ساب النبي ولا تقبل توبته سواء كان مسلما أو كافرا وعامة هؤلاء لما ذكروا المسألة قالوا خلاف لابي حنيفة والشافعي وقولهما أي ابي حنيفه والشافعي ان كان مسلما يستتاب

একইভাবে অন্য একদল আলেম বলেছেন শাতিমকে হত্যা করা হবে। তার তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। চাই সে মুসলিম হোক অথবা কাফের। এটাই অধিকাংশ আলেমের মত। তবে ইমাম আবু হানিফা ও শাফিঈ ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাদের মতে যদি শাতিম পূর্বে মুসলমান থেকে থাকে, তাহলে তাকে তাওবা করতে বলা হবে।

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া আস সোরিমে (১/৩২০) কাজী ইয়াজের মন্তব্যও লিখেছেন। তিনিও একই কথা বলেছেন…
إذا سب النبي صلى الله عليه وسلم قد ذكرنا أن المشهور عن مالك واحمد أنه لا يستتاب ولا يسقط القتل عنه وهو قول الليث بن سعد وذكر القاضي عياض أنه المشهور من قول السلف وجمهور العلماء وهو أحد الوجهين لأصحاب الشافعي وحكي عن مالك واحمد أنه تقبل توبته وهو قول ابي حنيفه واصحابه وهو المشهور من مذهب الشافعي بناء على قبول توبة المرتد

যদি কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয়, তাহলে এ বিষয়ে ইমাম মালেক ও ইমাম আহমাদের প্রসিদ্ধ মত হল তাকে তাওবা করতে বলা হবে না। এবং তাওবার মাধ্যমে তার হত্যার হুকুম রহিত হবে না। একই মত লাইস বিন সাদের। কাজী ইয়াজ বলেছেন সালাফ এবং জমহুর আলেমদের মত এটাই। এবং এটি একদল শাওয়াফের মত। তবে ইমাম শাফিঈর বিশুদ্ধ মাযহাব অনুযায়ী মুরতাদের মতো তার তাওবাও গ্রহণযোগ্য হবে। এবং ইমাম আবু হানিফা ও তার সংগীদের এটাই মত।

একই মন্তব্য করেছেন তাবারি র. (আল বাহরুর রায়িক ৫/১৩৫)

মুহাক্কিক শামী রহ. বলেছেন, হানাফিদের এই দ্বিতীয় মতটি একযোগে বর্ণনা করেছেন কাজী ইয়াজ, তাবারি, তকিউদ্দীন সুবকী, ইবনে তাইমিয়া র. সহ আরো অনেকে।

অথচ শুধুমাত্র ইমাম তকিউদ্দীন সুবকী একাই যদি বলতেন, তাহলেই যথেষ্ট হত। এর কারণ হানাফী মাজহাব সহ চার মাজহাবের উপরে তার ব্যাপক জ্ঞান। যদি হানাফী মাযহাবের কিতাবগুলো ফাঁকা হয়ে যায়, সেগুলো তকিউদ্দিন সুবকী তার হিফজ থেকে লিখে ভরে দিতে পারবে।

এবার এই দ্বিতীয় মতটির পক্ষে হানাফী মাযহাবের কিতাবাদী থেকে দলিল

ইমাম আবু ইউসুফ তার কিতাবুল খারাজে (১৯৯) লিখেছেন…
وأيما رجل مسلم سب رسول الله صلى الله عليه وسلم أو كذبه أو عابه أو تنقصه؛ فقد كفر بالله وبانت منه زوجته؛ فإن تاب وإلا قتل. وكذلك المرأة؛ إلا أن أبا حنيفة قال: لا تقتل المرأة وتجبر على الإسلام

কোন মুসলমান যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয় অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে কিংবা দোষ ধরে অথবা নিচু মনে করে, সে কুফরি করল। স্ত্রীর সাথে তার বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। যদি সে তাওবা করে তাহলে তো ঠিক আছে। অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। একই হুকুম কোন মহিলা এই কাজ করলে। (অর্থাৎ তাকেও হত্যা করা হবে) তবে ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লার মতে মহিলাকে হত্যা করা যাবে না। বরং তাকে ইসলামে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত বন্দী করে রাখতে হবে। [কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলাদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।]

এই ইবারত দ্বারা বোঝা যায়, স্বয়ং ইমাম আবু হানিফা র.-এর মতে শাতিমের তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে।

শাইখুল ইসলাম কাজী আবুল হুসাইন সুগদী তার نتف في الفتاوى -র মধ্যে (১/৬৮৪) লিখেছেন…
من سب رسول الله صلى الله عليه وسلم فإنه مرتد وحكمه حكم المرتد ويفعل به ما يفعل بالمرتد

যদি কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয় তাহলে সে মুরতাদ হয়ে যাবে। এবং তার বিধান হবে মুরতাদের বিধান। এবং তার সাথে সেটাই করা হবে যা মুরতাদের সাথে করা হয়।

শামী র. বলেন, আমি আব্দুর রহমান বিন আলীর فتاوي مؤيد زاده -তে (৭৬) লেখা দেখেছি…
وكل من سب النبي أو أبغضه كان مرتدا

যারা নবীজিকে গালি দেয় অথবা অপছন্দ করে তারা মুরতাদ। (অতএব মুরতাদের বিধান আরোপ হবে।)

তিনি আরো বলেন, মুঈনুল হুক্কামে এসেছে (২/২৯৯)…
من سب النبي أو أبغضه كان ذلك منه ردة وحكمه حكم المرتدين

যে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামকে গালি দেয় অথবা অপছন্দ করে সে মুরতাদ হয়ে যাবে। এবং তার বিধান মুরতাদের বিধান।

মুহাম্মদ বিন আহমাদ নাশাঞ্জিযাদা নুরুল আইন ফি ইসলাহী জামিইল ফুসুলাইনে একই অভিমত পোষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন (২৯৮)…

يعلم أن سب النبي كفر وارتداد لأنه مناف لتعظيمه والإيمان به الثابت بالادلة القطعية التي لا شبهة فيها فسبه جحود له فيكون كفرا فيقتل به ان لم يتب وهذا مجمع عليه بين المجتهدين لكنه اذا تاب وعاد الى الاسلام تقبل توبته فلا تقتل عند الحنفية والشافعية خلافا للمالكية والحنبلية

মুহাক্কিক ইবনে আবেদীন শামী তার রদ্দুল মুহতারেও (৪/২৩৪) এই মতটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

সংযুক্তি: শামী র. বলেন, কুদুরি, কানযুদ দাকায়িক, আল ইখতিয়ার লিতালিলিল মুখতার ইত্যাদি “মুতুনে” এবং মুতাকাদ্দীমিনের কিতাবে শাতিমে রাসুলের আলাদা বিধান বর্ণনা করা হয়নি। সুতরাং বুঝা যায় মুরতাদের যে বিধান শাতিমের একই বিধান।

তাদের মাথায় বিষয়টি আসেনি – তেমনটা নয়। কেননা তারা “আলফাজুল কুফর” টপিকে রাসূল সা.এর গালিদাতাকে মুরতাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

হানাফি মাজহাবের প্রথম মতের খন্ডন

একটা বিষয় হয়তো আমরা লক্ষ্য করেছি, উপরে উল্লেখিত ইমাম সুবকী, কাজী ইয়াজ ও ইবনে তাইমিয়া র. প্রমুখের বক্তব্য প্রমাণ করে যে, তাওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে হানাফী মাযহাবের ইজমা রয়েছে। আরো বুঝা যায় যে, তাদের সময় হানাফী মাজহাবে প্রথম মতটির অস্তিত্বই ছিল না।

শামী র. বলেন, আসলেও দ্বিতীয় মতটির উপরই হানাফী মাযহাবের ইজমা ছিল। ফাতাওয়ায়ে বায্যাযিয়ার পূর্বে কোন হানাফী ফকিহ বলেননি যে, তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। সর্বপ্রথম বায্যাযিয়ার প্রণেতা এই মত দেন। তার ওপর ভিত্তি করে আদ দুরার ওয়াল গুরার প্রণেতা, ইবনুল হুমাম সহ পরবর্তীরা এই মত লিখেন।

এই পল্লবগ্রাহী বলছে বায্যাযিয়া প্রণেতার আগেই উপরুক্ত আলেমগণ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। অতএব যে মত সর্বপ্রথম বায্যাযিয়া প্রণেতা দিয়েছেন সেটা তাদের জানার কথা না।

বায্যাযিয়া প্রণেতা এই মত কোথায় পেলেন?

শামী র. বলেন, আসলে তিনি কয়েকভাবে তাসুমুহের (ভুল/অসতর্কতা/শিথিলতা/) শিকার হয়েছেন।

১- ইজমা
আশ শিফা ও আস সোরিম ইত্যাদি কিতাবে শাতিমের হত্যার ব্যাপারে ইজমার কথা বলা হয়েছে। যে ইজমার ভেতর ইমাম আবু হানিফা ও তার সঙ্গীরাও শামিল। কিন্তু সেই ইজমা যে – তাওবার পূর্বে / তওবা না করা অবস্থায় হত্যার ব্যাপারে – সেটাতে আল্লামা বায্যাযের তাসামুহ হয়েছে। তিনি মনে করেছেন তাওবার পরের ব্যাপারেও ইজমা রয়েছে।

২- কাজী ইয়াজ র. -র আশ শিফা বি তারিফি হুকুকিল মুস্তফার (২/২১৫) একটি পেঁচানো ইবারত বুঝতে তাসামুহ। যাতে লেখা আছে…
قال أبو بكر بن المنذر أجمع عوام أهل العلم على أن من سب النبي يقتل وممن ذلك مالك بن انس والليث وأحمد وهو مذهب الشافعي وهو مقتضى قول ابي بكر رضي الله تعالى عنه ولا تقبل توبته عند هؤلاء وبمثله قال ابو حنيفة واصحابه والثور ي واهل الكوفه والاوزاعي في المسلم لكنهم قالوا هي ردة

এখানে বলা হয়েছে ইমাম আবু হানিফা ও তার সঙ্গীদের মত ইমাম মালেক ও আহমদের অনুরূপ। এর দ্বারা শাদা চোখে বোঝা যায় যে, ইমাম আবু হানিফা ও তার সঙ্গীদের মতে তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু এই বুঝটা যদি সঠিক হয় তাহলে পরবর্তী বাক্য لكنهم قالوا هي ردة নিরর্থক হয়ে যায়।

তাই এ ইবারতের সঠিক উদ্দেশ্য হলো, তাওবার পূর্বে হত্যা করার ব্যাপারে ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ এর সাথে ইমাম আবু হানিফা ও তার সঙ্গীরা একমত পোষণ করে থাকেন। কিন্তু তাওবার পরে তার বিধান মুরতাদের বিধানের মতই মনে করেন।

সুতরাং মালেকী, হাম্বলী ও আল্লামা ইবনে তাইমিয়ার মত আল্লামা বায্যাযের মাধ্যমে হানাফী মাযহাবে ঢুকে গেছে। অবশ্য আল্লামা বায্যায লিখে দিয়েছেন যে, এই মতটি তিনি আস সোরিম ও আশ শিফা থেকে নিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীগণ তাদের কিতাবে সেটি লেখেননি। এ কারণে বিষয়টি অনেকের কাছে ধরা পড়েনি।

আল্লামা কাহাস্তানিও ইবারতটি ভুল বুঝেছেন, যা বুঝা যায় তার জামিউর রুমুয ফি শারহিন নিকায়ায় (৭/১১) থাকা বাক্য দ্বারা। তিনি লিখেছেন…
لو عاب نبيا من الأنبياء عليهم السلام قبلت توبته كما في شرح الطحاوي وغيره لكن في الشفاء لقاضي عياض عن اصحابنا وغيرهم … أن توبته لم تقبل وقتل بالاجماع

যদি কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দোষী মনে করে এবং পরবর্তীতে তাওবা করে। তাহলে তার তওবা গ্রহণ করা হবে – যেমনটা শরহে তাহাবীতে এসেছে। কিন্তু কাজী ইয়াজ তার আশ শিফাতে আমাদের হানাফী উলামাগণ সম্পর্কে বলেছেন যে, “তাদের মত হল, তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না, অতএব তাওবার পর হত্যা করার বিষয়ে ইজমা রয়েছে।”

শামী র. বলেন, এখানে যে ভুলভাবে ইবারত বুঝা হয়েছে তা প্রমাণিত হয় আশ শিফার অন্যত্রে থাকা ইবারত দ্বারা।

(উল্লেখ্য, এই পপল্লবগ্রাহীও প্রথমে আশ শিফার ইবারত পড়ে ভুল বুঝেছিল।)

শামী র. বলেন, ইবনু নুজাইম র. তার আল আশবাহে যা লিখেছেন সে সম্পর্কে সাইয়িদ আহমেদ হামাভি আশবাহের শরাহ গমযু উয়ুনিল বাসাইরে বলেন, ইবনু নুজাইমের এই মতের বিরোধিতা তার জমানার আলেমরাই করেছেন।

আল বাহরুর রায়িকে ইবনু নুজাইম র. আল জাওহারাতুন নাইয়িরাহর উদ্ধৃতিতে যা লিখেছেন, বাস্তবে আল জাওহারে তা নেই। বরং সেটি কোনো নুসখার টিকায় ছিল। কিন্তু লিপিকারের ভুলেই হোক অথবা অন্য কারো ভুলে – তাকে আল জাওহারাতুন নাইয়িরাহর অংশ মনে করা হয়েছে।

(উল্লেখ্য, এই পল্লবগ্রাহী আল বাহরুর রায়িকে আল জাওহারের উদ্ধৃতি পাওয়ার পর সেখানে তালাশ করে দেখে, কিন্তু খুঁজে পায়নি। পরবর্তীতে শামী র.র মন্তব্য খুঁজে পায়, যেখানে তিনিও বলেছেন, আল জাওহারে তা নেই)

হদ হিশেবে হত্যা

প্রথম দলের ফকিহগণ শাতিমে রাসূলকে “হদ হিশেবে” করার কথা লিখেছেন।

তাদের যুক্তি হলো, হদ আল্লাহর হক। এতে কমবেশ করা যায় না। এবং তাওবা করলেও তা কার্যকর করতে হয়। যেমন যিনা। তাওবা করার পরও যিনা প্রমাণ হলে বিবাহিত/বিবাহিতাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে। তাজির এর ব্যতিক্রম। সুতরাং হদ হিশেবে হত্যা মানে হলো, তাওবা গ্রহণযোগ্য না হওয়া।

এর জবাবে মুহাক্কিক ইবনে আবেদীন শামী র. বলেছেন, শুধুমাত্র রিদ্দার হদ মৃত্যুদণ্ড নয়, বরং রিদ্দা প্লাস রিদ্দার উপর বাকি থাকা – এই দুটির সম্মিলিত হদ মৃত্যুদণ্ড। যদি একটি কারণ পাওয়া না যায় তাহলে হদ আসবে না। যেমন কেউ রিদ্দার উপর বাকি থাকলো না, বরং ইসলামে ফিরে আসলো। তাহলে তার উপর হদ আসবে না

যদি “শাতিমের হুকুম মুরতাদের মত।” হয় তাহলে তাওবা গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণ নেই।

প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত

শামী র. তাম্বিহুল উলাতে বলেন (১২৩)…
فيا أخي هذه الاقوال الثلاثه بين يديك قد أوضحتها لك وعرضتها عليك فاختر منها لنفسك ما ينجيك عند حلول رمسك وانصف من نفسك حتى تميز بثها من سمينها ولجينها من لجينها والذي يغلب على ظن في هذا الموضع الخطر والامر العسر وأختاره لخاص نفسي وأرتضيه ولا ألزم احدا ان يقلدني فيه على حسب ما ظهر لفكري الفاتر ونظري القاصر هو العمل بما ثبت نقله عن ابي حنيفه واصحابه لأمور

হে ভাই! এই তিনটি মত (মৌলিকভাবে দুটি) আমি তোমার সামনে পেশ করলাম। এই কঠিন ও জটিল বিষয়টিতে মেধার অবসাদগ্রস্ততা ও দৃষ্টির সংকীর্ণতা সত্ত্বেও যদি মন্তব্য করতে হয় তাহলে বলব, আমার কাছে অধিক বিশুদ্ধ মনে হয়, ইমাম আবু হানিফা ও তার সঙ্গীদের মত। অর্থাৎ শাতিমে রাসুল তওবা করলে গ্রহণযোগ্য হবে। এবং তাকে হত্যা করা হবে না। এ ব্যাপারে কারো জন্য জরুরী নয় আমার তাকলিদ করা। বরং এই মতামত আমার নিজের আমলের জন্য। তুমি এর মধ্যে থেকে সেই মতই গ্রহণ করে নাও যা গ্রহণ করলে আখেরাতে তোমার আটকানোর সম্ভাবনা কম। আর তুমি তাহকিক করো।

অর্থাৎ এমন যেন না হয় যে তুমি কাউকে হত্যা করলে অথচ তাকে হত্যা করা বৈধ ছিল না। তারপর আখেরাতে আটকা পড়ে গেলে।

দ্বিতীয় মতটিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ

শামী র. দ্বিতীয় মতটিকে প্রাধান্য দেয়ার যে সমস্ত কারণ উল্লেখ করেছেন, আমি তার মধ্যে কয়েকটা নিম্নে উল্লেখ করছি…

১ – কুরআনের আয়াত…
کَیۡفَ یَهۡدِی اللّٰهُ قَوۡمًا کَفَرُوۡا بَعۡدَ اِیۡمَانِهِمۡ وَ شَهِدُوۡۤا اَنَّ الرَّسُوۡلَ حَقٌّ وَّ جَآءَهُمُ الۡبَیِّنٰتُ ؕ وَ اللّٰهُ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۸۶﴾  اُولٰٓئِکَ جَزَآؤُهُمۡ اَنَّ عَلَیۡهِمۡ لَعۡنَۃَ اللّٰهِ وَ الۡمَلٰٓئِکَۃِ وَ النَّاسِ اَجۡمَعِیۡنَ ﴿ۙ۸۷﴾ خٰلِدِیۡنَ فِیۡهَا ۚ لَا یُخَفَّفُ عَنۡهُمُ الۡعَذَابُ وَ لَا هُمۡ یُنۡظَرُوۡنَ ﴿ۙ۸۸﴾  اِلَّا الَّذِیۡنَ تَابُوۡا مِنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ وَ اَصۡلَحُوۡا ۟ فَاِنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۸۹﴾

কেমন করে আল্লাহ সে কওমকে হিদায়াত দেবেন, যারা ঈমান আনার পর কুফরী করেছে, আর তারা সাক্ষ্য দিয়েছে যে, নিশ্চয় রাসূল সত্য এবং তাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ এসেছে। আর আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়াত দেন না। এরাই তারা, যাদের প্রতিদান হল, নিশ্চয় তাদের উপর আল্লাহর, ফেরেশতাদের ও সকল মানুষের লা’নত। তারা তাতে স্থায়ী হবে, তাদের থেকে আযাব শিথিল করা হবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেয়া হবে না। কিন্তু তারা ছাড়া যারা এরপরে তাওবা করেছে এবং শুধরে নিয়েছে তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (আলে ইমরান ৮৬-৮৮)

২- মুসলিমের হাদিস (২২০)…
الإسلام يهدم من كان قبله
ইসলাম পূর্বের সব পাপ মিটিয়ে দেয়।

৩-সহীহ বুখারীর হাদিস (২৫)…
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَيُقِيمُوا الصَّلاَةَ، وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلاَّ بِحَقِّ الإِسْلاَمِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّه

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল, আর সালাত প্রতিষ্ঠা করে ও যাকাত আদায় করে। তারা যদি এগুলো করে, তবে আমার পক্ষ হতে তাদের জান ও মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করলো…

৪- রাসূল সা. কর্তক মুরতাদ আবু সারাহকে মাফ করে দেয়া। যদি তাওবার পরও হদ বাকি থাকতো তাহলে রাসুল সা. তাকে কখনো মাফ করতেন না। যেমন মাফ করেননি মাখযুম গোত্রের নারীকে চুরির অপরাধে। কেননা হদ আল্লাহর হক।

উল্লেখ্য, ইবনে তাইমিয়া র. প্রমুখ আবু সারাহর হাদীস দিয়ে শাতিমকে হত্যা করার দলিল নিয়েছেন। অথচ শামী র. বলেছেন যে, এই হাদিস মূলত বিপরীত মতের দলিল।

৫- আবু সারাহকে মাফ করার ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সুপারিশ গ্রহণ করেছিলেন। অথচ মাখযুম গোত্রের নারীর ক্ষেত্রে ওসামা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সুপারিশ গ্রহণ করেননি।

৬- হানাফি মাজহাবের প্রথম মত তথা মালেকী ও হাম্বলী মাজহাবের মতের পক্ষে সুস্পষ্ট দলিলের অভাব।

৭- মুসলমানের রক্তের মূল্য ও রক্ত হালালের ক্ষেত্রে সতর্কতা।

তিনি বেশকিছু উসূলে ফিকহের নীতিমালাও পেশ করেছেন…

৮- يلزم المقلد اتباع المجتهد ما دام مقلدا
মুজতাহিদ ও মুকাল্লিদ এর মধ্যে মতভেদ হলে মুজতাহিদের রায় প্রাধান্য পাবে।

৯- إذا كان مع ابي حنيفه أحد صاحبه لا يعدل عن قولهما فكيف بما ثبت أنه قوله وقوله أصحابه
ইমাম আবু হানিফার সাথে যদি তার কোন ছাত্র একমত হয় সেটি মজবুত দলিল। আর এখানে তো তার সাথে তার সমস্ত সঙ্গী একমত।

১০- إذا اختلف المتقدمون والمتاخرون في مسأله لا يعدل عما قاله المتقدمون

মুতাকাদ্দিমীন ও মুতাআখখিরীনের মধ্যে মতভেদ হলে মুতাকাদ্দিমীনের মতামত প্রাধান্য পাবে।

১১-اذا تعارض ما في المتون والشروح يقدم ما في المتون

মুতুন ও শুরুহের মধ্যে ভিন্নতা থাকলে মুতুন প্রাধান্য পাবে।

১২- اذا تعارض دليلان أحدهما يقتضي التحريم والآخر يقتضي الإباحه قدم المحرم

যদি দুটি পরস্পর বিরোধী দলিল পাওয়া যায়: একটি হারাম করে, অপরটি হালাল করে। তাহলে হারামের দলিল প্রাধান্য পাবে।

সুতরাং তাওবাকারী শাতিমের রক্ত হারাম গণ্য হবে।

১৩- الحدود تدرء بالشبهات

সন্দেহ সৃষ্টি হলে হদ উঠে যায়

তিরমিজির হাদীস…
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ ادْرَءُوا الْحُدُودَ عَنِ الْمُسْلِمِينَ مَا اسْتَطَعْتُمْ فَإِنْ كَانَ لَهُ مَخْرَجٌ فَخَلُّوا سَبِيلَهُ فَإِنَّ الإِمَامَ أَنْ يُخْطِئَ فِي الْعَفْوِ خَيْرٌ مِنْ أَنْ يُخْطِئَ فِي الْعُقُوبَةِ ‏”‏

আইশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সাধ্যানুযায়ী তোমরা মুসলিমদেরকে দণ্ড প্রদান পরিহার করে চল। কোন প্রকার সুযোগ থাকলে তাকে দণ্ড থেকে পরিত্রাণ দাও। কেননা ইমাম শাস্তি প্রদানে ভুল করার চাইতে মাফ করে দেয়ার ভুল উত্তম।

এর সনদ দূর্বল। কিন্তু এর এক সনদ অপর সনদকে শক্তিশালী করেছে। ইমাম বুখারী বলেন, এই অধ্যায়ের সবচেয়ে বিশুদ্ধ হাদিস হলো…
عن عبد الله بن مسعود قال ” ادرءوا الحدود بالشبهات ، ادفعوا القتل عن المسلمين ما استطعتم
সন্দেহ সৃষ্টি হলে হদ পরিহার করো এবং যথাসম্ভব মুসলমানদেরকে হত্যা করো না।

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া প্রমুখ যে সমস্ত আয়াত ও হাদিস এনে তাওবার পর হত্যা প্রমাণ করতে চেয়েছেন, এগুলোর ব্যাপারে শামী র.র মন্তব্য হলো যে, এগুলোর কোনটাতেই তাওবা করার পর হত্যার দলিল নেই।

উপসংহারে তিনি আরো বলেন…
وحيث لم نجد نصا قطعيا ولا نقلا عن مجتهدنا مرضيا فعلينا ان نتوقف ولا نقول محبتنا لنبينا تقتضي ان نقتل من استطال عليه وإن أسلم لأن المحبة شرطها الإتباع لا الإبتداع فانا نخشى أن يكون أول من يسألنا عن دمه يوم القيامه فالواجب علينا الكف عنه حيث أسلم وحسابه على ربه العالم

হত্যার ব্যাপারে আমি কোন অকাট্য দলিল পাইনি এবং মুজতাহিদীনের কোন রায় পাইনি। সুতরাং আমাদের উচিত নিজেদের সংবরণ করা। একথা বলা উচিত নয় যে “রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামকে মুহাব্বতের দাবী হল, যে তাকে গালি দিবে তাকে হত্যা করা। চাই পরবর্তীতে ইসলাম কবুল করুক বা না করুক।”

কেননা মুহব্বত অনুসরণের নাম, নিজের আবেগকে প্রশ্রয় দেয়ার নাম নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম প্রশ্ন করা হবে মানুষের রক্ত সম্পর্কে। সুতরাং কেউ যদি ইসলাম গ্রহণ করে তার ব্যাপারে আত্মসংবরণ করা উচিত। বাকি, তার হিশাব তো আল্লাহ তায়ালা নিবেনই।

আখিরাতে মাফ পাবে কিনা

এই যে তাওবা কবুল হওয়া না হওয়ার আলোচনা হলো, সেটি দুনিয়ার বিচারে। আখিরাতে মাফ পাবে কিনা এ বিষয়ে শামী র. বলেন…
وأما الحكم الأخروي فإنه مبني على حسن العقيده والصدق التوبه باطنا وذلك مما يختص بعلمه علام الغيوب جل وعلا

আখেরাতে মাফ পাবে কিনা সেটা নির্ভর করে তার তওবা কতটুকু খাঁটি, তার আকিদা কতটুকু সহিহ তার ওপর। আর এই বিষয়টি তো আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। (তাম্বিহুল উলাত ৭৫)

এই পল্লবগ্রাহী বলছে, আখেরাতে মাফ পাওয়ার বিষয়টি কুরআন সুন্নাহ থেকে স্পষ্ট।

যিন্দিক হিশেবে হত্যা করা যাবে কিনা

বায্যাযিয়া প্রণেতা, মুফতী আবুস সুউদ আফেন্দি সহ কেউ কেউ যিন্দিকের হুকুম শাতিমের উপর আরোপ করতে বলেছেন কাজী ইয়াজের অনুসরণে (আশ শিফা ২/২৫৫)। আর আমরা জানি, কিছু ক্ষেত্রে যিন্দিককে তাওবার পরও হত্যা করতে হয়।

এর উত্তর হলো, যিন্দিক আর শাতিম এক নয়। অনেক শাতিমই যিন্দিক নয়। তবে হ্যাঁ কোন শাতিম যদি একই সাথে যিন্দিক প্রমাণিত হয় তাহলে তার উপর যিন্দিকের বিধান প্রয়োগ হবে। অর্থাৎ গ্রেফতারের আগে তাওবা করলে গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু গ্রেফতারের পরে তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না।

বারবার তাওবা ভঙ্গ করলে

যদি কেউ বারবার তাওবা ভঙ্গ করে তার ক্ষেত্রেও হত্যার বিধান প্রয়োগ হবে।

তাজির হিশেবে হত্যা করা যাবে কিনা

বলা হতে পারে যে, যারা হত্যার কথা বলেছেন তারা তাজিরান হত্যার কথা বলেছেন, হদ্দান নয়।

শামী র. উত্তরে বলেন, মুরতাদের জন্য হদ। তাজির নয়। আর তাজিরান শুধুমাত্র ঐ সমস্ত অপরাধের কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে যেগুলো দ্বারা অন্য মানুষ সংক্রমিত হতে পারে। এবং মৃত্যুদণ্ড ব্যতীত যার ক্ষতি থেকে জনসাধারণকে হেফাজত করা যায় না।

তাহলে সমকামীদের কেন তাজিরান মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়

সমকামীদের মৃত্যুদন্ডের ব্যাপারে আমাদের মাযহাবের মুজতাহিদদের পক্ষ থেকে রায় রয়েছে।

পক্ষান্তরে শাতিম/মুরতাদকে তাজিরান হত্যার ব্যাপারে আমাদের মাজহাবের মুজতাহিদ, আসহাবে তাখরিজ ও আসহাবে তারজিহ কারো থেকে এই রায় আসেনি। এবং আল্লামা বায্যায ও তার সঙ্গীরা সেই অবস্থানে নেই যে, এ বিষয়ে রায় দিতে পারে।

দারুল উলূম দেওবন্দের ফাতাওয়া

এবিষয়ে দারুল দেওবন্দের ফাতাওয়া সেটিই যাকে শামী র. প্রাধান্য দিয়েছেন অর্থাৎ তাওবার পর হত্যা করা হবে না।

বি:দ্র: এই লেখার প্রায় পুরোটাই আমরা মুহাক্কিক ইবনে আবেদিন শামি র.র তাম্বিহু উলাতিল হুক্কাম আলা আহকামি শাতিমি খইরিল আনাম ও রদ্দুল মুহতার থেকে নিয়েছি। এই গবেষণার কৃতিত্ব তার। আমি শুধু ভাষান্তরকারী। আল্লাহতালা তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

➤ আর উদ্ধৃতিগুলোর ক্ষেত্রে যথাসাধ্য কিতাব খুলে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।

লিখন: উমর ফারূক তাসলিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *