রজমের প্রামাণ্যতা, মাসাঈল ও অস্বীকারকারীদের জবাব 

সূচিপত্র

রজম কী
রজম সাব্যস্ত হওয়ার প্রক্রিয়া
চার মাজহাবে রজম সাব্যস্ত হওয়ার শর্ত
অজ্ঞতার কারণের রজম বাতিল হওয়ার দলিল
আধুনিক ডিভাইস প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে কিনা
রজম ও বেত্রাঘাত একত্রিকরণ সম্পর্কে মতভেদ
দেশান্তর বিষয়ে মতভেদ
রজম প্রয়োগের পদ্ধতি
কুরআনে রজম
রজমের আয়াত মানসুখের কারণ
রাসূল সা. কর্তৃক ইহুদিদের রজম 
রাসূল সা. কর্তৃক মুসলমানদের রজম 
রাসূল সা.এর মৌখিক নির্দেশনা
খোলাফায়ে রাশেদা কর্তৃক রজম
রজম সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবাগণের নাম
রজম সংক্রান্ত হাদিসের পর্যায়
ইজমায়ে উম্মত
রজম অস্বীকার কারা করে
মুনকিরীনে রজমের দলিল ও আমাদের জবাব
কিছু আপত্তির জবাব
রজম অস্বীকারের বিষয়ে উমর রা.-এর ভবিষ্যৎবাণী
রজমের যৌক্তিকতা 
মুনকিরীনে রজমের হুকুম
রজম ও রজম অস্বীকারকারীদের শাস্তি প্রয়োগের দায়িত্ব কার 

রজম কী

ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় দুই ধরনের শাস্তি রয়েছে। এক: হদ। যা আল্লাহর হক এবং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। দুই: তাজির: যার পরিমাণ অনির্ধারিত। শরীয়তে যে সমস্ত অপরাধের কারণে হদ আসে তার মধ্যে একটি হলো যিনা।

যিনার সংজ্ঞায় ওলামাগণের মতভেদ রয়েছে। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী যিনার সংজ্ঞা হলো, বালেগ পুরুষ – সহবাসের অধিকার নেই এমন কোন বালেগার সামনের লজ্জাস্থান দিয়ে স্বেচ্ছায় অন্তত লিঙ্গের সুপারির মতো অংশটা প্রবেশ করানো অথবা করাতে দেয়া; সন্দেহ ব্যতীত।(ফাতহুল কাদীর ৫/২৩৬)

জিনার শাস্তি তিন ধরনের: ১- গোলাম-বাদী জিনা করলে ৫০ বেত্রাঘাত। ২- স্বাধীন-স্বাধীনা অবিবাহিত অবস্থায় জিনা করলে ১০০ বেত্রাঘাত। ৩- আর বিবাহিত অবস্থায় করলে রজম।

রজম হলো পাথর নিক্ষেপ করে করে হত্যা করা।

রজম প্রয়োগ হবে মুহসান-মুহসানার উপর। إحصان শব্দের ৩টি অর্থ ১- বিবাহিতা। (যেমন সূরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াতে এই অর্থে ব্যবহার হয়েছে)
২ পবিত্রা, সতী। (যেমন সূরা নুরের ২৩ নম্বর আয়াতে এই অর্থে ব্যবহার হয়েছে)
৩- আযাদ (যেমন সূরা নিসার ২৫ নম্বর আয়াতে এই অর্থে ব্যবহার হয়েছে)

রজমের ক্ষেত্রে ইহসোনের অর্থ বিবাহ ও আজাদী।

রজম সাব্যস্ত হওয়ার প্রক্রিয়া

রজম দুইভাবে সাব্যস্ত হয়। এক: অপরাধীর স্বীকারোক্তি। দুই: ৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য।

অপরাধীর স্বীকারোক্তি: স্বীকারোক্তি মৌখিকভাবে হতে হবে। ইশারা বা লিখিত হওয়া যথেষ্ট নয়। এমনকি যদি বোবাও হয় তবু ইশারা যথেষ্ট হবে না। এর দ্বারা বোঝা যায় বোবার উপর রজম আসবে শুধু সাক্ষের মাধ্যমে।

ইবনুল হুমাম র. থেকে বর্ণিত, ইমাম আবু হানিফা র.এর মতে – যদি যিনার কথা কেউ স্বীকার করে তাহলে তার কাছ থেকে ৪ বার স্বীকারোক্তি নিতে হবে। ৪ বারের কম স্বীকারোক্তি দিলে রজম আসবে না। এবং প্রত্যেকবার স্বীকারোক্তি দেয়ার সময় জায়গা বদল করতে হবে।

ইমাম আহমদের মতেও ৪ বার স্বীকারোক্তি দিতে হবে। তবে জায়গা বদল করতে হবে না।

ইমাম মালেক ও শাফেঈ র.এর মতে একবার স্বীকারোক্তি দিলেই চলবে।

৪ সাক্ষী: ৪ জন সাক্ষী জরুরি হওয়ার ব্যাপারে ইজমা রয়েছে। এর কম হলে হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন…
والّٰتِیۡ یَاۡتِیۡنَ الۡفَاحِشَۃَ مِنۡ نِّسَآئِکُمۡ فَاسۡتَشۡهِدُوۡا عَلَیۡهِنَّ اَرۡبَعَۃً مِّنۡکُمۡ…
আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী তলব করবে।… (নিসা ১৫)

আরো বলেছেন…
وَالَّذِیۡنَ یَرۡمُوۡنَ الۡمُحۡصَنٰتِ ثُمَّ لَمۡ یَاۡتُوۡا بِاَرۡبَعَۃِ شُهَدَآءَ فَاجۡلِدُوۡهُمۡ…
আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে না আসে, তাদেরকে তোমরা আশিটি বেত্ৰাঘাত কর।… (নুর ৪)

এই চারজন সাক্ষ্যের কথা কুরআনে তো আছেই। এমনকি এটি তাওরাতেও ছিল। যেমনটা ইবনে কাসীর র. সূরা মায়েদার ৪৩ নাম্বার আয়াতের শানে নুযূলের আলোচনায় আবু দাউদের উদ্ধৃতিতে লিখেছেন।

সাক্ষ্যদের শর্ত ১-মুসলিম, ২- আকেল, ৩- বালেগ, ৪- আযাদ, ৫- কখনো যিনা করেনি (বাদাঈউস সানাঈ ৭/৪১) ৬- পুরুষ হওয়া। (হুদুদের ক্ষেত্রে নারীদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হয় না।) ৭- ইত্তিহাদে (একই) মজলিস।

সাক্ষীদের প্রত্যেককে স্পষ্টভাবে যিনা ঘটার সাক্ষ্য দিতে হবে। প্রত্যেক সাক্ষীর কথায় মিল থাকতে হবে। যদি সাক্ষীদের মধ্যে মতভেদ হয়ে যায় তাহলে রজম বাতিল হয়ে যাবে।

সাক্ষীগণ সত্য বলছে কিনা তা বুঝতে বিচারক তাদেরকে জেরা করবে। যিনা দ্বারা তারা কী বুঝাচ্ছে সেটাও জানতে চাইবে। কেননা হাদিসে চোখের জেনা, হাতের জেনা, পায়ের জেনা, অন্তরের জেনা ইত্যাদির কথা এসেছে। যেগুলোর কারণে হদ আসে না। সাক্ষীরা সেই যিনা উদ্দেশ্য নিচ্ছে কিনা।

স্বীকারোক্তি ও সাক্ষ্য উভয় অবস্থায় বিচারক জেরা করবে। অনেক সময় যে স্বীকারোক্তি দেয় সেও মিথ্যা বলতে পারে। হতে পারে তাকে কেউ বাধ্য করেছে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে। অথবা সে নিজেই কারো উপর জিদ/অভিমান করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিচ্ছে। অথবা সে নেশা করে কথা বলছে।

এব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, সহীহ বিবাহ ব্যতীত রজম আসবে না। এবং যেকোনো সন্দেহ দ্বারা রজম বাতিল হয়ে যাবে।

যদি সন্দেহজনিত কারণে রজম বাতিল হয়ে যায় তাহলে বিচারক অপরাধ বিবেচনা করে তাজির করতে পারবে।

জেরা করার দলিল

মাইয আসলামী যিনার স্বীকারোক্তি দেয়ার পর রাসূল সা. তাকে বলেন…
فَبِمَنْ؟ قَالَ: بِفُلَانَةٍ، فَقَالَ: هَلْ ضَاجَعْتَهَا؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: هَلْ بَاشَرْتَهَا؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: هَلْ جَامَعْتَهَا؟ قَالَ: نَعَمْ،
তুমি কি তার সঙ্গে শুয়েছ? সে বললো, হ্যাঁ। তিনি আবারো প্রশ্ন করলেন, তুমি কি তার শরীরে শরীর মিশিয়েছ? সে বললো, হ্যাঁ। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কি তার সঙ্গে সঙ্গম করেছো? সে বললো, হ্যাঁ.. (আবু দাউদ ৪৪১৯, সহীহ)

এছাড়াও অন্যান্যভাবে যাচাই করবে।

যদি রজম প্রয়োগ হওয়ার পূর্বে সাক্ষীদের একজনও মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয় তাহলে রজম বাতিল হয়ে যাবে।

স্বীকারোক্তির ক্ষেত্রে কেউ নিজ স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে নিলে রজম বাতিল হবে কিনা এব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। হানাফী, শাওয়াফে ও হাম্বলীদের মতে রজম বাতিল হয়ে যাবে। এমনকি রজম চলাকালীনও যদি কেউ স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে তাহলেও রজম বাতিল হয়ে যাবে।দলিল…

মাইয আসলামী যিনার স্বীকারোক্তি দিয়েছিল। অত:পর…
فَأَمَرَ بِهِ أَنْ يُرْجَمَ، فَأُخْرِجَ بِهِ إِلَى الْحَرَّةِ، فَلَمَّا رُجِمَ فَوَجَدَ مَسَّ الْحِجَارَةِ جَزِعَ فَخَرَجَ يَشْتَدُّ، فَلَقِيَهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أُنَيْسٍ وَقَدْ عَجَزَ أَصْحَابُهُ، فَنَزَعَ لَهُ بِوَظِيفِ بَعِيرٍ فَرَمَاهُ بِهِ فَقَتَلَهُ، ثُمَّ أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ، فَقَالَ: هَلَّا تَرَكْتُمُوهُ
রাসূল সা. তাকে রজম করার আদেশ দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তাকে আল-হাররা এলাকায় নিয়ে যাওয়া হলো। যখন তাকে পাথর মারা শুরু হলো, সে আঘাতের চোটে আতঙ্কিত হলো এবং দ্রুত দৌঁড়াতে লাগলো।

আব্দুল্লাহ ইবনু উনাইস রা. এমতাবস্থায় তার সাক্ষাৎ পেলেন যে, তাকে পাথর মারার জন্য নিয়োজিত ব্যক্তিগণ তাকে ধরতে অপারগ হলো। তিনি উটের সামনের পায়ের হাড় তুলে তার দিকে নিক্ষেপ করেন, তাতে সে নিহত হয়। অতঃপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে এ ঘটনা ব্যক্ত করেন। তিনি বললেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দিলে না কেন? (আবু দাউদ ৪৪১৯, সহীহ)

যদি সাক্ষী মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয় তাহলে অপবাদের কারণে তাকে হদ্দে কজফ হিশেবে ৮০টি বেত্রাঘাত করা হবে।

চার মাজহাবে রজম সাব্যস্ত হওয়ার শর্ত

যদিও রজমের অস্তিত্ব ইজমাঈ। কিন্তু এর শাখাগত মাসাইলগুলোতে মতভেদ রয়েছে।

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী রজম প্রয়োগ হওয়ার জন্য শর্ত হলো ১- মুসলমান হওয়া, ২- বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া, ৩- বালেগ হওয়া, ৪- আযাদ হওয়া, ৫-সহিহ বিবাহ হওয়া, ৬- বিবাহের পর বৈধ পন্থায় শারীরিক সম্পর্ক হওয়া ৭-মুহসান/মুহসানা অবস্থায় বিয়ে হওয়া ৮- দারুল ইসলাম হওয়া ৯- ইচ্ছাকৃতভাবে করা ( জোরপূর্বক ধর্ষণের ক্ষেত্রে যদি ধর্ষণ পুরুষ করে তাহলে নারীর উপর শাস্তি আসবে না। আর যদি নারী ধর্ষণ করে তাহলে তিন মাযহাব অনুযায়ী পুরুষের উপর শাস্তি আসবে না। তবে হাম্বলী মাযহাব অনুযায়ী পুরুষ ধর্ষিত হলে দুই অবস্থা। এক: সে লিঙ্গ উত্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে কিনা? চেষ্টা করে থাকলে হদ আসবে না। চেষ্টা না করে থাকলে হদ আসবে। (আল মুগনী, মাজমুউল ফাতাওয়া)
১০- জীবিত ব্যক্তির সাথে করা। ১১- নারীর সামনের অঙ্গ দিয়ে সঙ্গম করা। অবশ্য শাফেঈ ও আহমদ র.এর মতে পিছনের সাইড দিয়ে করলেও হদ আসবে। ১২- যিনা যে হারাম সেই জ্ঞান থাকা। (দলিল সামনে…)

যার সাথে যিনায় লিপ্ত হয়েছে তার ক্ষেত্রেও একই শর্ত।

শাফেঈ মাজহাবে ব্যাভিচারকারী-ব্যাভিচারকারিণী কারো জন্য মুসলিম ও আযাদ হওয়া শর্ত নয়।

হাম্বলি মাজহাবেও মুসলিম হওয়া শর্ত নয়, তবে আযাদ হতে হবে।

মালেকী মাজহাবে হানাফী মাজহাবের শর্তগুলোর সাথে আরেকটি বিষয় যোগ করা হয় যে, সঙ্গম না হয়ে থাকলেও স্বামী স্ত্রীর মধ্যে খলওয়াত (এমন নির্জনতা যাতে সহবাসে কোন বাধা ছিল না) হতে হবে।

অজ্ঞতার কারণের রজম বাতিল হওয়ার দলিল

অনেক সময় নওমুসলিম প্রমুখ ইসলামের বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে অনবহিত থাকে। এমতাবস্থায় রজম বাতিল হয়ে যাবে। হজরত উমর, উসমান এবং আলী রা. তিনোজন অজ্ঞতার কারণে হদ বাতিল করার রায় দিয়েছেন। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: ১৪৫৬৮ থেকে ১৪৫৭৪ পর্যন্ত হাদিসগুলো)

এ সংক্রান্ত আরো হাদিস…
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ حَمْزَةَ بْنِ عَمْرٍو الأَسْلَمِيِّ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ عُمَرَ بَعَثَهُ مُصَدِّقًا فَوَقَعَ رَجُلٌ عَلَى جَارِيَةِ امْرَأَتِهِ فَأَخَذَ حَمْزَةُ مِنْ الرَّجُلِ كَفِيلاً حَتَّى قَدِمَ عَلَى عُمَرَ وَكَانَ عُمَرُ قَدْ جَلَدَهُ مِائَةَ جَلْدَةٍ فَصَدَّقَهُمْ وَعَذَرَهُ بِالْجَهَالَةِ وَقَالَ جَرِيرٌ وَالأَشْعَثُ لِعَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ فِي الْمُرْتَدِّينَ اسْتَتِبْهُمْ وَكَفِّلْهُمْ فَتَابُوا وَكَفَلَهُمْ عَشَائِرُهُمْ وَقَالَ حَمَّادٌ إِذَا تَكَفَّلَ بِنَفْسٍ فَمَاتَ فَلاَ شَيْءَ عَلَيْهِ وَقَالَ الْحَكَمُ يَضْمَنُ
ইবনু আমর আসলামী রহ. তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, ‘উমার রা. তাঁকে সাদকা উশুলকারী নিযুক্ত করে পাঠান। সেখানে এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর দাসীর সাথে ব্যভিচার করে বসল। তখন হামযা র. কিছু লোককে তার পক্ষ হতে যামিন স্থির করলেন। পরে তিনি উমার রা.-এর নিকট ফিরে আসলেন। উমার রা. উক্ত লোকটিকে একশ’ বেত্রাঘাত করলেন এবং লোকদের বিবরণকে সত্য বলে গ্রহণ করলেন। তারপর লোকটিকে তার অজ্ঞতার জন্য (স্ত্রীর দাসীর সাথে যৌন সম্ভোগ করা যে অবৈধ তা সে জানত না) অব্যাহতি দেন। (বুখারী ২২৯০, শারহু মায়ানিল আসার ৪৮৭৬)

আধুনিক ডিভাইস প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে কিনা

যদি কেউ যিনা হতে দেখে রেকর্ড করে অথবা কেউ নিজেরটা নিজেই রেকর্ড করে, তাহলে ওই রেকর্ড দ্বারা আদালত থেকে হদ্দে যিনা প্রমাণিত করা যাবে না। কেননা এখনো এই আধুনিক প্রযুক্তিগুলো অথেন্টিসিটি অর্জন করতে পারেনি।
তবে বিচারক উচিত মনে করলে তাজির করবে।

রজম ও বেত্রাঘাত একত্রিকরণ সম্পর্কে মতভেদ

স্বাধীন ও বিবাহিত নারী পুরুষ জিনা করলে তাকে শুধু রজম করবে নাকি পাশাপাশি ১০০ বেত্রাঘাতও করবে এ বিষয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে।

ইমাম আহমদ, দাউদ জাহেরী, ইসহাক বিন রাহওয়াই ও আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী র.এর মতে তাকে প্রথমে ১০০ বেত্রাঘাত করবে তারপর রজম করবে।

ইনারা বাকি সকল ফুকাহার মতে রজম ও বেত্রাঘাত একত্রিত হবে না। অর্থাৎ শুধু রজম করবে।
দেশান্তর বিষয়ে মতভেদ

অবিবাহিত নারী-পুরুষ জিনা করলে ইমাম শাফেঈ ও আহমদ র.এর মতে ১০০ বেত্রাঘাতের পরে দেশান্তরও করবে। ইমাম মালেকের মতে পুরুষকে দেশান্তর করবে। মহিলাকে করবে না। আর ইমাম আবু হানিফার মতে হদ হলো ১০০ বেত্রাঘাত, যেটা বাধ্যতামূলক। আর দেশান্তর হল তাজির। যা বিচারকের উপর নির্ভর করবে। বিচারক অপরাধের প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে ইচ্ছে হলে দেশান্তর করবে, অন্যথায় নাও করতে পারে।

রজম প্রয়োগের পদ্ধতি

রজম প্রয়োগ করবে খোলা ময়দানে। যেখানে সাধারণ মানুষ উপস্থিত থাকবে।

যদি অপরাধী নারী হয় তাহলে তার কাপড়-চোপড় শক্তভাবে আটকাবে। যাতে রজমের সময় কাপড় সরে না যায়। তারপর একটি গর্ত করে শরীরের একাংশ তাতে ঢুকাবে। সর্বপ্রথম সাক্ষীগণ পাথর মারবে। তারপর রাষ্ট্রপ্রধান। তারপর সাধারণ মুসলমানগণ।

সাধারণ মানুষ কাতার বেঁধে দাঁড়িয়ে পাথর মারবে। এক কাতারের মারা শেষ হলে তারা পিছিয়ে যাবে। এরপর অপর কাতারের লোকজন এসে পাথর মারবে। এভাবে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে পাথর নিক্ষেপ করতে থাকবে। (আদ দুররুল মুখতার ৩০৭)

পাথর নিক্ষেপ মধ্যম শক্তিতে করবে। অবশ্য বেশি বিলম্ব করবে না। যত তাড়াতাড়ি মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দিবে তত ভালো (আদ দুরারুল আহকাম ২/৬৩)

কুরআনে রজম

মুনকিরীনে হাদিসগণ (আহলে কুরআন) রজমকে কুরআন-বিরোধী বিধান আখ্যা দিয়ে থাকে।

যদিও রজমের বিধান কুরআন মাজিদে স্পষ্টভাবে নেই। কিন্তু কুরআন মাজিদে এর ইঙ্গিত রয়েছে।

১- সূরা মায়েদার ৪১ থেকে ৫০ পর্যন্ত আয়াতগুলো রজমের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। ৪৩ তম আয়াত…
وَ کَیۡفَ یُحَکِّمُوۡنَکَ وَ عِنۡدَهُمُ التَّوۡرٰىۃُ فِیۡهَا حُکۡمُ اللّٰهِ ثُمَّ یَتَوَلَّوۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ ؕ وَ مَاۤ اُولٰٓئِکَ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ
“আর তারা আপনার উপর কিভাবে বিচারের ভার ন্যস্ত করবে? অথচ তাদের কাছে রয়েছে তাওরাত। যাতে রয়েছে আল্লাহর বিধান। তা সত্বেও তারা এরপর মুখ ফিরিয়ে নেয়। এবং তারা মুমিন নয়।”

ইমাম রাযি র. তাফসিরে কাবিরে (৪/৩২৬) লিখেছেন, এখানে, حُکۡمُ اللّٰهِ দ্বারা রজম উদ্দেশ্য।

অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা যে এই আয়াতে বলেছেন, তাওরাতে আল্লাহর বিধান রয়েছে, যা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাওরাতের সেই বিধানটি রজম।

কুরআন মাজিদের একটি মুজিযা হলো, তাওরাতে এত বিকৃতি ঘটার পরও এখন পর্যন্ত (তারা তৌরাহ বলে) এটি রয়েছে।

মূসা আলাইহিস সালামের শরীয়তে (তাওরাতে) যে রজম ছিল তার সাক্ষ্য আবার ইঞ্জিলেও আছে। এমনকি বিকৃতির পরও বর্তমান বাইবেলে রয়েছে। (দেখুন গসপেল অব জনের ৮ অনুচ্ছেদের ৩-৮)

কয়েক আয়াত পর এসেছে
وَ اَنۡزَلۡنَاۤ اِلَیۡکَ الۡکِتٰبَ بِالۡحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیۡهِ مِنَ الۡکِتٰبِ وَ مُهَیۡمِنًا عَلَیۡهِ فَاحۡکُمۡ بَیۡنَهُمۡ بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ وَ لَا تَتَّبِعۡ اَهۡوَآءَهُمۡ عَمَّا جَآءَکَ مِنَ الۡحَقِّ
আর আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি ইতোপূর্বেকার কিতাবসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী ও সেগুলোর তদারককারীরূপে। সুতরাং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না।

এই আয়াতগুলো যে রজমের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে তার দলিল…
عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ، قَالَ مُرَّ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم بِيَهُودِيٍّ مُحَمَّمًا مَجْلُودًا فَدَعَاهُمْ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏”‏ هَكَذَا تَجِدُونَ حَدَّ الزَّانِي فِي كِتَابِكُمْ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا نَعَمْ ‏.‏ فَدَعَا رَجُلاً مِنْ عُلَمَائِهِمْ فَقَالَ ‏”‏ أَنْشُدُكَ بِاللَّهِ الَّذِي أَنْزَلَ التَّوْرَاةَ عَلَى مُوسَى أَهَكَذَا تَجِدُونَ حَدَّ الزَّانِي فِي كِتَابِكُمْ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ لاَ وَلَوْلاَ أَنَّكَ نَشَدْتَنِي بِهَذَا لَمْ أُخْبِرْكَ نَجِدُهُ الرَّجْمَ وَلَكِنَّهُ كَثُرَ فِي أَشْرَافِنَا فَكُنَّا إِذَا أَخَذْنَا الشَّرِيفَ تَرَكْنَاهُ وَإِذَا أَخَذْنَا الضَّعِيفَ أَقَمْنَا عَلَيْهِ الْحَدَّ قُلْنَا تَعَالَوْا فَلْنَجْتَمِعْ عَلَى شَىْءٍ نُقِيمُهُ عَلَى الشَّرِيفِ وَالْوَضِيعِ فَجَعَلْنَا التَّحْمِيمَ وَالْجَلْدَ مَكَانَ الرَّجْمِ ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ اللَّهُمَّ إِنِّي أَوَّلُ مَنْ أَحْيَا أَمْرَكَ إِذْ أَمَاتُوهُ ‏”‏ ‏.‏ فَأَمَرَ بِهِ فَرُجِمَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ ‏(‏ يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لاَ يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ‏)‏ إِلَى قَوْلِهِ ‏(‏ إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ‏)‏ يَقُولُ ائْتُوا مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم فَإِنْ أَمَرَكُمْ بِالتَّحْمِيمِ وَالْجَلْدِ فَخُذُوهُ وَإِنْ أَفْتَاكُمْ بِالرَّجْمِ فَاحْذَرُوا ‏.‏ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى ‏(‏ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ‏)‏ ‏(‏ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ‏)‏ ‏(‏ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ‏)‏ فِي الْكُفَّارِ كُلُّهَا

বারা ইবনু আযিব রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মুখ দিয়ে একজন ইয়াহুদীকে কালি মাখা এবং বেত্ৰাঘাতকৃত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন তিনি বলেন, তোমরা কি তোমাদের কিতাবে ব্যভিচারের শাস্তি এরূপই পেয়েছ? তারা বলল, হ্যাঁ। এরপর তিনি তাদের মধ্য হতে একজন আলিম (পাদরী) ব্যক্তিকে ডাকালেন এবং বললেন, তোমাকে সে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, যিনি মূসা (আঃ) এর প্রতি তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ করেছিলেন, এরূপই কি তোমরা তোমাদের কিতাবে ব্যভিচারীর শাস্তি পেয়েছ?

তখন ইয়াহুদী আলিম ব্যক্তি বললেন, না। তিনি আরো বললেন, আপনি যদি আমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে এভাবে না বলতেন তবে আমি আপনাকে জানাতাম না যে, এর প্রকৃত শাস্তি রজম (পাথর নিক্ষেপ করা)। কিন্তু আমাদের সমাজের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝে এর ব্যাপক প্রচলন হয়ে গেছে। অতএব, আমরা যখন এতে কোন সম্ভ্রান্ত লোককে পেতাম, তখন তাকে ছেড়ে দিতাম এবং যখন কোন নিঃস্ব ব্যক্তিকে পাকড়াও করতাম তখন তার উপর শারীআতের প্রকৃত শাস্তি হদ বাস্তবায়িত করতাম। পরিশেষে আমরা বললাম, তোমরা সকলেই এসো, আমরা সবাই মিলে এ ব্যাপারে একটি শাস্তি নির্ধারিত করে নেই, যা ভদ্র ও অভদ্র সকলের উপরই প্রযোজ্য হবে। সুতরাং আমরা ব্যভিচারের শাস্তি কালি লাগানো এবং বেত্ৰাঘাত করাকেই স্থির করে নিলাম, পাথর নিক্ষেপের পরিবর্তে।

তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আল্লাহ! আমিই প্রথম ব্যক্তি, যে তোমার নির্দেশ রজম বাস্তবায়িত (পুনর্জীবিত) করলাম, যা তারা বাতিল করে ফেলেছিল। সুতরাং তিনি তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিলেন। অবশেষে ঐ ইয়াহুদীকে পাথর মারা হল। এরপর মহান আল্লাহ এ আয়াতঃ “হে রসূল! যারা কুফরী কাজে দ্রুতগামী তাদের কার্যকলাপ যেন আপনাকে চিন্তিত না করে। … অতঃপর সেই বাণী পর্যন্ত যদি তোমরা তা প্রদত্ত হও, তবে তা ধারণ কর”- (সূরা ময়িদাহ ৫ঃ ৪১) পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন। তারা (ইয়াহুদীরা) বলতো যে, তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট গমন করো, যদি তিনি তোমাদেরকে এ ব্যাপারে- কালি লাগানো এবং বেত্ৰাঘাতের নির্দেশ প্রদান করেন, তবে তোমরা তা কার্যকর করবে; আর যদি তিনি রজমের নির্দেশ দেন তবে তা প্রত্যাখ্যান করবে। আল্লাহ তা’আলা (এ মর্মে) আয়াত অবতীর্ণ করেন, “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আয়াত মুতাবিক বিচারকার্য পরিচালনা করে না তারাই হলো কাফির (অস্বীকারকারী) সম্প্রদায়” (সূরা ময়িদাহ ৫ঃ ৪৪)।

“আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আয়াত অনুসারে বিচার করে না তারাই হলো অত্যাচারী দল”- (সূরা ময়িদাহ ৫ঃ ৪৫)। “আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আয়াত অনুযায়ী বিচার করে না তারাই হলো সীমালঙ্ঘনকারী দল” (সূরা ময়িদাহ ৫ঃ ৪৭)। এ সবগুলো আয়াত কাফিরদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়। (মুসলিম ৪৩৩২, বুখারী)

২- রজমের প্রতি ইশারাকারী অপর আয়াত…
والّٰتِیۡ یَاۡتِیۡنَ الۡفَاحِشَۃَ مِنۡ نِّسَآئِکُمۡ فَاسۡتَشۡهِدُوۡا عَلَیۡهِنَّ اَرۡبَعَۃً مِّنۡکُمۡ ۚ فَاِنۡ شَهِدُوۡا فَاَمۡسِکُوۡ هُنَّ فِی الۡبُیُوۡتِ حَتّٰی یَتَوَفّٰهُنَّ الۡمَوۡتُ اَوۡ یَجۡعَلَ اللّٰهُ لَهُنَّ سَبِیۡلًا
আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী তলব করবে। যদি তারা সাক্ষ্য দেয় তবে তাদেরকে ঘরে অবরুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয় বা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোন ব্যবস্থা করেন। (নিসা ১৫)

এই আয়াতে যে রজমের কথা বলা হয়েছে তার দলিল…
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ، قَالَ كَانَ نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ كُرِبَ لِذَلِكَ وَتَرَبَّدَ لَهُ وَجْهُهُ – قَالَ – فَأُنْزِلَ عَلَيْهِ ذَاتَ يَوْمٍ فَلُقِيَ كَذَلِكَ فَلَمَّا سُرِّيَ عَنْهُ قَالَ ‏ “‏ خُذُوا عَنِّي فَقَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلاً الثَّيِّبُ بِالثَّيِّبِ وَالْبِكْرُ بِالْبِكْرِ الثَّيِّبُ جَلْدُ مِائَةٍ ثُمَّ رَجْمٌ بِالْحِجَارَةِ وَالْبِكْرُ جَلْدُ مِائَةٍ ثُمَّ نَفْىُ سَنَةٍ ‏”‏

উবাদাহ্ ইবনু সামিত রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর যখন ওয়াহী অবতীর্ণ হতো, তখন তাকে ক্লান্ত মনে হতো এবং তার মুখমণ্ডলে ক্লান্তির চিহ্ন ফুটে উঠত। বর্ণনাকারী বলেন, একদা যখন তার ওপর ওয়াহী অবতীর্ণ হলো তখন তার অবস্থা ঐরূপ হল। এরপর যখন অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেল, তখন তিনি বললেন, তোমরা আমার কাছ হতে শিক্ষা গ্রহণ কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা মহিলাদের জন্য একটি পন্থা বের করে দিয়েছেন। যদি কোন বিবাহিত পুরুষ কোন বিবাহিতা মহিলার সাথে এবং কোন অবিবাহিত পুরুষ কুমারী মেয়ের সাথে ব্যভিচার করে, তবে বিবাহিত ব্যক্তিকে একশ’ বেত্ৰাঘাত করবে, এরপর পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করবে। আর অবিবাহিত পুরুষ বা মহিলাকে একশ’ বেত্ৰাঘাত করবে, এরপর তাদেরকে এক বছরের জন্য নির্বাসন দেবে (মুসলিম ৪৩০৮)

৩- কুরআনে রজম সংক্রান্ত একটা আয়াত ছিল, যা পরবর্তীতে মানসুখ (রহিত) হয়ে যায়।

ক- ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করতাম
الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ إِذَا زَنَيَا فَارْجُمُوهُمَا الْبَتَّةَ
বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা জিনা করলে তাদেরকে রজম করো। (ইবনে মাজাহ ২৫৫৩, সহীহ)

সুনানে কুবরা লিল বাইহাকীর ১৬৯৯৪-৯৬ নম্বর হাদিসগুলোতে এই আয়াত সংক্রান্ত হাদিস আছে।

খ- যির বিন হুবাইশ রা. বলেন যে, হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) আমাকে বললেন, সূরা আল-আহযাবে কয়টি আয়াত আছে বলে মনে কর? আমি বললাম, ৭৩ আয়াত! উবাই বিন কা’ব রা. বলেন, এই সূরাটি সূরা বাকারার সমান ছিল এবং এতে এই আয়াত ছিলো।
الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ إِذَا زَنَيَا فَارْجُمُوهُمَا الْبَتَّةَ
(কুবরা, বাইহাকী ১৬৯৯৪)

সূরা আহযাব ছিল সূরা আল-বাকারার সমান, এর অর্থ হলো পরবর্তীতে এর কিছু আয়াতের তেলাওয়াত রহিত করা হয়েছে।

গ- ইমাম বাইহাকী র. বর্ণনা করেন, কাসির বিন সলত রা. বলেন, আমরা মারওয়ানের কাছে বসা ছিলাম। হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রা.)-ও আমাদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, আমরা রাসূল সা.এর যুগে الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ إِذَا زَنَيَا فَارْجُمُوهُمَا الْبَتَّةَ আয়াতটি পাঠ করতাম। মারওয়ান বললেন, আমরা পবিত্র কোরআনে এই আয়াতটি সন্নিবেশিত করতে পারি না? হযরত যায়েদ রা. বললেন, না! আপনি কি দেখেন না যে, বিবাহিত হলেই রজম করা হয়? (অথচ আয়াতে শুধুমাত্র বৃদ্ধদের কথা বলা হয়েছে)

হযরত যায়েদ আরো বলেন, সাহাবায়ে কেরাম এ বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। সে সময় হযরত ওমর বিন খাত্তাবও আমাদের মধ্যে ছিলেন। তিনি বললেন, আমি এ ব্যাপারটি নবী সা.এর কাছে গিয়ে উল্লেখ করব। হজরত ওমর (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে রজমের আয়াতটি মুসহাফে শামিল করার আবেদন জানালে তিনি বললেন, এ কাজ করার এখতিয়ার আমার নেই। (কুবরা, বাইহাকী ১৬৯৯৪)

হাদিসটি সহিহ। ইবনে হাজার আসকালানী এই হাদিসের অনেকগুলো সনদ এনেছেন।

৪- মুস্তাদরাকে হাকেমের (৮০৬৯) বর্ণনা…
عَنِ ‌ابْنِ ‌عَبَّاسٍ، رضي الله عنهما قَالَ: ” مَنْ كَفَرَ بِالرَّجْمِ فَقَدْ كَفَرَ بِالْقُرْآنِ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ قَوْلِهِ عز وجل: يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ فَكَانَ ‌الرَّجْمُ مِمَّا أَخْفَوْا
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: “যে ব্যক্তি রজম অবিশ্বাস করে সে কোরানকে অবিশ্বাস করে। যেন সে আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে এই আয়াত যেন আশা করেনি – “হে আহলে কিতাব! আমাদের রসূল তোমাদের কাছে এসেছেন, তোমরা কিতাব থেকে যা গোপন করছ তার অনেক কিছুই তোমাদের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছিল। – রজমের বিধান তারা গোপন করেছিল। (হাফেজ জাহাবির মতে সহিহ)

এখানে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর উক্তি – যে রজম অস্বীকার করল সে কুরআন অস্বীকার করল – দ্বারা বুঝা যায়, রজম কুরআনি বিধান।

৫- বুখারী মুসলিমের হাদিস
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ وَزَيْدِ بْنِ خَالِدٍ الْجُهَنِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّهُمَا قَالَا إِنَّ رَجُلًا مِنْ الأَعْرَابِ أَتَى رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَنْشُدُكَ اللهَ إِلَّا قَضَيْتَ لِيْ بِكِتَابِ اللهِ فَقَالَ الْخَصْمُ الْآخَرُ وَهُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ نَعَمْ فَاقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللهِ وَأْذَنْ لِيْ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ قُلْ قَالَ إِنَّ ابْنِيْ كَانَ عَسِيْفًا عَلَى هَذَا فَزَنَى بِامْرَأَتِهِ وَإِنِّيْ أُخْبِرْتُ أَنَّ عَلَى ابْنِي الرَّجْمَ فَافْتَدَيْتُ مِنْهُ بِمِائَةِ شَاةٍ وَوَلِيْدَةٍ فَسَأَلْتُ أَهْلَ الْعِلْمِ فَأَخْبَرُونِيْ أَنَّمَا عَلَى ابْنِيْ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيْبُ عَامٍ وَأَنَّ عَلَى امْرَأَةِ هَذَا الرَّجْمَ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لَاقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بِكِتَابِ اللهِ الْوَلِيْدَةُ وَالْغَنَمُ رَدٌّ وَعَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيْبُ عَامٍ اغْدُ يَا أُنَيْسُ إِلَى امْرَأَةِ هَذَا فَإِنْ اعْتَرَفَتْ فَارْجُمْهَا قَالَ فَغَدَا عَلَيْهَا فَاعْتَرَفَتْ فَأَمَرَ بِهَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَرُجِمَتْ

আবূ হুরাইরাহ্ ও যায়দ ইবনু খালিদ জুহানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা বলেন, এক বেদুঈন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি, আমার ব্যাপারে আল্লাহর কিতাব মত ফয়সালা করুন।’ তখন তার প্রতিপক্ষ, যে তার তুলনায় বেশি জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন সে বলল, ‘হ্যাঁ, আপনি আমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব মত ফয়সালা করুন এবং আমাকে বলার অনুমতি দিন।’ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘বল’। সে বলল, আমার ছেলে এর নিকট মজুর ছিলো। সে তার স্ত্রীর সঙ্গে যিনা করেছে। আমাকে অবহিত করা হয়েছে যে, আমার ছেলের প্রাপ্য দন্ড হল রজম। তখন আমি তাকে (ছেলেকে) একশ’ বকরী এবং একটি বাঁদীর বিনিময়ে তার নিকট হতে ছাড়িয়ে এনেছি। পরে আমি আলিমদের জিজ্ঞেস করলাম। তাঁরা আমাকে জানালেন যে, আমার ছেলের দন্ড হল একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন। আর এই লোকের স্ত্রীর দন্ড হল রজম। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, অবশ্যই আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফায়সালা করব। বাঁদী এবং একশ’ বকরী তোমাকে ফেরত দেয়া হবে। আর তোমার ছেলের শাস্তি একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন। হে উনায়স! আগামীকাল সকালে এ লোকের স্ত্রীর নিকট যাবে। যদি সে স্বীকার করে তাহলে তাকে রজম করবে। রাবী বলেন, উনায়স (রাঃ) পরদিন সকালে সে স্ত্রীলোকের নিকট গেলেন। সে অপরাধ স্বীকার করল। তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নির্দেশে তাকে রজম করা হল। (বুখারী, মুসলিম)

লক্ষণীয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিতাবুল্লাহ অনুযায়ী ফয়সালার কথা বলেছেন। যদি রজম কুরআনী বিধান না হয়ে থাকে তাহলে তিনি কেন বললেন…
وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لَاقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بِكِتَابِ اللهِ

রজমের আয়াত কুরআনে নাযিল হয়েছিলো। পরবর্তীতে মানসুখ হয়ে যায়। এ বিষয়ে উমর রা. থেকে মুয়াত্তায়, ইবনে আব্বাস রা. থেকে ইবনে মাজায় এবং উবাই বিন কাব, উমামা বিন সাহল আজমা বিনতে আমের, কাসির বিন সলত, যাইদ বিন সাবেত, সাঈদ বিন আস রা.এর বর্ণনা মুস্তাদরাকে হাকেমে রয়েছে।

৬- কুরআন মাজিদে এসেছে…
وَ لَا یَقۡتُلُوۡنَ النَّفۡسَ الَّتِیۡ حَرَّمَ اللّٰهُ اِلَّا بِالۡحَقِّ وَ لَا یَزۡنُوۡنَ ۚ وَ مَنۡ یَّفۡعَلۡ ذٰلِکَ یَلۡقَ اَثَامًا
তারা অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। অবশ্য যে এগুলো করবে সে শাস্তি ভোগ করবে।

এখানে হত্যা ও জিনাকে একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে এবং শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমরা জানি, হত্যার মূল শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। অতএব এখান থেকেও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে জিনার শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। অর্থাৎ রজম।

রজমের আয়াত মানসুখের কারণ

রজমের আয়াত কেন মানসুখ হল তা আল্লাহই ভাল জানেন। নিশ্চয়ই এর ভিতর কল্যাণ রয়েছে। আমরা সেটা খুঁজে বের করতে মুকাল্লাফ (বাধ্য) নই।

১- অবশ্য একটি কারণ তো উপরের জায়েদ বিন সাবেত রা.এর হাদিসে গিয়েছে। যেটি হযরত আমর বিন আল আস (রা.)-ও বলেছেন (ফাতহুল বারী ১২/১৪৩) যে, বৃদ্ধ বৃদ্ধার স্থলে বিবাহিত হলেই রজম করা করার বিধান অবতীর্ণ হওয়ায় আয়াতটি মানসুখ করা হয়েছে।

২- এর একটি কারণ নিম্নোক্ত হাদিসে পাওয়া যায়।
عن زيد بن أسلم أن عمر خطب الناس فقال لا تشكوا في الرجم فإنه حق ولقد هممت أن أكتبه في المصحف فسألت أبي بن كعب فقال أليس إنني وأنا أستقرئها رسول الله صلى الله عليه وسلم فدفعت في صدري وقلت أستقرئه آية الرجم ‌وهم ‌يتسافدون ‌تسافد ‌الحمر

যাইদ বিন আসলাম রা. থেকে বর্ণিত, হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু মানুষকে বললেন, তোমরা রজমের ব্যাপারে সন্দেহে পতিত হয়ো না। কেননা তা হক। এমনকি আমি তো ইচ্ছা করেছিলাম এই বিধানটি কোরআনে লিখে দিতে। আমি উবাই বিন কাবের সাথে পরামর্শ করেছিলাম। সে বলেছে, আপনার কি এই ঘটনা মনে নেই যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এই আয়াত পাঠের বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি আমার বুকে ধুলা নিক্ষেপ করে বললেন যে, তুমি এই আয়াত তেলাওয়াত করতে চাচ্ছো, অথচ মানুষ গাধার মত পরস্পর সঙ্গমে লিপ্ত হবে। (ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, এর সনদ সহীহ, প্রাগুক্ত)

এই হাদিসের যে ব্যাখ্যা দুর্বল লেখকের অন্তরে উদিত হয়েছে। তা হলো…

ক- যিনার শাস্তি অত্যন্ত কঠিন। যেহেতু কুরআন মাজীদ দাওয়াতের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান কিতাব। অনেক কাফের ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কুরআন মাজীদ অধ্যয়ন করে। তাদের পূর্বেকার মাইন্ডসেটের কারনে এই বিধান গ্রহণ করতে অসুবিধা হতে পারে। যা তাদের ইসলাম গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

খ- মানুষ গাধার মত পরস্পর সঙ্গমে লিখতে হবে – দ্বারা বর্তমান পৃথিবীর অবস্থা আল্লাহ রাসুল সা. ভবিষ্যৎবাণী করেছেন। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জিনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। মানুষ ও পশুর মাঝে কোন পার্থক্য থাকছে না। সুতরাং সেই কালচারে বড় হওয়া একটা মানুষ যখন ইসলাম গ্রহণ করার নিমিত্তে কোরআন অধ্যায়ন করবে এবং যিনার শাস্তি হিসেবে রজম পাবে। তখন তার কাছে এটাকে লঘু পাপে গুরুদণ্ড মনে হতে পারে। বাস্তবে তো পাপ লঘু নয়, কিন্তু তার দেশে এর ব্যাপকতার কারণে লঘু মনে হতে পারে। এতে সে বিগড়ে যেতে। (অবশ্য পরবর্তীতে ইসলাম অন্তরে বসে যাওয়ার পর এই সমস্যা আর থাকবে না।)

৩- শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী তার হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাতে (২/২৪৫) লিখেছেন যে, অধিকাংশ আসমানী ধর্মে রজম ছিল। ফলে জালদ (বেত্রাঘাত) নতুন ছিল। এজন্যই এটাকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। রজমের বিষয়ে জানা থাকায় শুধু ইশারা দেয়া হয়েছে।

৪- এই দুর্বল লেখক বলছে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেননি। বরং হাদীসে উল্লেখ করেছেন। এর একটা কারণ এও হতে পারে যে, হয়তো তিনি পরীক্ষা করতে চেয়েছেন যে, কারা রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামের হাদিস মানে, আর কারা মানে না।

রাসূল সা. কর্তৃক ইহুদিদের রজম

ঘটনাটি উপরে একবার গিয়েছে। কিন্তু এটি ভিন্ন বর্ণনা…

এক ইহুদি দম্পতি অর্থাৎ একজন পুরুষ ও একজন নারীকে মদীনায় মহানবী সা.এর খেদমতে ব্যভিচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। মহানবী (সা.) বললেন, আমি তোমাদের কিতাব অনুসারে এ মামলার ফয়সালা করব। তিনি ইহুদিদের আলেমদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মতে এ অপরাধের শাস্তি কী? তারা বলল, আমাদের ধর্মে ব্যভিচারের শাস্তি হলো তাদের উভয়কেই কালি মেখে বেত্রাঘাত করা। মহানবী (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের ধর্মে কি এর শাস্তি পাথর ছুড়ে মারা নয়? ইহুদী পন্ডিতগণ উত্তর দিলো, না।

এতে মজলিসে উপস্থিত হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তারা মিথ্যা বলছে, তাওরাতে ব্যভিচারের শাস্তি পাথর ছুড়ে মারা। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ছিলেন ইহুদিদের সুবিখ্যাত আলেম। তিনি ইহুদি পণ্ডিতদের তাওরাত আনতে বললেন, তাওরাত আনা হলো। এবং একজন ইহুদি পণ্ডিত এর প্রাসঙ্গিক অংশ পড়তে শুরু করল। কিন্তু সে রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে পড়তে থাকল। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম উঠে গিয়ে তার হাত সরালেন এবং ব্যভিচারের শাস্তি রজম সেই আয়াতটি পাঠ করলেন। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই ইহুদী দম্পতিকে রজমের হুকুম দেন।

বুখারী শরীফের কিতাবুল হুদুদ সহ ৫-৬ জায়গায় এই ঘটনাটি এসেছে।

রাসূল সা. কর্তৃক মুসলমানদের রজম

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জমানায় মুসলিমদের উপর রজমের বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে।

যার একটি ঘটনা উপরে বর্ণনা করেছি।

২- আরেকটি…
عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ وَائِلٍ الْكِنْدِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ امْرَأَةً، خَرَجَتْ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم تُرِيدُ الصَّلاَةَ فَتَلَقَّاهَا رَجُلٌ فَتَجَلَّلَهَا فَقَضَى حَاجَتَهُ مِنْهَا فَصَاحَتْ فَانْطَلَقَ وَمَرَّ عَلَيْهَا رَجُلٌ فَقَالَتْ إِنَّ ذَاكَ الرَّجُلَ فَعَلَ بِي كَذَا وَكَذَا ‏.‏ وَمَرَّتْ بِعِصَابَةٍ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ فَقَالَتْ إِنَّ ذَاكَ الرَّجُلَ فَعَلَ بِي كَذَا وَكَذَا ‏.‏ فَانْطَلَقُوا فَأَخَذُوا الرَّجُلَ الَّذِي ظَنَّتْ أَنَّهُ وَقَعَ عَلَيْهَا وَأَتَوْهَا فَقَالَتْ نَعَمْ هُوَ هَذَا ‏.‏ فَأَتَوْا بِهِ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَلَمَّا أَمَرَ بِهِ لِيُرْجَمَ قَامَ صَاحِبُهَا الَّذِي وَقَعَ عَلَيْهَا فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنَا صَاحِبُهَا ‏.‏ فَقَالَ لَهَا ‏”‏ اذْهَبِي فَقَدْ غَفَرَ اللَّهُ لَكِ ‏”‏ ‏.‏ وَقَالَ لِلرَّجُلِ قَوْلاً حَسَنًا وَقَالَ لِلرَّجُلِ الَّذِي وَقَعَ عَلَيْهَا ‏”‏ ارْجُمُوهُ ‏”‏ ‏.‏ وَقَالَ ‏”‏ لَقَدْ تَابَ تَوْبَةً لَوْ تَابَهَا أَهْلُ الْمَدِينَةِ لَقُبِلَ مِنْهُمْ ‏”‏ ‏

আলকামা ইবনু ওয়াইল (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় একজন মহিলা নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো। রাস্তায় একজন লোক তার সামনে পড়ে এবং সে তাকে তার পোশাকে ঢেকে নিয়ে (জাপটে ধরে) নিজের প্রয়োজন মিটায় (ধর্ষণ করে)। মহিলাটি চিৎকার করলে লোকটি পালিয়ে গেল। আর একজন লোক তার সম্মুখ দিয়ে যাচ্ছিল। মহিলাটি বলল ঐ লোকটি আমার সাথে এই এই করেছে। ইতোমধ্যে মুহাজির সাহাবীদের একটি দলও সে স্থান দিয়ে যাচ্ছিল। মহিলাটি বলল, ঐ লোকটি আমার সাথে এই এই করেছে। যে লোকটি তাকে ধর্ষণ করেছে বলে সে ধারণা করল, তারা (দৌড়ে) গিয়ে তাকে ধরে ফেলেন। তাকে নিয়ে তারা মহিলাটির সামনে ফিরে আসলে সে বলল, হ্যাঁ, এই সেই লোক।

তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তাকে নিয়ে আসেন। তিনি তাকে রজমের (পাথর মেরে হত্যা) হুকুম দিলেন, সে সময়ে আসল ধর্ষণকারী উপস্থিত হয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তার ধর্ষণকারী (ঐ লোকটি নয়)। তিনি মহিলাটিকে বললেন, যাও, তোমাকে আল্লাহ তা’আলা মাফ করে দিয়েছেন। তিনি (সন্দেহজনকভাবে) ধৃত লোকটির সম্বন্ধে ভাল কথা বললেন। মহিলাটির আসল ধর্ষণকারীর সম্পর্কে তিনি হুকুম করলেন, একে রজম কর। (তিরমিজি ১৪৪৫৪, হাসান ইনদাল আলবানী)

৩- জুহাইনা উপগোত্রের নারীর ঘটনা…
عَنْ عِمْرَانَ، بْنِ حُصَيْنٍ أَنَّ امْرَأَةً، مِنْ جُهَيْنَةَ أَتَتْ نَبِيَّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهِيَ حُبْلَى مِنَ الزِّنَى فَقَالَتْ يَا نَبِيَّ اللَّهِ أَصَبْتُ حَدًّا فَأَقِمْهُ عَلَىَّ فَدَعَا نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَلِيَّهَا فَقَالَ ‏”‏ أَحْسِنْ إِلَيْهَا فَإِذَا وَضَعَتْ فَائْتِنِي بِهَا ‏”‏ ‏.‏ فَفَعَلَ فَأَمَرَ بِهَا نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَشُكَّتْ عَلَيْهَا ثِيَابُهَا ثُمَّ أَمَرَ بِهَا فَرُجِمَتْ…

ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, জুহাইনাহ গোত্রের এক মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আগমন করল। সে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমি হদ (শারীআত কর্তৃক নির্ধারিত ব্যভিচারের শাস্তি) এর উপযোগী হয়েছি। অতএব আমার উপর তা কার্যকর করুন। তখন আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অভিভাবককে ডাকালেন এবং বললেন, তাকে ভালভাবে দেখাশোনা করো। তারপর সে যখন সন্তান প্রসব করবে তখন তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। সে তাই করলো। এরপর আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি (শাস্তি প্রদানের) নির্দেশ দিলেন। তখন মহিলার কাপড় শক্ত করে বাধা হলো। এরপর তিনি শাস্তি কার্যকর করার আদেশ দিলেন। তাকে পাথর মারা হলো। (মুসলিম ৪৩২৫)

রাসূল সা.এর মৌখিক নির্দেশনা

মৌখিক নির্দেশনা সম্বলিত হাদিস তো অনেক। আমরা এখানে একটি উল্লেখ করছি…

عَنْ عَائِشَةَ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ، يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ: رَجُلٌ زَنَى بَعْدَ إِحْصَانٍ، فَإِنَّهُ يُرْجَمُ، وَرَجُلٌ خَرَجَ مُحَارِبًا لِلَّهِ وَرَسُولِهِ، فَإِنَّهُ يُقْتَلُ، أَوْ يُصْلَبُ، أَوْ يُنْفَى مِنَ الْأَرْضِ، أَوْ يَقْتُلُ نَفْسًا، فَيُقْتَلُ بِهَا

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কোনো মুসলিম ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয়- আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল, তাকে হত্যা করা বৈধ নয় তিনটি অপরাধের যে কোনো একটিতে লিপ্ত না হলেঃ (১) বিবাহিত লোক ব্যভিচার করলে তাকে পাথর মেরে হত্যা করবে (২) আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে অথবা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হবে অথবা তাকে দেশ থেকে নির্বাসন দেয়া হবে (৩) আর কাউকে হত্যা করলে তার বিনিময়ে কিসাসস্বরূপ তাকেও হত্যা করা যাবে। (আবু দাউদ ৪৩৫৩, মুসলিম, সহীহ)

খোলাফায়ে রাশেদা কর্তৃক রজম

১-
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ، قَالَ رَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَرَجَمَ أَبُو بَكْرٍ وَرَجَمْتُ وَلَوْلاَ أَنِّي أَكْرَهُ أَنْ أَزِيدَ فِي كِتَابِ اللَّهِ لَكَتَبْتُهُ فِي الْمُصْحَفِ فَإِنِّي قَدْ خَشِيتُ أَنْ تَجِيءَ أَقْوَامٌ فَلاَ يَجِدُونَهُ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَيَكْفُرُونَ بِهِ

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজমের আইন বাস্তবায়ন করেছেন, আবূ বকর (রাঃ)-ও রজমের আইন বাস্তবায়ন করেছেন এবং রজমের আইন আমিও বাস্তবায়ন করছি। আল্লাহ্ তা’আলার কিতাবের মধ্যে যদি কোন কিছু যোগ করাকে আমি নিষিদ্ধ মনে না করতাম তবে অবশ্যই এই বিধান মাসহাফে (কুরআনে) লিখে দিতাম। কেননা আমার ভয় হয় যে, পরবর্তী সময়ে মানব জাতির এমন দল আসবে যারা এই হুকুম আল্লাহ্ তা’আলার কিতাবে না দেখতে পেয়ে তা অস্বীকার করবে। (তিরমিজি ১৪৩১, সহীহ)

২-
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ بْنِ سَهْلٍ، قَالَ: كُنَّا مَعَ عُثْمَانَ وَهُوَ مَحْصُورٌ فِي الدَّارِ، وَكَانَ فِي الدَّارِ مَدْخَلٌ، مَنْ دَخَلَهُ سَمِعَ كَلَامَ مَنْ عَلَى الْبَلَاطِ، فَدَخَلَهُ عُثْمَانُ، فَخَرَجَ إِلَيْنَا وَهُوَ مُتَغَيِّرٌ لَوْنُهُ، فَقَالَ: إِنَّهُمْ لَيَتَوَاعَدُونَنِي بِالْقَتْلِ آنِفًا، قَالَ: قُلْنَا: يَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، قَالَ: وَلِمَ يَقْتُلُونَنِي؟ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ: كُفْرٌ بَعْدَ إِسْلَامٍ، أَوْ زِنًا بَعْدَ إِحْصَانٍ، أَوْ قَتْلُ نَفْسٍ بِغَيْرِ نَفْسٍ، فَوَاللَّهِ مَا زَنَيْتُ فِي جَاهِلِيَّةٍ، وَلَا فِي إِسْلَامٍ قَطُّ، وَلَا أَحْبَبْتُ أَنَّ لِي بِدِينِي بَدَلًا مُنْذُ هَدَانِي اللَّهُ، وَلَا قَتَلْتُ نَفْسًا، فَبِمَ يَقْتُلُونَنِي؟

আবূ উমামা ইবনু সাহল (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা উসমান (রাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম, যখন তিনি (বিদ্রোহীদের দ্বারা) একটি ঘরে আটক ছিলেন। ঐ ঘরের একটি প্রবেশদ্বার ছিলো। কেউ ঐ প্রবেশদ্বারে প্রবেশ করলে আল-বালাত নামক স্থানে লোকের কথাবার্তা শুনতে পেতো। উসমান (রাঃ) তাতে প্রবেশ করলেন এবং বিবর্ণ অবস্থায় আমাদের নিকট এসে বললেন, তারা এই মাত্র আমাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বললাম, হে আমীরুল মু’মিনীন! আল্লাহই তাদের বিরুদ্ধে আপনার জন্য যথেষ্ট। তিনি প্রশ্ন করলেন, তারা আমাকে হত্যা করবে কেন?

আমি তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তিনটি অপরাধের কোনো একটি ব্যতীত মুসলিম ব্যক্তির রক্তপাত করা হালাল নয়ঃ (১) ইসলাম গ্রহণের পর পুনরায় কুফরীতে ফিরে যাওয়া, (২) বিবাহিত ব্যক্তির যেনায় লিপ্ত হওয়া এবং (৩) হত্যার অপরাধী না হওয়া সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করলে।

আল্লাহর কসম! আমি জাহিলী যুগে এবং ইসলামী যুগেও কখনো যেনা করিনি। আল্লাহ আমাকে হিদায়াত দান করার পর থেকে আমি মোটেই অন্য ধর্ম গ্রহণ পছন্দ করি না এবং আমি কোনো মানুষকে হত্যা করিনি। অতএব তারা কেন আমাকে হত্যা করবে? (আবু দাউদ ৪৫০২ সহীহ)

ইউসুফ লুধিয়ানভী র. লিখেছেন যে, উসমান রা. রজম প্রয়োগ করেছেন, যার বর্ণনা মুয়াত্মা মালেক এবং মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকে রয়েছে।

৩-
عَنْ عَلِيٍّ حِينَ رَجَمَ الْمَرْأَةَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَقَالَ قَدْ رَجَمْتُهَا بِسُنَّةِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم.

শা’বী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি ’আলী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, ’আলী (রাঃ) জুম’আর দিন এক মহিলাকে পাথর মেরে হত্যা করেন। তারপর বলেন, আমি তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত অনুযায়ী পাথর মেরে হত্যা করলাম। (বুখারী ৬৮১২)

রজম সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবাগণের নাম

রজম সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবাগণের নাম আমরা একাধিক ওলামাগণ থেকে পেয়েছি। যে যতজনের নাম খুঁজে বের করতে পেরেছেন সে ততজনের নাম উল্লেখ করেছেন। সংখ্যার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ ওলামাগণ পূর্ববর্তীদের অনুসরণ করেছেন। কিন্তু এই দুর্বল লেখক জানতে পারেনি যে, প্রথমে কে এই নাম গুলো জমা করেছেন? তাই কারো নাম উল্লেখ উল্লেখ করা হলো না। আল্লাহ তায়ালা ওই সমস্ত ওলামাগণকে জাযায়ে খায়ের দান করুন।

যে সমস্ত সাহাবাগণের হাদিস বুখারী শরীফে রয়েছে…
১- উমর বিন খাত্তাব ২- আলী মুরতাজা ৩- আব্দুল্লাহ বিন আওফা ৪- জাবির বিন আব্দুল্লাহ ৫- আবু হুরাইরা ৬- আইশা সিদ্দীকা ৭- আব্দুল্লাহ বিন উমর ৮- আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস ৯- যাইদ বিন খালেদ

যে সমস্ত সাহাবাগণের হাদিস মুসনাদে আহমাদে রয়েছে…
১০- উবাদা বিন সামিত ১১- সালামা বিন মুহাববাক ১২- আবু বারযাহ ১৩- নুয়াইম বিন হাযযাল আসলামী ১৪- জাবির বিন সামুরাহ ১৫- লাজলাজ বিন হাকিম আমেরী ১৬- আবু বকর সিদ্দিক ১৭- বুরাইদাহ ১৮- আবু জর গিফারী ১৯- নাসর বিন দাহর ২০- ইমরান বিন হুসাইন ২১- আবু বাকরা আস সাকাফী ২২- আবু সাঈদ খুদরী ২৩- নুমান বিন বশীর ২৪- বারা বিন আযিব

যে সমস্ত সাহাবাগণের হাদিস সুনানে কুবরা লিলবাইহাকীতে রয়েছে…
২৫- উবাই বিন কাব ২৬- যাইদ বিন সাবিত ২৭- আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ

যে সমস্ত সাহাবাগণের হাদিস মাজমাউয যাওয়াইদে রয়েছে…
২৮-কবিসা বিন হুরাইস ২৯- আনাস বিন মালিক ৩০- আজমা বিনতে আমের ৩১- সাহল বিন সাদ ৩২- আব্দুল্লাহ বিন হারিস ৩৩- আম্মার বিন ইয়াসির

যে সমস্ত সাহাবাগণের হাদিস আবু দাউদে রয়েছে…
৩৪- ওসমান গনী ৩৫- আবু উমামা বাহেলী

এছাড়াও যে সমস্ত নাম পাওয়া যায়…
৩৬- আব্দুর রহমান বিন আউফ ৩৭- আব্দুল্লাহ বিন আমর ৩৮- মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান ৩৯- খারিজা বিন আমর ৪০- খুযাইমা বিন মামার ৪১- শারিদ বিন সুওয়াইদ ৪২- আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর ৪৩- শিবল বিন খুলাইদ ৪৪- আবু মুসা আশয়ারি ৪৫- সাহল বিন হানিফ ৪৬- আমর বিন খারিজা ৪৭- আবু মাসউদ আনসারী ৪৮- ওয়াসিলা বিন আসকা ৪৯- আবু মালিক আসলামী ৫০- মুয়াজ বিন জাবাল ৫১- আব্দুল্লাহ বিন সালাম ৫২- আবু ওয়াকিদ আল লাইসি ৫৩- ফারিয়া আনসারিয়া ৫৪- আসআদ বিন সাহল ৫৫- খারিজা আল জাহমী ৫৬- সাঈদ বিন আস ৫৭-ওয়ায়েল বিন হুজর। রিজওয়ানুল্লাহি আলাইহিম আজমাঈন।

কেউ কেউ এই সংখ্যা ৬৭ পর্যন্ত বলেছেন। কিন্তু বাকিদের নাম এই দুর্বল লেখক খুঁজে পায়নি।

এছাড়া ১৪ জন সিকাহ তাবেঈ মুরসালান বর্ণনা করেছেন বলে বর্ণিত হয়েছে।

আর প্রত্যেক যুগে শত শত ইমামগণ এই মত পোষণ করেছেন।

রজম সংক্রান্ত হাদিসের পর্যায়

ইবনুল হুমাম র. ফাতহুল কাদীরে ও যাইলাঈও র. তাবঈনুল হাকায়িকে (৩/১৬৭) রজম সংক্রান্ত হাদিসকে তাওয়াতুরে মা’নার পর্যায়ে বলেছেন।

ইজমায়ে উম্মত
রুহুল মাআনীতে (৯/২৭৭) আল্লামা আলুসি বলেন…

وقد أجمع الصحابة رضي الله تعالى عنهم ومن تقدم من السلف وعلماء الأمة وأئمة المسلمين على أن ‌المحصن ‌يرجم بالحجارة حتى يموت، وإنكار الخوارج ذلك باطل لأنهم إن أنكروا حجية إجماع الصحابة رضي الله تعالى عنهم فجهل مركب، وإن أنكروا وقوعه من رسول الله صلى الله عليه وسلم لإنكارهم حجية خبر الواحد فهو بعد بطلانه بالدليل ليس ما نحن فيه لأن ثبوت الرجم منه عليه الصلاة والسلام متواتر المعنى كشجاعة عليّ كرم الله تعالى وجهه وجود حاتم

সাহাবাগণ, সালাফ, উম্মতের ইমামগণ ও উলামাগণের এই বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, মুহসান- মুহসানা জিনা করলে রজম করা হবে। এ বিষয়ে খারেজীদের অস্বীকৃতির গ্রহণযোগ্যতা নেই। কেননা যদি তারা সাহাবাগণের ইজমাকে অস্বীকার করে সেটা মূর্খতা। যদি তারা খবর ওয়াহেদ হওয়ার কারণে অস্বীকার করে সেটাও বাতিল। কেননা বিষয়টা তাওয়াতুরে মানার পর্যায়ে। যেমন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর বীরত্ব এবং হাতেম তাই অস্তিত্ব।

ইবনে তাইমিয়া র.ও ইজমার কথা বলেছেন
وقد ثبت الرجم بالسنه المتواتره وإجماع الصحابه
মাজমুউল ফাতাওয়া ২০/৩৯৯

এছাড়া ইজমার কথা বলেছেন আলী বিন আবু বকর আল মার্গানানি (হিদায়া ২/৩৪১) ইমাম নববী (শারহুন নববী আলা মুসলিম ১১/১৮৯), ইবনে কুদামা (আল মুগনী ৮/৩৯), বাইহাকী (কুবরা লিল বাইহাকী ৮/২১১), ইবনে হাজম (মারাতিবুল ইজমা ২৪৫) ইবনুল মুনজির (আল ইজমা ৬৯), ইবনে আবদিল বার (আল ইস্তিজকার ৮/৫৩), কাজী ইয়াজ (আশ শিফা ২/২৮৬) যাইলাঈ (তাবঈনুল হাকায়িক ৩/১৬৭) আবু বকর জাসসাস (আহকামুল কুরআন ৩/৩৪৩), ইবনে বাত্তাল (শরহে বুখারী ৮/৪৩১), ইবনুল জাওযি (কাশফুল মুশকিল ১/৬৪), ইবনে রজব হাম্বলী (জামিউল উলূম ১/৩১২), ইবনুল মুলাক্কিন (আত তাওজীহ ৩১/১৫৩), ইবনে হাজার আসকালানী (ফাতহুল বারী), ইবনে শিহাব যুহরী, ইবনুল হুমাম ও ইবনে রুশদ কুরতুবী রহিমাহুমুল্লাহ সহ অনেকে।

বিগত চৌদ্দশত বছরে যেখানেই শরীয়তের বিধান জারি হয়েছে, ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হয়েছে, সেখানেই বিবাহিত পুরুষ ও নারীর জন্য ব্যভিচারের শাস্তি রজম সাব্যস্ত হয়েছে। অতএব এই দৃষ্টিকোণ থেকে রজম আমলে মুতাওয়াতিরও।

ইসলামের আইনবিদদের মধ্যে কোন প্রামাণিক ব্যক্তি এই ইজমার বিরোধিতা করেননি।

উল্লেখ্য এই বিষয়ে শিয়ারাও একমত। (ফাতহুল কাদীর)

রজম অস্বীকার কারা করে

প্রথম হিজরী শতাব্দীর শেষ দিকে এসে সর্বপ্রথম খারেজিরা রজম অস্বীকার করে…

أنَّ رُسُلَ ‌الخَوارِج جاءوا ‌عمرَ ‌بنَ ‌عبدِ ‌العزيزِ، رحمه الله، فكان من جُملةِ ما عابُوا عليه الرَّجْمُ، وقَالوا: ليس، في كتابِ اللَّه إلَّا الجَلْدُ. فقال لهم عمرُ: وأنتمُ لا تأْخُذونَ إلَّا بما في كتابِ اللَّه؟ قالوا: نعم. قال: فأخبِرُونِى عن عددِ الصَّلواتِ المفْروضاتِ، وعَدَدِ أَرْكانِها وركعاتِها ومَواقِيتِها، أينَ تَجِدُونَه في كتابِ اللَّه تعالى؟ وأخْبِرُونى عمَّا تجبُ الزَّكاةُ فيه، ومقادِيرُها، ونُصُبُها؟ فقالوا: أنظِرْنا. فرَجَعُوا يومَهم ذلك، فلم يجدُوا شيئًا ممَّا سألَهم عنه في القرآنِ. فقالوا: لم نَجِدْهُ في القرآنِ. قال: فكيف ذَهبْتُم إليه؟ قالوا: لأنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم فَعلَه، وفَعلَه المسلمون بعدَه. فقال لهم: فكذلك الرَّجْمُ، وقَضاءُ الصَّومِ، فإنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم رَجَمَ ورَجَمَ خُلَفاؤُه بعدَه والمسلمونَ، وأمرَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم بقضاءِ الصَّومِ دونَ الصَّلاةِ

খারেজিদের একটি প্রতিনিধিদল উমর বিন আব্দুল আজিজ র.এর কাছে যায়। এবং বলে যিনার শাস্তি কুরআনে বেত্রাঘাত ছাড়া অন্য কিছু নেই।
উমর র. – তোমরা কি কোরআন ব্যতীত হুকুম আহরণ করো না?
খাওয়ারেজ – না
উমর রা. – নামাযের আরকান, রাকাত সংখ্যা, ওয়াক্ত, যাকাতের নেসাব, পরিমাণ কুরআন থেকে বলো।
খাওয়ারেজ – আমাদের সময় দিন।

তারা একদিনের সময় চেয়ে চলে যায়। কিন্তু তারা এর কোন কূল কিনারা করতে পারল না। পরদিন এসে বলে, আমরা এগুলো কুরআনে পাইনি।

উমর র. – তাহলে এগুলো কিভাবে তোমরা পেয়েছ?
খাওয়ারেজ – নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল ও তৎপরবর্তী মুসলমানদের আমলের মাধ্যমে
উমর র. – রজমের বিষয়টাও এমনই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজম করেছেন। তারপর খোলাফায়ে রাশেদা এবং মুসলমানগণ এটি ধারাবাহিকভাবে করে যাচ্ছেন (আল মুগনী ১২/৩১০, ফাতহুল কাদীর ৫/২২৫)

পরবর্তীতে মুতাযিলারা রজম অস্বীকার করে।

বর্তমানে মুস্তাশরিকীন (প্রাচ্যবিদ) ও মুনকিরীনে হাদিস এবং কিছু সেকুলার এটি অস্বীকার করছে।

উল্লেখ্য, খাওয়ারেজও এক ধরনের মুনকিরীনে হাদিস ছিল।

মুনকিরীনে রজমের দলিল ও আমাদের জবাব

দলিল-১: কুরআনে সূরা নূরে আমভাবে যিনাকারীর শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত বলা হয়েছে। কোরআনের বিধান قطعي আর খবরে ওয়াহেদ ظني। আর কতঈকে জন্নী দ্বারা খাস করা যায় না।

উত্তর: ক – যদি তাদের দাবি সঠিক ধরে নেই যে, রজমের হাদিস খবরে ওয়াহেদ। তাহলে বলবো, সূরা নূরের দুই নম্বর আয়াতে যে “যিনাকারী” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তার দ্বারা যে সকল যিনাকারী উদ্দেশ্য নয় তা আহলে কোরআনকেও স্বীকার করতে হবে। কেননা সূরা নিসার ২৫ নম্বর আয়াতে দাস-দাসী যিনা করলে ৫০ টি বেত্রাঘাত দেওয়া হবে বলে নির্দেশনা এসেছে। অতএব এ বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে গেল যে, সূরা নূরের দুই নম্বর আয়াতে “যিনাকারী” শব্দ দ্বারা সকল যিনাকারী উদ্দেশ্য নয়।

বরং এখানে কোরআনকে কোরআন দ্বারা খাস করা হয়েছে। সূরা নূরের দুই নম্বর আয়াতকে খাস করা হয়েছে সূরা নিসার ২৫ নম্বর আয়াত দ্বারা।

যাকে বলা হয় عام مخصوص عنه البعض

অতএব যিনাকারীর ১০০ বেত্রাঘাত এর বিষয়টি
قطعي الثبوت ظني الدلاله
হয়ে গেল।

সেক্ষেত্রে খবরে ওয়াহেদ জন্নীউস সুবুত ধরলেও কতঈউদ দালালা হওয়ার কারণে কুরআনের সমান হয়ে যাবে।
অর্থাৎ কুরআন হবে قطعي الثبوت ظني الدلاله
আর খবরে ওয়াহেদ হবে ظني الثبوت قطعي الدلاله

তাই তাতবিক (সামঞ্জস্য) দিবে। আর তাখসিস (খাস করা) দ্বারা তাতবিক সম্ভব।

এর একটি উদাহরণ চোরের শাস্তির আয়াত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন…
والسَّارِقُ وَ السَّارِقَۃُ فَاقۡطَعُوۡۤا اَیۡدِیَهُمَا جَزَآءًۢ بِمَا کَسَبَا نَکَالًا مِّنَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ
আর পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও; তাদের কৃতকর্মের ফল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (মায়েদা ৩৮)

এখানে তো আল্লাহ ঠিক যিনাকারের ১০০ বেত্রাঘাত সংক্রান্ত আয়াতের মতো আয়াত নাজিল করেছেন। অর্থাৎ নারী পুরুষকে আলাদা শব্দে বর্ণনা করেছেন। তবুও কি আহলে কোরআন সকল চোরের হাত কাটাকে বৈধ মনে করে? যেমন সন্তান যদি বাবার পকেট থেকে চুরি করে…।

এক হাদীসে এসেছে, গনিমতের মাল থেকে একবার এক গোলাম চুরি করে, কিন্তু আল্লাহর রাসুল তার হাত কাটেননি।

এছাড়া নাবালেগ ও পাগলের হাত কাটা যাবে কিনা? কেউ যদি ক্ষুধার কারনে কারো রান্নাঘরে ঢুকে এক প্লেট খাবার খেয়ে যায় তার হাত কাটা যাবে কিনা? (এটা নিছক উদাহরণ নয়, ব্রিটিশ আমলে যখন বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল তখন এ ধরনের বহু চুরির ঘটনা ঘটেছে। সম্ভ্রান্ত মানুষেরা পর্যন্ত অন্যের রান্নাঘরে ঢুকে খাবার খেয়ে যেত।)

খ – অনেক আলিমের মতে খবরে ওয়াহেদ যদি করীনা (আলামাত) দ্বারা শক্তিশালী হয় তাহলে কতঈ হয়ে যায়।

গ- খোলাফায়ে রাশেদা, সাহাবা ও ইমামগণ, এমনকি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু রজমের হুকুম দিয়েছেন। এর দ্বারাই প্রমাণিত হয়ে যায় যে, সূরা নূরের দুই নম্বর আয়াত আম নয়।

ঘ- রজম সংক্রান্ত হাদিসের রেওয়ায়েত যে আলেমের কাছে যতগুলো পৌঁছেছে, সে সেই অনুযায়ী রায় দিয়েছে। সে হিসেবে কেউ কেউ খবরে ওয়াহেদ বলেছে। কেউ মুস্তাফিজ বলেছে, অনেকে মাশহুর বলেছে। (যেমন ইবনে কুদামা মাশহুর বলেছেন) । বিশেষত হাদিসে আবু হুরায়রায় শ্রমিকের যিনার ঘটনা।

ইজমা তো আছেই। ইমাম শাওকানী বলেন, সকল আহলে ইলমের মতে ইজমা দ্বারা তাখসিস হয়। (ইরশাদুল ফুহুল)

মাশহুর হাদিস দ্বারাও কুরআনের উপর যিয়াদাত (বৃদ্ধি) বৈধ।

অনেকে মুতাওয়াতির বিল মা’না বলেছেন। আর তাওয়াতুরে মা’না দ্বারাও ফুকাহাগণের মতে কিতাবুল্লাহর উপর যিয়াদাত জায়েয। ইবনুল হুমাম র. বলেন, তাওয়াতুরে মানাকে খারেজিরাও দলিল হিসেবে মানতো। (ফাতহুল কাদীর ৫/২২৫)

ঙ- আয়াতটি মুজমাল, তাই তাফসীরের প্রয়োজন ছিল। খতীবে বাগদাদি বলেন, কুরআনের মুজমালকে তাফসির করে সুন্নাহ (আল ফাকিহ ওয়াল মুতাফাক্কি ১/২৩৫)

দলিল-২: রজমের বিধান হয়তো আগে ছিল। কিন্তু সূরা নুরের বেত্রাঘাতের আয়াত দ্বারা রজমের বিধান রহিত হয়ে গিয়েছে।

উত্তর: ক- সূরা নূর নাযিল হয়েছে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার উপর অপবাদের ঘটনার সময়। যার সালটা ছিল চার, পাঁচ, অথবা ছয় হিজরি। (ফাতহুল বারী ১২/১২০)

এবং রজমের প্রায় সব ঘটনা ষষ্ঠ হিজরির পরের। কারণ যে সমস্ত সাহাবা রজমের সময় উপস্থিত ছিলেন তারা ষষ্ঠ হিজরির পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যেমন আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত বুখারী শরীফের এক হাদীসে আছে, তিনি একটি রজমের ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন
كنا عند النبي صلى الله عليه وسلم
অথচ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু খাইবারের যুদ্ধের পর সপ্তম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন (সূত্র: উমদাতুল কারী ১/৩৩১)

খ- ইবনে হাজার আসকালানী র. লিখেছেন, ইহুদিদের রজমের ঘটনার সময় হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু উপস্থিত ছিলেন। আর তিনি মদিনায় হিজরত করেছেন নবম হিজরীতে।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস ইহুদীদের রজমের ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন…
فكان مما صنع الله لرسوله صلى الله عليه واله وسلم في تحقيق الزنا منهما

এর দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে, রজমের সমস্ত ঘটনা মক্কা বিজয়ের পরে সংঘটিত হয়েছে।

গ- রজমের একটি ঘটনা হযরত ওয়ায়েল বিন হুজর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, আর তিনিও নবম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

ঘ- জুহাইনা উপগোত্রের নারীকে রজম করার সময় এক বর্ণনা অনুযায়ী খালেদ বিন ওয়ালিদ রা. উপস্থিত ছিলেন। যিনি ষষ্ঠ হিজরির পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কেননা হুদাইবিয়ার ঘটনার সময় তিনি কাফেরদের দলে ছিলেন।

ঙ- একইভাবে বাজজার এবং তাবরানী র.এর বর্ণনা অনুযায়ী আব্দুল্লাহ বিন হারেস ইহুদিদের রজমের সময় শরিক ছিল। তিনি বলেন…
فكنت في من رجمهما
আব্দুল্লাহ বিন হারেস তার পিতার সাথে মক্কা বিজয়ের পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। (ফাতহুল বারী)

চ- ইমাম শাফেয়ী র. বলেন
حيث ‌وقع ‌نسخ ‌القرآن بسنة فمعها قرآن عاضد لها، وحيث وقع نسخ السنة بالقرآن فمعه سنة عاضدة له، ليتبين توافق القرآن والسنة

সুন্নাহ দ্বারা কোরআনকে রহিত করা হলে কুরআনে এমন কোন ইঙ্গিত থাকে যা সেই রহিতকরণকে সমর্থন দেয়। একইভাবে যখন সুন্নাহকে কোরআন দ্বারা রহিত করা হয়। তখন সুন্নাহের ভেতর এমন কোন ইশারা থাকে যা রহিতকরণকে সমর্থন করে। (আল ইতকান ৩/৬৮)

অতএব যদি কোরআন দ্বারা সুন্নাহ মানসুখ হয়ে থাকে তাহলে অন্যান্য সুন্নাহের ভেতর তার ইশারা কোথায়?

দলিল-৪
فَإِذَاۤ أُحۡصِنَّ فَإِنۡ أَتَیۡنَ بِفَـٰحِشَةࣲ فَعَلَیۡهِنَّ نِصۡفُ مَا عَلَى ٱلۡمُحۡصَنَـٰتِ مِنَ ٱلۡعَذَابِۚ ذَ ٰ⁠لِكَ لِمَنۡ خَشِیَ ٱلۡعَنَتَ مِنكُمۡۚ وَأَن تَصۡبِرُوا۟ خَیۡرࣱ لَّكُمۡۗ وَٱللَّهُ غَفُورࣱ رَّحِیمࣱ﴾ [النساء ٢٥]

এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, গোলাম-বাদী যদি বিবাহিত হয় তাহলে তাকে স্বাধীন মুহসানের অর্ধেক সাজা দেওয়া হবে। মৃত্যুদণ্ডের তো অর্ধেক হয় না। অর্ধেক হয় বেত্রাঘাতের। সুতরাং স্বাধীন মুহসানের সাজা বেত্রাঘাত। চাই বিবাহিত হোক অথবা অবিবাহিত।

উত্তর: এখানে মুহসান দ্বারা উদ্দেশ্য অবিবাহিত স্বাধীন। বিবাহিতরা এখানে উদ্দেশ্য নয়। যা আমাদের উপরে বর্ণিত দলিলসমূহ দ্বারা বুঝা যায়।

কেননা উক্ত আয়াতের এমন ব্যাখ্যা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম এর উপর আমল করতেন। মুফাসসিরগণ এই ব্যাখ্যা দিতেন। যেহেতু এগুলো কোনটাই হয়নি, এর দ্বারাই বোঝা যায় যে এই আয়াতে তাদের ব্যাখ্যা সঠিক নয়।

তাদের সম্পূরক প্রশ্ন: মুহসান শব্দের অর্থই তো বিবাহিত।

উত্তর: মুহসান অর্থ শুধুমাত্র বিবাহিত না। মুহসান অর্থ পবিত্র এবং স্বাধীনও। দাস-দাসীর বিপরীতে এই শব্দ আসলে স্বাধীন উদ্দেশ্য হয়। এখানে প্রথমটাতে বিবাহিতা দাসী উদ্দেশ্য, দ্বিতীয়টাতে অবিবাহিতা স্বাধীন উদ্দেশ্য।

তাদের সম্পূরক প্রশ্ন: অবিবাহিতের জন্য আলাদা শব্দ ব্যবহার করতে পারতো।

উত্তর: উলামাদের মতে, উভয় ক্ষেত্রে ইহসোন শব্দ ব্যবহার করে বোঝানো হয়েছে যে, দাসীগণের ইহসোন স্বাধীনা নারীর ইহসোনের সমান নয়। দাসীদের ইহসোন অসম্পূর্ণ। এমনকি বিবাহের পরও। কেননা তারা সুশিক্ষার সুযোগ পায় না, আত্মীয়-স্বজনের তত্ত্বাবধান থেকে বঞ্চিত, মালিকের সেবা করতে হয়, ঘরোয়া কাজকর্ম করতে হয়, বাজার ঘাটে যাওয়া আসা করতে হয়, প্রয়োজনের খাতিরে পুরুষদের সাথে চলাফেরা করতে হয়। অতএব বিবাহের ইহসোন দ্বারা তাদের শাস্তি বৃদ্ধি পাবে না।

অতএব দ্বিতীয় ইহসোন শব্দ দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, এই ইহসোন তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। একজন স্বাধীনা নারী-পুরুষের বিবাহের পর যিনা থেকে বাঁচার যতটুকু সুযোগ তৈরি হয়, একজন দাসীর ততটুকু সুযোগ তৈরি হয় না। তাদের বিবাহের পরও কিছুটা ঝুঁকি থেকে যায়।

উল্লেখ্য, দাসীদের সতর স্বাধীনাদের চেয়ে ব্যতিক্রম। তাদের সতর হাঁটু থেকে নাভি এবং পেট-পিঠ। তাদের মাথায় কাপড় দেয়াকে সাহাবাগণ অপছন্দ করতেন। একবার এক দাসী মাথায় কাপড় দিলে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বেত্রাঘাত করেন। পূর্বেকার জমানায় দাসীদের জন্য মাথায় কাপড় দেওয়া মাকরূহ ফতোয়া দেওয়া হতো।

দলিল-৫: আপনারা বলছেন বিবাহিত স্বাধীন নারী-পুরুষকে রজম করার ব্যাপারে ইজমা রয়েছে। আপনাদের এই দাবি সঠিক নয়। কেননা খারেজিরা এ বিষয়ে একমত ছিল না।

উত্তর: ক- ইজমায় আহলে হকের মুজতাহিদিন ও আহলে ইলমের মতামতকে গণ্য করা হয়। ইজমায় আহলে বাতিলের ইতিবার নেই। বিশেষত সে সমস্ত খারিজিদের মতামতের গ্রহণযোগ্যতা কিভাবে থাকতে পারে যাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দ্বীন হতে তারা এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে ধনুক হতে তীর বেরিয়ে যায়।

হাদিসে এসেছে…
بَعَثَ عَلِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم بِذُهَيْبَةٍ فَقَسَمَهَا بَيْنَ الأَرْبَعَةِ الأَقْرَعِ بْنِ حَابِسٍ الْحَنْظَلِيِّ ثُمَّ الْمُجَاشِعِيِّ وَعُيَيْنَةَ بْنِ بَدْرٍ الْفَزَارِيِّ وَزَيْدٍ الطَّائِيِّ ثُمَّ أَحَدِ بَنِيْ نَبْهَانَ وَعَلْقَمَةَ بْنِ عُلَاثَةَ الْعَامِرِيِّ ثُمَّ أَحَدِ بَنِيْ كِلَابٍ فَغَضِبَتْ قُرَيْشٌ وَالأَنْصَارُ قَالُوْا يُعْطِيْ صَنَادِيْدَ أَهْلِ نَجْدٍ وَيَدَعُنَا قَالَ إِنَّمَا أَتَأَلَّفُهُمْ فَأَقْبَلَ رَجُلٌ غَائِرُ الْعَيْنَيْنِ مُشْرِفُ الْوَجْنَتَيْنِ نَاتِئُ الْجَبِيْنِ كَثُّ اللِّحْيَةِ مَحْلُوقٌ فَقَالَ اتَّقِ اللهَ يَا مُحَمَّدُ فَقَالَ مَنْ يُطِعْ اللهَ إِذَا عَصَيْتُ أَيَأْمَنُنِي اللهُ عَلَى أَهْلِ الأَرْضِ فَلَا تَأْمَنُوْنِيْ فَسَأَلَهُ رَجُلٌ قَتْلَهُ أَحْسِبُهُ خَالِدَ بْنَ الْوَلِيْدِ فَمَنَعَهُ فَلَمَّا وَلَّى قَالَ إِنَّ مِنْ ضِئْضِئِ هَذَا أَوْ فِيْ عَقِبِ هَذَا قَوْمًا يَقْرَءُوْنَ الْقُرْآنَ لَا يُجَاوِزُ حَنَاجِرَهُمْ يَمْرُقُوْنَ مِنْ الدِّينِ مُرُوقَ السَّهْمِ مِنْ الرَّمِيَّةِ يَقْتُلُوْنَ أَهْلَ الإِسْلَامِ وَيَدَعُوْنَ أَهْلَ الأَوْثَانِ لَئِنْ أَنَا أَدْرَكْتُهُمْ لَاقْتُلَنَّهُمْ قَتْلَ عَادٍ

আলী (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কিছু স্বর্ণের টুকরো পাঠালেন। তিনি তা চার ব্যক্তির মাঝে বণ্টন করে দিলেন। (১) আল-আকরা ইবনু হান্যালী যিনি মাজাশেয়ী গোত্রের ছিলেন। (২) উআইনা ইবনু বাদার ফাযারী। (৩) যায়দ ত্বায়ী, যিনি বনী নাবহান গোত্রের ছিলেন। (৪) ‘আলকামাহ ইবনু উলাসা আমেরী, যিনি বনী কিলাব গোত্রের ছিলেন। এতে কুরাইশ ও আনসারগণ অসন্তুষ্ট হলেন এবং বলতে লাগলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজদবাসী নেতৃবৃন্দকে দিচ্ছেন আর আমাদেরকে দিচ্ছেন না।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তো তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য এমন মনোরঞ্জন করছি। তখন এক ব্যক্তি সামনে এগিয়ে আসল, যার চোখ দু’টি কোটরাগত, গন্ডদ্বয় ঝুলে পড়া; কপাল উঁচু, ঘন দাড়ি এবং মাথা মোড়ানো ছিল। সে বলল, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহকে ভয় করুন। তখন তিনি বললেন, আমিই যদি নাফরমানী করি তাহলে আল্লাহর আনুগত্য করবে কে? আল্লাহ আমাকে পৃথিবীবাসীর উপর আমানতদার বানিয়েছেন আর তোমরা আমাকে আমানতদার মনে করছ না। তখন এক ব্যক্তি তাঁর নিকট তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইল। [আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) বলেন] আমি তাকে খালিদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ) বলে ধারণা করছি। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিষেধ করলেন। অতঃপর অভিযোগকারী লোকটি যখন ফিরে গেল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ ব্যক্তির বংশ হতে বা এ ব্যক্তির পরে এমন কিছু সংখ্যক লোক হবে তারা কুরআন পড়বে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। দ্বীন হতে তারা এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে ধনুক হতে তীর বেরিয়ে যায়। তারা ইসলামের অনুসারীদেরকে (মুসলিমদেরকে) হত্যা করবে আর মূর্তি পূজারীদেরকে হত্যা করা হতে বাদ দেবে। আমি যদি তাদের পেতাম তাহলে তাদেরকে আদ জাতির মত অবশ্যই হত্যা করতাম। (সিহাহ সিত্তাহর প্রতিটি কিতাব, মুসনাদে আহমাদ ইত্যাদি। শব্দ বুখারীর ৩৩৪৪)
এই গ্রুপটি খারেজী। এদের মতামত কিভাবে ইজমার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

খ- রজম অস্বীকারকারীদের ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু পথভ্রষ্ট বলেছেন (বুখারী ৬৮২৯)। সুতরাং ইজমার ক্ষেত্রে পথভ্রষ্ট লোকদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই।

দলিল-৬: আল্লাহর বাণী…
یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ مَنۡ یَّاۡتِ مِنۡکُنَّ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ یُّضٰعَفۡ لَهَا الۡعَذَابُ ضِعۡفَیۡنِ ؕ وَ کَانَ ذٰلِکَ عَلَی اللّٰهِ یَسِیۡرًا
“হে নবী-পত্নিগণ! যে কাজ স্পষ্টত ফাহেশা, তোমাদের মধ্যে কেউ তা করলে তার জন্য বাড়িয়ে দেয়া হবে শাস্তি— দ্বিগুণ এবং এটা আল্লাহর জন্য সহজ।”

এখানে আল্লাহ তায়ালা নবী পত্নীগণকে বলেছেন অশ্লীলতা করলে তাদের শাস্তি হবে দ্বিগুণ। রজম হল মৃত্যুদণ্ড। মৃত্যুদণ্ড কি দ্বিগুণ হয় হয়? না। দ্বিগুণ হয় বেত্রাঘাত।

উত্তর: ক- এখানে ফাহেশা শব্দ জিনার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তার দলিল কি।? ফাহেশা শব্দের একটি অর্থ কটুবাক্য। যেমনটা ইবনে আব্বাস রা. তাফসীর করেছেন। খ- আরেকটি অর্থ স্বামীর অবাধ্যতা। যেমন কাতাদা র. তাফসির করেছেন। (তাফসিরে তাবারী, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ১১০২০-২১)

এই ধরনের অর্থ করার একটি দলিল হলো, এই আয়াতের পূর্বে যে বিষয়টি আলোচনা হয়েছে তা হলো, নবী পত্নিগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সাংসারিক খরচ বৃদ্ধির আবদার করেছিলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে উদ্দেশ্য করে এই কথাগুলো বলেন।

গ- এই দ্বিগুণ শাস্তি আখেরাতে আল্লাহ দিবেন। দুনিয়ার হিসাবে নয়। যেটা وَ کَانَ ذٰلِکَ عَلَی اللّٰهِ یَسِیۡرًا
দ্বারা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

ঘ- এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেননি যে, তোমরা শাস্তি বৃদ্ধি করো। যেমনটা তিনি চোরের আয়াতে বলেছেন فاقطعوا ايديهما
যিনাকারীর ব্যাপারে বলেছেন فاجلدوا كل واحد منهما

ঙ- ইমাম তাবারী (২০/২৫৫) নিজ সনদে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন…
عن ابن عباس (يُضَاعَفْ لَهَا العَذَابُ ضِعْفَيْنِ) قال: ‌يعني ‌عذاب ‌الآخرة
অর্থাৎ এখানে আখেরাতের আযাবের কথা বলা হয়েছে।

চ- এই আয়াতের পরের আয়াত হল
ومَنۡ یَّقۡنُتۡ مِنۡکُنَّ لِلّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ تَعۡمَلۡ صَالِحًا نُّؤۡتِهَاۤ اَجۡرَهَا مَرَّتَیۡنِ ۙ وَ اَعۡتَدۡنَا لَهَا رِزۡقًا کَرِیۡمًا

“আর তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অনুগত হবে এবং সৎকাজ করবে তাকে আমি পুরস্কার দেব দ্বিগুণ। আর তার জন্য আমি প্ৰস্তুত রেখেছি সম্মানজনক রিযিক।”

এর দ্বারাও বুঝা যায় যে, এটা আখেরাতের বিষয়।

দলিল-৭: কুরআন মাজিদে এসেছে…
یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَ اَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡهُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِهِنَّ وَ لَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰهِ ؕ وَ مَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰهِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَهٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰهَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا

“হে নবী! তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীগণকে তালাক দিতে ইচ্ছে কর, তাদেরকে তালাক দিও ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে। এবং তোমরা ইদ্দতের হিসেব রেখো। আর তোমাদের রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো। তোমরা তাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বহিস্কার করো না। এবং তারাও বের হবে না, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়। আর এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা; যে আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে সে নিজেরই উপর অত্যাচার করে। আপনি জানেন না, হয়ত আল্লাহ এর পর কোন উপায় করে দেবেন।”

এই আয়াত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে যিনার শাস্তি ঘর থেকে বের করে দেওয়া।

উত্তর: ক- এখানেও ফাহেশার সেই অর্থগুলো প্রয়োগ হতে পারে যেগুলো আমরা উপরে বলেছি।

খ- আরেকটা অর্থ প্রয়োগ হতে পারে যেটা ইবনে ওমর রা. বলেছেন, স্বামীর ঘর থেকে বের হওয়াটা ফাহেশা। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৪/১৮৯)

গ- ইবনে ওমর রা.এর তাফসীর: খুরুজ মানে
خروج لحد

ঘ- কারো কারো তাফসীর
خروج للرجم

অর্থাৎ তার উপর হদ প্রয়োগের জন্য ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাবে।

ঙ-কেউ কেউ বলেছেন এই আয়াত রজমের আগে নাযিল হয়েছে।

কিছু আপত্তির জবাব

আপত্তি-১: কুরআনকে শুধু কোরআন দ্বারাই রহিত করা যায়। সুন্নাহ দ্বারা রহিত করা যায় না।

উত্তর: ক- এখানে কুরআনের বিধানকে রহিতই করা হয়নি। বরং খাস করা হয়েছে। সুতরাং আপত্তি অবান্তর।

ইবনে কুদামা র. (১২/৩১০) বলেন
إنَّ هذا نَسْخٌ. ليس بصحيحٍ، وإنَّما هو تَخْصيصٌ

খ- আর কোরআনকে কোরআন দ্বারাই রহিত করতে হবে বিষয়টা তেমন না। বরং সুন্নাহ দ্বারাও কোরআনের আয়াত রহিত করা যায়।

কারন হাদিস সেখান থেকেই এসেছে যেখান থেকে কুরআন এসেছে। অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে। হাদিসও ওহী।

কুরআন মাজিদে এসেছে…
قُلۡ مَا یَکُوۡنُ لِیۡۤ اَنۡ اُبَدِّلَهٗ مِنۡ تِلۡقَآیِٔ نَفۡسِیۡ ۚ اِنۡ اَتَّبِعُ اِلَّا مَا یُوۡحٰۤی اِلَیَّ ۚ اِنِّیۡۤ اَخَافُ اِنۡ عَصَیۡتُ رَبِّیۡ عَذَابَ یَوۡمٍ عَظِیۡمٍ
বলুন, নিজ থেকে এটা বদলানো আমার কাজ নয়। আমার প্রতি যা ওহী হয়, আমি শুধু তারই অনুসরণ করি। আমি আমার রবের অবাধ্যতা করলে অবশ্যই মহা দিনের শাস্তির আশংকা করি। (ইউনুস ১৫)

কুরআনের সনদ যেখানে শেষ হয়, হাদিসের সনদও সেখানে শেষ হয়। অর্থাৎ রাসুল সাঃ পর্যন্ত। কোরআন তো উম্মতকে রাসুলই দিয়েছেন।

আল জামি লিমাসাইলী উসূলিল ফিকহে (১৫৫) এসেছে
أن كلاً من القرآن والسنة وحي، ونسخ حكم أحد الوحيين بالآخر غير ممتنع عقلاً.
কুরআন সুন্নাহ উভয়টা ওহী। এক অহীকে অপর অহী দ্বারা রহিত করা অযৌক্তিক নয়।

আপত্তি-২: আহলে কুরআন উমর আহমদ উসমানী লিখেছে যে, “কিছু বর্ণনায় পাওয়া যায়, খোলাফায়ে রাশেদা রজমের উপর আমল করেছেন। যদি সেগুলো সহিহ হয়, তাহলে আমি উত্তরে বলবো, হয়তো খোলাফায়ে রাশেদা নসখের (রহিত হওয়ার) বিষয়টা জানতে পারেনি। এবং ইজতিহাদি ভুল করেছে।”

উত্তর: ক- এটাও শুনতে হলো আমাদের যে, খোলাফায়ে রাশেদা নসখের বিষয়ে জানতে পারেনি। কিন্তু দেড় হাজার বছর পর এসে তারা জানতে পেরেছে। এবং তারা কোরআন বুঝার ক্ষেত্রে সাহাবাদের চেয়েও অগ্রগামী হয়ে গিয়েছে।

তাফসীরে কুরতুবীতে (১/৩৫) এসেছে…
َعَنْ عَامِرِ بْنِ وَاثِلَةَ قَالَ: شَهِدْتُ عَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ رضي الله عنه يَخْطُبُ فَسَمِعْتُهُ يَقُولُ فِي خُطْبَتِهِ: سلوني، فوالله لا تسألوني عن شي يَكُونُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ إِلَّا حَدَّثَتْكُمْ بِهِ، سَلُونِي عَنْ كِتَابِ اللَّهِ، فَوَاللَّهِ مَا مِنْ آية الا انا اعلم ‌أبليل ‌نزلت اما بِنَهَارٍ، أَمْ فِي سَهْلٍ نَزَلَتْ أَمْ فِي جَبَلٍ

আমের বিন ওয়াসিলা বলেন, আমি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে উপস্থিত ছিলাম। তিনি খুতবা দিচ্ছিলেন। তাকে আমি বলতে শুনি, তোমরা আমাকে প্রশ্ন করতে পারো। আল্লাহর কসম কিয়ামত পর্যন্ত ঘটতে থাকা যে কোন বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করলে আমি উত্তর দিতে পারব। আমাকে কোরআন সম্পর্কেও প্রশ্ন করতে পারো। আল্লাহর কসম এমন কোন আয়াত নেই যেটা সম্পর্কে আমি বলতে পারব না যে, তা দিনে অবতীর্ণ হয়েছে নাকি রাত্রে! পাহাড়ে অবতীর্ণ হয়েছে নাকি সমতলে!

ইবনে মাসউদ রা. থেকেও কাছাকাছি ধরনের বর্ণনা রয়েছে।

খ- খোলাফায়ে রাশেদা না হয় নসখের বিষয়ে জানতে পারেননি। কিন্তু কোন সাহাবীই কি জানতে পারেননি? তারা জানা সত্ত্বেও কেন চুপ থাকলেন? কেন তারা খোলাফায়ে রাশেদাকে ভুল ধরিয়ে দিলেন না?

গ- সূরা নূরের আয়াত দ্বারা যে রজমের বিধান মানসুখ হয়ে গিয়েছে তা কি একজন সাহাবাও বলেছে?

আহলে কোরআন যেভাবে নিজেদের মর্জির বাইরে গেলে “রহিত” ঘোষণা করে দেয় সেটা খুবই অন্যায়।

এভাবেই যদি রহিত করার অধিকার তৈরি হতে থাকে তাহলে তো ধর্মের যেকোনো বিষয় সম্পর্কে যে কেউ বলবে যে, “অমুক বিধানটা রহিত হয়ে গিয়েছে। তবে সাহাবায়ে কেরাম জানতে পারেনি। আমরাই এটা আনবক্সিং করছি।”

নসখের জন্য শর্ত আছে, মুফাসসির এমনকি মুজতাহিদের ইজতিহাদ দ্বারাও কোনো নকল (কুরআন-সুন্নাহ) নসখ হয় না।

আপত্তি-৩: রজম তাওরাত থেকে ইসলামী শরীয়তে ঢুকে পড়েছে।

উত্তর: ক- আমাদেরকে দেখতে হবে রজম হুকমুল্লাহ (আল্লাহর বিধান) কিনা। যদি আল্লাহর বিধান হয় এবং আল্লাহ তা’আলা সেই বিধানটি একাধিক শরীয়তে আরোপ করেন, তাহলে আমরা মানতে বাধ্য। তাওরাত তো আল্লাহই নাজিল করেছেন। আর কোরআন নাজিল হয়েছে পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের সত্যায়নকারীরূপে। যা কোরআনের বহু জায়গায় বলা আছে।

এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ও তাওরাতের বিকৃতির পরও মুসা আলাইহিস সালাম এর শরীয়তের বহু বিধান বাকি ছিল।

খ- ইসলামে এরকম অসংখ্য বিধান রয়েছে যেগুলো পূর্বেকার শরীয়তেও ছিল। যেমন রোজা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন।
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ
হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববতীদেরকে দেয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারত। (বাকারা ১৮৩)

তাছাড়া নামায ও মোহাররমের রোজাও পূর্ববর্তী শরীয়তে ছিল।

তবে হ্যাঁ, পূর্বেকার শরীয়তের অনেক কিছু হুবহু না এসে পরিবর্তিত হয়ে এসেছে।

গ- এমনকি জাহিলি যুগের কিছু কাজও ইসলাম স্বীকৃতি দিয়েছে। যেমন চোরের হাত কাটা, দিয়্যত। এগুলো জাহেলী যুগেই ছিল।

ঙ- ওলামাগণ এ বিষয়ে একমত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি পূর্বেকার শরীয়তের কোন বিষয়ের উদ্ধৃতি দেন এবং সেটাকে খন্ডন না করেন তাহলে সেটি এই শরীয়তেও গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়।

চ- রজমের বিধান হুবহু পূর্বেকার শরীয়তের মত নয়। মুসা আলাইহিস সালাম এর শরীয়তে জিনাকারী বিবাহিত হোক অথবা অবিবাহিত – উভয় অবস্থায় রজম করা হতো। এবং জিনা ব্যতীত অন্যান্য শাস্তির জন্যও রজমের বিধান ছিল। কিন্তু ইসলামে শুধুমাত্র বিবাহিত স্বাধীন নারী পুরুষের জন্য রজমের বিধান রয়েছে। সুতরাং তাওরাত থেকে ঢুকেছে এই কথা বলা কঠিন।

আপত্তি-৪
عَنْ عَائِشَةَ و عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْقَاسِمِ عَنْ أَبِيهِ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ لَقَدْ نَزَلَتْ آيَةُ الرَّجْمِ وَرَضَاعَةُ الْكَبِيرِ عَشْرًا وَلَقَدْ كَانَ فِي صَحِيفَةٍ تَحْتَ سَرِيرِي فَلَمَّا مَاتَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَتَشَاغَلْنَا بِمَوْتِهِ دَخَلَ دَاجِنٌ فَأَكَلَهَا

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রজম সম্পর্কিত আয়াত এবং বয়স্ক লোকের দশ ঢোক দুধপান সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয়েছিল, যা একটি সহীফায় (লিখিত) আমার খাটের নিচে সংরক্ষিত ছিল। যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন এবং আমরা তাঁর ইন্তিকালে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন একটি ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলে। (ইবনে মাজাহ ১৯৪৪)

হাদিসে এসেছে, রজমের আয়াত ছাগলে খেয়ে ফেলেছে। এ কারণে তা বর্তমান কুরআনে নেই। অথচ আল্লাহ বলেছেন, আমি কোরআন সংরক্ষণ করব।

উত্তর: ক- আল্লাহতালা যে কুরআন হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন সেটা কি ওই কাগজ, যার মধ্যে কোরআন লেখা? আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হয়তো এমন কিছুর মধ্যে কোরআন লিখেছিলেন, যেটা ছাগলে খায় (যেমন পাতা)। ছাগলে তো আর বুঝে না কোথায় কোরআন লেখা আর কোথায় কবিতা লেখা। আমাদের যামানায়ও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। সুতরাং ছাগল পাতা খেয়ে ফেলার কারণে তো কোরআন বিলীন হয়ে যায় না। এমনকি বর্তমান দুনিয়ায় বিদ্যমান সব কোরআন যদি পুড়ে যায় অথবা গলিয়ে দেয়া হয় তবু কোরআন বিদ্যমান থাকবে মানুষের সিনায়।

খ- আহলে কোরআন এই হাদিস দ্বারা সম্ভবত এটা বুঝেছে যে, রজমের আয়াত ছাগলে খাওয়ার কারণে দুনিয়া থেকে হারিয়ে গিয়েছে। অথচ এই দাবি কেউ করেনি। উপরে আমরা বলেছি যে, রজমের আয়াত আল্লাহর রাসূল নিজেই মুছে দিয়েছেন।

গ- একটি আয়াত তো আর একজনের কাছে লেখা ছিল না যে, সেটি ছাগলে খেয়ে ফেললে বিলীন হয়ে যাবে।

এই ধরনের দলিল পেশ করার দ্বারা বুঝা যায় যে তারা হাদিস বুঝায় কতটা অক্ষম।

এছাড়াও তাদের বেশ কিছু আপত্তি রয়েছে। কিন্তু তার কোনটাই এমন নয় যেগুলোর সামঞ্জস্য-বিধান করা যায় না। যে কোন সঠিক বিষয়ের ফাঁকফোকর বের করে এ ধরনের আপত্তি তোলা যায়। কিন্তু বোধসম্পন্ন ব্যক্তি মাত্রই সেগুলো দেখে তার অসরতা বুঝে ফেলে।
আর কিছু আপত্তি এই টপিকের সাথে পুরোপুরি রিলেটেড না। তাই উল্লেখ করা হলো না।

রজম অস্বীকারের বিষয়ে উমর রা.-এর ভবিষ্যৎবাণী

আমরা জানি ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন। তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভবিষ্যতে কিছু লোক রজমের বিধান অস্বীকার করতে পারে।…

عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللهِ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ الزُّهْرِيِّ عَنْ عُبَيْدِ اللهِ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ عُمَرُ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ يَطُولَ بِالنَّاسِ زَمَانٌ حَتَّى يَقُولَ قَائِلٌ لاَ نَجِدُ الرَّجْمَ فِي كِتَابِ اللهِ فَيَضِلُّوا بِتَرْكِ فَرِيضَةٍ أَنْزَلَهَا اللهُ أَلاَ وَإِنَّ الرَّجْمَ حَقٌّ عَلَى مَنْ زَنَى وَقَدْ أَحْصَنَ إِذَا قَامَتْ الْبَيِّنَةُ أَوْ كَانَ الْحَبَلُ أَوْ الِاعْتِرَافُ قَالَ سُفْيَانُ كَذَا حَفِظْتُ أَلاَ وَقَدْ رَجَمَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَرَجَمْنَا بَعْدَهُ.
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার (রাঃ) বলেছেন, আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, দীর্ঘ যুগ পার হবার পর কোন লোক এ কথা বলতে পারে যে, আমরা আল্লাহর কিতাবে পাথর মেরে হত্যার বিধান পাচ্ছি না। ফলে এমন একটি ফরজ ত্যাগ করার কারণে তারা পথভ্রষ্ট হবে যা আল্লাহ্ অবতীর্ণ করেছেন। সাবধান! যখন প্রমাণ পাওয়া যাবে অথবা গর্ভ বা স্বীকারোক্তি পাওয়া যাবে তখন যিনাকারীর জন্য পাথর মেরে হত্যার বিধান নিঃসন্দেহে অবধারিত। সুফিয়ান (রহ.) বলেন, এরকমই আমি স্মরণ রেখেছি। সাবধান! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাথর মেরে হত্যা করেছেন, আর আমরাও তারপরে পাথর মেরে হত্যা করেছি। (বুখারী ৬৮২৯)

মুয়াত্তা মালিকে (২/৮২৪) এসেছে। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার ভাষণে বলেন…
أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ سُنَّتْ لَكُمُ السُّنَنُ. وَفُرِضَتْ لَكُمُ الْفَرَائِضُ. وَتُرِكْتُمْ عَلَى الْوَاضِحَةِ. إِلَّا أَنْ تَضِلُّوا بِالنَّاسِ يَمِينًا وَشِمَالًا». وَضَرَبَ بِإِحْدَى يَدَيْهِ عَلَى الْأُخْرَى “. ثُمَّ قَالَ: «‌إِيَّاكُمْ ‌أَنْ ‌تَهْلِكُوا عَنْ آيَةِ الرَّجْمِ». أَنْ يَقُولَ قَائِلٌ لَا نَجِدُ حَدَّيْنِ فِي كِتَابِ اللَّهِ. فَقَدْ رَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَرَجَمْنَا. وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَوْلَا أَنْ يَقُولَ النَّاسُ: زَادَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ فِي كِتَابِ اللَّهِ تَعَالَى لَكَتَبْتُهَا – الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ فَارْجُمُوهُمَا أَلْبَتَّةَ – فَإِنَّا قَدْ قَرَأْنَاهَا
قَالَ مَالِكٌ: قَالَ يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ:، قَالَ سَعِيدُ بْنُ الْمُسَيِّبِ: «فَمَا انْسَلَخَ ذُو الْحِجَّةِ حَتَّى قُتِلَ عُمَرُ رحمه الله» قَالَ يَحْيَى: سَمِعْتُ مَالِكًا يَقُولُ: قَوْلُهُ الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ يَعْنِي: «الثَّيِّبَ وَالثَّيِّبَةَ فَارْجُمُوهُمَا أَلْبَتَّةَ»

হে লোকসমাজ! তোমাদের জন্য সুন্নত জারি হয়েছে। ফরজ নির্ধারিত হয়েছে। তোমরা একটি সুস্পষ্ট এবং পরিচ্ছন্ন রাস্তায় চলমান। তবে হতে পারে তোমরা ডানে বামে বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি বললেন, সাবধান! রজমের আয়াতের বিষয়ে ধংস হয়ে যেওনা যে, তোমাদের কেউ বলতে শুরু করে যে, আমরা আল্লাহর কিতাবে দুইটি হদ পাইনি। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও রজম করেছেন এবং আমরাও করেছি। ওই সত্ত্বার কসম, যার হাতে আমার জীবন, যদি এই আশঙ্কা না হত যে লোকে বলবে, ওমর আল্লাহর কোরআনের মধ্যে হাত দিয়েছে, তাহলে আমি লিখে দিতাম, বিবাহিত পুরুষ এবং বিবাহিত মহিলা যদি ব্যভিচার করে তাহলে তাদের অবশ্যই পাথর মারো। কেননা আমরা এই আয়াত পড়েছি।

রজমের যৌক্তিকতা

১- অনেকে বলে, আল্লাহ তাআলা এত দয়ালু। তিনি রজমের মতো কঠিন শাস্তির বিধান দিতে পারেন না। তাদের মনে রাখা উচিত, আল্লাহ তা’আলা যেমন দয়ালু তেমনি অবাধ্যদের উপর কঠোর। এজন্যই তিনি জাহান্নাম তৈরি করেছেন। জাহান্নামের বর্ণনা কোরআন মাজিদের বিভিন্ন স্থানে আমরা পাই।

২- যদি বলা হয় যে জাহান্নাম তো আখেরাতের ব্যাপার। দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালা এমন শাস্তি দিতে পারেন না। এর উত্তরে বলবো, লুত আঃ এর জাতি যখন সমকামিতায় লিপ্ত হলো, তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে উল্টে দিয়েছিলেন এবং তাদের উপর পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন।

৩- শরীয়তে রজমের আইন তো আছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন এত কঠিন যে, ইতিহাসে রজমের ঘটনা তুলনামূলক অনেক কম ঘটেছে। রাসূল সা.এর যুগে মুসলিমদের উপর যে কটি রজম বাস্তবায়িত হয়েছে সবগুলোই হয়েছে স্বীকারোক্তির মধ্যমে। রাসূল সা.এর যুগে সাক্ষ্যের মাধ্যমে কোনো মুসলিমের উপর রজম বাস্তবায়ন হয়নি। অবশ্য ইহুদিদের উপর রজম বাস্তবায়িত হয়েছে সাক্ষ্যের মাধ্যমে। অতএব তারা যদি স্বীকারোক্তি না দিত তাহলে তো কোন রজমের ঘটনাই ঘটতো না। সম্ভবত এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালার ভয় দেখিয়ে মানুষকে রজম থেকে বিরত রাখতে চেয়েছেন।

অনেক সময় শিক্ষা দীক্ষার ক্ষেত্রে ওস্তাদ সামনে লাঠি রেখে দেয়ার দ্বারাই ছাত্ররা ঠিক হয়ে যায়। মারার প্রয়োজন হয় না।

অনেক সময় মাদ্রাসাগুলোতে বিভিন্ন অপরাধে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া থাকে। যদিও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ চায় না, কেউ সেই অপরাধ করে বহিষ্কৃত হোক। তবুও ঘোষণা দেয়, যাতে ভয়ে কেউ সেই অপরাধে না জড়ায়। তার সুফলও পাওয়া যায়। দেখা যায় পুরা বছরে একটাও বহিষ্কারের ঘটনা ঘটে না। কারণ সেই অপরাধই কেউ করার সাহস পায়নি।

এটা নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারাও বোঝা যায়। যেখানে আল্লাহতালা বলেছেন, জিনার শাস্তি সংঘটিত হওয়ার সময় মুসলমানদের একটি দলকে উপস্থিত হয়ে তা প্রত্যক্ষ করতে…

وليشهد عذابهما طائفه من المؤمنين
মুমিনকদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (সূরা নুর)

এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যাতে এর থেকে শিক্ষাগ্রহণ অথবা ভয় পেয়ে এই কাজ থেকে বিরত থাকে।

৪- যদি সমাজে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে। যিনা ব্যভিচার ঘটতে থাকে। সেটি তো আখেরাতে বিরাট আযাবের কারণ হবে। অতএব যদি মানুষ দুনিয়াতে জিনার কঠিন শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। তাহলে ভয়ে তা থেকে বিরত থাকবে। এতে সে জাহান্নামের আজাব থেকেও বেঁচে যাবে। যা রজমের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন।

৫- একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, রজমের বিধান এখন অনেকের কাছে বর্বর মনে হচ্ছে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর যুগে মানুষ নিজে এসে স্বীকারোক্তি দিয়েছে; এই শাস্তি সম্পর্কে জানা থাকা সত্ত্বেও। সুতরাং পরিপূর্ণ ঈমান, আল্লাহর ভয়, গুনাহের অনুভূতি থাকলে কারো কাছে এটি বর্বর বিধান মনে হবে না।

৬- রজম তো শুধু শাস্তি নয়। বরং সম্ভবত সর্বোচ্চ স্তরের তওবা। যা হয়তো মানুষকে আখেরাতের শাস্তি থেকে বাঁচানোর একটা বাহানা। যা মানুষকে সমস্ত পাপ থেকে ধুয়ে মুছে মর্যাদার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেয়। এবং এমন নিকৃষ্ট কাজ করার পরও সে মানুষকে উৎকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়…

নিম্নোক্ত হাদিসটি দেখুন। জুহাইনা উপগোত্রের নারীকে রজম করার পর…
ثُمَّ صَلَّى عَلَيْهَا فَقَالَ لَهُ عُمَرُ تُصَلِّي عَلَيْهَا يَا نَبِيَّ اللَّهِ وَقَدْ زَنَتْ فَقَالَ ‏”‏ لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ سَبْعِينَ مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ لَوَسِعَتْهُمْ وَهَلْ وَجَدْتَ تَوْبَةً أَفْضَلَ مِنْ أَنْ جَادَتْ بِنَفْسِهَا لِلَّهِ تَعَالَى ‏
অতঃপর তিনি সা. তার উপর জানাযার সালাত আদায় করলেন। তখন উমর (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনি তার (জানাযার) সালাত আদায় করলেন অথচ সে তো ব্যভিচার করেছিল? তিনি বললেন, নিশ্চয়ই সে এমনভাবে তওবা করেছে, যদি তা মদীনার সত্তরজন লোকের মধ্যে বণ্টিত হতো, তবে তাদের সবার জন্য তা যথেষ্ট হতো। তুমি কি তার চেয়ে অধিক উত্তম তওবাকারী কখনও দেখেছো? সে-তো নিজের জীবন আল্লাহর জন্য দিয়ে দিয়েছে। (মুসলিম ৪৩২৫)

আল্লাহর রাসূল এমন ভাবে -জীবন আল্লাহর জন্য দিয়ে গিয়েছে- কথাটা বললেন যেন সে জিহাদের ময়দানে শহীদ হয়েছে।

৭- আল্লাহ তায়ালা অশ্লীলতাকে অপছন্দ করেন। এজন্য তিনি কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় অশ্লীলতা থেকে বারণ করেছেন। হিজাবের বিধান নাজিল করেছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেয়েদের নম্রস্বরে কথাবার্তা বর্জন করতে বলেছেন। পুরুষদের দৃষ্টি অবনত রাখতে বলেছেন। এই সব কিছুই করা হয়েছে যিনা থেকে রক্ষা করতে। এমনকি কুরআনে তিনি তো জিনার নিকটবর্তী হতেও বারণ করেছেন। উপরন্তু যদি কেউ বিবাহিত হয় তাহলে তার বৈধভাবে প্রয়োজন পূরণ করার সুযোগ তৈরি হয়ে যায়। তবুও এমন নিকৃষ্ট কাজে কেউ লিপ্ত হলে আল্লাহতালার নিকট তা কঠিন অপরাধ গণ্য হয়।

৮- আমাদের মত দুর্বল মুমীনের চোখে দেখলে চোরের হাত কাটা, মুরতাদ, শাতিম, মুলহিদ, যিন্দিকের মৃত্যুদণ্ড, কিসাস ইত্যাদি সবই কঠিন। বর্তমান যুগের অনেকে তো মৃত্যুদণ্ডই সাপোর্টই করে না। অথচ এগুলো ইসলামী সমাজকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য জরুরি। অতএব কে কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছে, তার অবস্থা কি – সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

মুনকিরীনে রজমের হুকুম

উপরে আমরা বলে এসেছি, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: “যে ব্যক্তি রজম অবিশ্বাস করে সে কোরানকে অবিশ্বাস করে।

ইবনে হজম ও তাকিউদ্দীন সুবকী র. রজম অস্বীকারকারীকে কাফের আখ্যায়িত করেছেন।(ফাতাওয়ায়ে সুবকী ২/৫৭৭)।

ইমাম তাবারী বলেন, মুসলিম শাসক তাকে তাওবা করতে বলবে। যদি সে অস্বীকার করে তাহলে তাকে মুরতাদ হওয়ার কারণে হত্যা করতে হবে।(তাবসির ১৬১)

উলামায়ে আহনাফের সংজ্ঞায়ও তারা মুলহিদ ও যিন্দিক। অর্থাৎ হত্যাযোগ্য।

এক আলেম রজমের গুরুত্ব বোঝাতে মজা করে বলতেন, যে রজম অস্বীকার করে তাকেই রজম করা উচিত।

রজম ও রজম অস্বীকারকারীদের শাস্তি প্রয়োগের দায়িত্ব কার

রজম প্রয়োগের মুকাল্লাফ বিচারক বা সরকার। সাধারণ মানুষ এই বিধান বাস্তবায়ন করবে না।। তবে সরকার যেন এই বিধান বাস্তবায়ন করে সেজন্য সরকারের কাছে মানুষ আবেদন জানাবে।

সংকলন: উমর ফারূক তাসলিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *