যেভাবে উপস্থিত বয়ান করবেন

কখনো কখনো আমাদের উপস্থিত বয়ান করার প্রয়োজন হয়। যেমন কোনো প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গেলাম, আমাদের বলা হলো তালিবুল ইলমদের উদ্দেশ্যে কিছু নসিহত করতে। মসজিদের ইমাম পরিচিত, তো জুমা পড়ানোর অনুরোধ আসলো। এই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ খেই হারিয়ে ফেলি।

এমন হওয়ার কারণ কী? ইলমের অভাব? না। আধা ঘন্টা বয়ান করতে পারবে না, এমন ইলম-খরা কোনো আলেমের থাকতে পারে না। আর বড় বড় উলামাগণের নিকট তো ইলমের বিশাল খাজানা রয়েছে। তারাও কিন্তু কেউ কেউ এ পরিস্থিতিতে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।

বোঝাই যাচ্ছে ইলমের সংকট নয়, সমস্যাটা হয় টাইমিংয়ের কারণে। ঠিক ওই মুহূর্তে কোন কোন বিষয় মাথায় উপস্থিত থাকে এবং সেগুলাকে বক্তা ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করতে পারছে কিনা তার উপরই নির্ভর করে উপস্থিত বয়ান।


এর সমাধানে দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমি যে কাজটি করতাম তা হল, প্রতিটি সাবজেক্টের সাথে “কী, কেন, কিভাবে, বর্তমান অবস্থা, করণীয়, বর্জনীয়” ট্যাগ যুক্ত করা।

যেমন ইলম সম্পর্কে কথা বলতে বলা হলো। তখন প্রথমেই বলা ইলম কী? তো ইলম হচ্ছে ওহী। ইলম ও দুনিয়াবি জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

তারপরে হচ্ছে কেন? মানে ইলম কেন শিখব? এর উত্তরে আলেমদের মর্যাদার বিষয়টি চলে আসে। সেসূত্রে কিছু পরিচিত আয়াত ও হাদিসও মনে ভেসে উঠে। যেমন
إنما يخشى الله من عباده العلماء
قل هل يستوي الذين يعلمون والذين لا يعلمون
من يرد الله به خيرا يفقهه في الدين
مجلس فقه خير من عبادة ستين سنة
فضل العالم على العابد كفضلي على أدناكم

তারপর হচ্ছে কিভাবে? মানে কিভাবে ইলম অর্জন করা যায়? তো এই বিষয়ে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর মেহনত, ইবনে আব্বাস রা.র সফর এবং নিকটবর্তী আকাবিরদের বিভিন্ন ঘটনা মনে পড়ার কথা।

তারপর হচ্ছে বর্তমান অবস্থা। তো বর্তমানে সংখ্যায় আলেম বাড়লেও মান কমে যাচ্ছে। ইলমের সেই গভীরতাটাও দুর্লভ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ ভাসা-ভাসা জ্ঞান নিয়ে কথা বলছে। এছাড়াও আরো বহু কিছু বলা যায়।

করণীয়। করণীয় হচ্ছে দুয়া, মেহনত, বুঝে পড়া, মনোযোগী হওয়া ইত্যাদি।

আর বর্জনীয় হলো মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, খারাপ বন্ধু ,গল্প উপন্যাস সহ যেসকল জিনিস মনোসংযগে বিক্ষিপ্ততা তৈরি করে।

একইভাবে নারীদের পর্দা সম্পর্কে আলোচনা করা যায়। যেমন…

পর্দা কী? গায়রে মারামের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা যাবে কিনা? প্রয়োজনীয় কথাই বা কিভাবে বলবে? কোনটা খাস পর্দা? কোনটা খাস পর্দা নয়? আত্মীয়দের ভিতরে পর্দা আছে কিনা?

পর্দা কেন করবে? পর্দা করলে দুনিয়াতে নারীর নিরাপত্তা রয়েছে। আর আখেরাতে রয়েছে নাজাত।

তারপরের প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে?

হতে পারে এই প্রশ্ন টপিকের সাথে মানানসই নয়। তো এই অংশটা বাদ দিয়ে যান। উপরুল্লিখিত প্রত্যেকটা ট্যাগ সকল বিষয়ে নাও খাটতে পারে। আবার কোনো বিষয়ের সাথে নতুন নতুন ট্যাগ যুক্ত করা যেতে পারে।

বর্তমান অবস্থা। বর্তমানে নারীদের পর্দার অবস্থা তো খুবই ভয়াবহ। এ বিষয়ে আশা করি অনেক কথাই বলা যাবে।

করণীয়। করণীয় হলো নিজে পর্দার নিয়ত করা। পরিবার যদি পর্দা করতে বাধা দেয় তাদেরকে বোঝানো ইত্যাদি।

বর্জনীয় হলো রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করা, অপ্রয়োজনে মার্কেটে যাওয়া, নিজেকে প্রকাশ করা ইত্যাদি।

একইভাবে কুরআন মাজিদ সম্পর্কে বলা যায়, মৃত্যু সম্পর্কে বলা যায়…


যাইহোক, এটাতো একটা জটিল ট্রিক্স। উপস্থিত বয়ান করার এরচেয়ে সুন্দর রাস্তাও রয়েছে। যেমন…

আপনি কুরআন মাজিদের কিছু কিছু অংশ তরজমা করে শোনাতে পারেন। বেশ কিছু স্থান আছে, যেগুলোর তরজমা খুবই সহজ। যেমন ১৮ নম্বর পারার প্রথম সূরা মুমিনুনের প্রথমাংশ তরজমা করলেন…

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ
মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে
الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ
যারা নিজেদের নামাযে বিনয়ী
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ
যারা অনর্থক বিষয় বর্জনকারী
وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ
যারা যাকাত দেয়
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ
এবং যারা নিজেদের লজ্জাস্থান সংযত রাখে
إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ
তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্কৃত হবে না
فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاء ذَلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ
অতঃপর কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা সীমালংঘনকারী হবে
وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ
এবং যারা আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করে
وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ
এবং যারা তাদের নামাযসমূহের হেফাজত করে
أُوْلَئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ
তারাই উত্তরাধিকার লাভ করবে
الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
তারা শীতল ছায়াময় উদ্যানের উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা তাতে থাকবে চিরকাল।

এখানে প্রতিটি আয়াতে একটি করে বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে৷ যথা ঈমান, নামাযে বিনয়, বেহুদা কথা বা কাজ বর্জন, যাকাত, লজ্জাস্থানের হেফাজত, আমানত, ওয়াদা, নামাযের হেফাজত ৷ একেকটি বিষয়ের উপর কয়েক মিনিট করে কথা বললে সহজেই আধাঘন্টা পার হয়ে যাবে।


সূরা বাকারার শুরুতে মুত্তাকির পরিচয় দেয়া হয়েছে। সেখানেও বেশ কয়েকটা বিষয় রয়েছে কথা বলার মত।
ذَلِكَ الْكِتَابُ لاَ رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
এটি সেই কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী মুত্তাকিদের জন্য।
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
যারা অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।
والَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করে সেসব বিষয়ের উপর যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের উপর যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখেরাতকে যারা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে।
أُوْلَـئِكَ عَلَى هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ وَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথ প্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম।

এখানে মুত্তাকির গুণ হিশেবে অদৃশ্যের প্রতি ঈমান, নামায, সাদাকা, কুরআন ও অন্যান্য আসমানী গ্রন্থের প্রতি ঈমান এবং আখিরাতের প্রতি নিশ্চিত বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে। প্রত্যেক বিষয়ের উপর কিছু কিছু করে বললে বিশাল বয়ান হয়ে যায়।


নারীদের সম্পর্কে বয়ান করতে চাইলে ২২ নম্বর পারার প্রথম পৃষ্ঠার একটি আয়াতেই অনেক বয়ান পাওয়া যাবে।
اِنَّ الۡمُسۡلِمِیۡنَ وَ الۡمُسۡلِمٰتِ وَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتِ وَ الۡقٰنِتِیۡنَ وَ الۡقٰنِتٰتِ وَ الصّٰدِقِیۡنَ وَ الصّٰدِقٰتِ وَ الصّٰبِرِیۡنَ وَ الصّٰبِرٰتِ وَ الۡخٰشِعِیۡنَ وَ الۡخٰشِعٰتِ وَ الۡمُتَصَدِّقِیۡنَ وَ الۡمُتَصَدِّقٰتِ وَ الصَّآئِمِیۡنَ وَ الصّٰٓئِمٰتِ وَ الۡحٰفِظِیۡنَ فُرُوۡجَهُمۡ وَ الۡحٰفِظٰتِ وَ الذّٰکِرِیۡنَ اللّٰهَ کَثِیۡرًا وَّ الذّٰکِرٰتِ ۙ اَعَدَّ اللّٰهُ لَهُمۡ مَّغۡفِرَۃً وَّ اَجۡرًا عَظِیۡمًا ﴿۳۵﴾
নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও নারী, মুমিন পুরুষ ও নারী, অনুগত পুরুষ ও নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও নারী, বিনয়াবনত পুরুষ ও নারী, দানশীল পুরুষ ও নারী, সিয়ামপালনকারী পুরুষ ও নারী, লজ্জাস্থানের হিফাজতকারী পুরুষ ও নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারী – তাদের জন্য আল্লাহ মাগফিরাত ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।


যাদের অন্তত ৩০ নম্বর পারার তরজমা জানা আছে তারা সূরা দুহা, আলাম নাশরাহ এবং ত্বীন এর মধ্যে অত্যন্ত সুন্দর আলোচনা পাবে। শেষের দশ সূরার মধ্যে সূরা মাউন, (সিরাত সম্পর্কে কথা বলতে চাইলে) সূরা কাওসার, সূরা নাস্র ও সূরা লাহাব এবং তাওহীদ সম্পর্কে সূরা ইখলাস রয়েছে।

এমনকি সুরা ফাতেহার তরজমা করে গেলেও সুন্দর বয়ান হবে।


উপস্থিত বয়ান করতে সবার সমস্যা হয় না। অনেকেই আছে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে যেতে পারে। এমনকি কম ইলম নিয়েও। আসলে এটি আল্লাহপ্রদত্ত গুণ।

যাদের উপস্থিত কথা বলায় সমস্যা আছে, তারা এর স্থায়ী সমাধান করতে পারে বিষয়ভিত্তিক আয়াত ও হাদিস মুখস্ত করার মাধ্যমে। আমাদের দেশীয় আলেমদের ভেতর এই সমস্যাটা থাকার মূল কারণই হলো বিষয়ভিত্তিক আয়াত ও হাদিস মুখস্ত না থাকা। অনেকে তো মক্তবের ৪০ হাদিসের বাইরে আর কখনোই হাদিস মুখস্ত করে না।

ফয়জুল কালাম, আলফিয়াতুল হাদিস, রিয়াদুস সালেহীন বিষয়ভিত্তিক হাদিসের সুন্দর সংকলন। এই কিতাবগুলো হিম্মত করলেই মুখস্ত করা সম্ভব। এবং কুরআন তিলাওয়াতের সময় অর্থের দিকে লক্ষ্য রাখলেও এক্ষেত্রে ফায়দাজনক হবে। কেননা একে তো এটি কুরআন তিলাওয়াতের আদব। দ্বিতীয়ত এর দ্বারা বয়ানে সাহায্য হয়।

আর হ্যা, মুখস্ত কুরআন হাদীস যেমন বয়ানের ক্ষেত্রে কাজে দিবে, একইভাবে নিজের জীবন কুরআন সুন্নাহ মত সাজানোর ক্ষেত্রেও কাজে দিবে।

লেখক: উমর ফারূক তাসলিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *