স্ত্রী তার মৃত স্বামীকে গোসল দিতে পারবে। এব্যাপারে ইজমা রয়েছে। কিন্তু স্বামী তার মৃত স্ত্রীকে গোসল দিতে পারবে কিনা এবিষয়টি মতভেদপূর্ণ৷
তিন ইমাম ও আহলে হাদিসের মতে স্বামীর জন্যও স্ত্রীকে গোসল দেয়া জায়েয। পক্ষান্তরে হানাফি ও তদানিন্তন কুফার বড় বড় ফকিহগণের মতে স্বামীর জন্য স্ত্রীকে গোসল দেয়া জায়েয নেই।
জমহুর ও আহলে হাদীসের দলিল
প্রথম দলিল: ইবনে মাজায় বর্ণিত আইশা রা.র হাদিস (১৪৬৫)
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ رَجَعَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم مِنْ الْبَقِيعِ فَوَجَدَنِي وَأَنَا أَجِدُ صُدَاعًا فِي رَأْسِي وَأَنَا أَقُولُ وَا رَأْسَاهُ فَقَالَ بَلْ أَنَا يَا عَائِشَةُ وَا رَأْسَاهُ ثُمَّ قَالَ مَا ضَرَّكِ لَوْ مِتِّ قَبْلِي فَقُمْتُ عَلَيْكِ فَغَسَّلْتُكِ وَكَفَّنْتُكِ وَصَلَّيْتُ عَلَيْكِ وَدَفَنْتُكِ
আইশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাকী থেকে ফিরে এসে আমাকে মাথা ব্যথায় যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় পেলেন। তখন আমি বলছিলাম, হায় আমার মাথা! তিনি বলেন, হে আয়িশাহ! আমিও মাথা ব্যথায় ভুগছি। হায় আমার মাথা! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যেতে, তাহলে তোমার কোন ক্ষতি হতো না। কেননা আমি তোমাকে গোসল করাতাম, কাফন পড়াতাম, তোমার জানাযার সালাত পড়তাম এবং তোমাকে দাফন করতাম।
শাইখ আলবানি ইরওউয়াউল গলিলে (৭০০) হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
হানাফিদের জবাব: (১) রাসূল সা.র স্ত্রীগণের হুকুম সকলের চেয়ে আলাদা। তার স্ত্রীগণের বিবাহ মৃত্যুর পরও বাকি ছিলো। এর পক্ষে দলিল (ক) كل سبب ونسب ينقطع بالموت إلا سببي ونسبي
সকল বন্ধন ও বংশ মৃত্যুর মাধ্যমে মিটে যায় শুধুমাত্র আমার বন্ধন ও বংশ ছাড়া। হাদিসের মান: গ্রহণযোগ্য (খ) রাসূল সা.র ইন্তিকালের পর উম্মাহাতুল মুমিনীনের অন্যত্র বিবাহ হারাম হওয়া। (গ) ইন্তিকালের পর রাসূল সা.র মিরাস বন্টন না হওয়া।
আইশা রা. সম্পর্কে তো বিষয়টা স্পষ্টভাবেই এসেছে। যেমন তিরমিজি ও ইবনে হিব্বানের হাদিস, জিব্রিল আলাইহিস সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লামকে স্বপ্নে এসে বলেছেন
إن هذه زوجتك في الدنيا والآخرة
নিশ্চয়ই আইশা দুনিয়া ও আখেরাতে আপনার স্ত্রী।
জবাব ২- এটা রাসূল সা.র বিশেষত্বও হতে পারে।
জবাব ৩- فَغَسَّلْتُكِ وَكَفَّنْتُكِ বলা দ্বারা স্পর্শ উদ্দেশ্য হওয়া জরুরি না৷ তরজমা এভাবেও করা যায় “আমি তোমার কাফন দাফনের ইন্তিজাম করতাম”
জবাব ৪- কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদিসটিকে দূর্বল বলেছেন।
দ্বিতীয় দলিল: আসমা বিনতে উমাইস রা. বলেন
لما ماتت فاطمة رضي الله عنها غسلتها وعلي بن ابى طالب
যখম ফাতিমা মৃত্যুবরণ করলেন, তখন আমি ও আলী বিন আবু তালেব তাকে গোসল দেই।
(আল মা’রিফাহ লিল বাইহাকি, হাদিসের মান: হাসান)
নাইলুল আওতারে ইমাম শাওকানি হাসানসূত্রে বলেন
ولم يكن بين سائر الصحابة انكار على علي واسماء فكان إجماعا
কোনো সাহাবাই আলী রা.র কাজটিকে অপছন্দ করেননি। সুতরাং এই বিষয়ে ইজমায়ে সুকুতি সাব্যস্ত হয়েছে।
হানাফিদের জবাব: ইজমা তখনই সাব্যস্ত হবে যখন সকল সাহাবার কানে এই খবর পৌঁছা প্রমাণিত হবে। কিন্তু তেমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং কোনো কোনো বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায় ফাতিমা রা.র কাফন দাফন দ্রুত ও স্বল্প উপস্থিতিতে হয়েছিল। ফলে সাহাবাদের কানে খবর পৌঁছার বিষয়টি সুদূর পরাহত।
তৃতীয় দলিল: ইমাম বাইহাকি বর্ণনা করেন (৬৬৬২)
أن عبد الله بن مسعود غَسَّلَ زوجته حين ماتتْ
ইবনে মাসউদ তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাকে গোসল দিয়েছিলেন
হানাফিদের জবাব : বাইহাকি এই হাদিস বর্ণনা করে নিজেই জইফ বলেছেন। আর জইফ হাদিস দলিলের উপযুক্ত না।
চতুর্থ দলিল: স্ত্রী স্বামীকে গোসল করাতে পারবে এব্যাপারে সবাই একমত। সুতরাং এর উপর কিয়াস করে বলা যায়, স্বামীও স্ত্রীকে গোসল দিতে পারবে।
হানাফিদের জবাব: স্বামীর গোসল দেয়ার সাথে একে কিয়াস করা যাবে না। কেননা স্বামীর মৃত্যুর পরও স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হয় না, যতদিন না ইদ্দত শেষ হয়। এজন্যই ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বে অন্যত্র বিবাহ বসা যায় না। পক্ষান্তরে স্বামীর ইদ্দত নেই। স্ত্রীর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই সে বিয়ে করতে পারবে।
হানাফিদের দলীল
প্রথম দলিল- বেগানা নারীকে স্পর্শ করা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হয়েছে৷ গোসলের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।
জমহুরের আপত্তি: স্ত্রী কীভাবে বেগানা হয়?
হানাফিদের জবাব: মৃত্যুর মাধ্যমে স্ত্রীর স্ত্রীত্ব নষ্ট যায়। এবং সে বেগানা হয়ে যায়। দলিল হলো, স্ত্রীর মৃত্যুর সাথে সাথে সাথে তার বোনকে বিয়ে করা বৈধ হয়ে যাওয়া। এবং তার আগের ঘরের কন্যাকে বিয়ে করা বৈধ হয়ে যাওয়া (দুখুল না হওয়া অবস্থায়)। দুই বোন একত্রে স্ত্রী বানানো কুরআন দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হয়েছে৷ যেহেতু স্ত্রীর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তার বোনকে স্ত্রী বানানো জায়েয। তাই প্রথম স্ত্রীর স্ত্রীত্ব বাতিল হওয়া সুস্পষ্ট।
দ্বিতীয় দলিল: উমর বিন খাত্তাব রা. বলেন
نحن كنا احق بها اذا كانت حية فاما اذا ماتت فانتم احق بها
স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় আমরা তার সর্বাধিক হকদার। মৃত্যুর পর তোমরা সর্বাধিক হকদার।
(কিতাবুল আসার নং ২৩০)
জমহুরের আপত্তি: এটা হাদিসুল বালাগ। মুহাম্মাদ বিন হাসান শাইবানি ও উমর বিন খাত্তাব রা.র মাঝের রাবি কারা জানা নেই। তাই এই হাদিস দূর্বল।
হানাফিদের জবাব: (ক) আমাদের মতে কুরুনে ছালাছার হাদীসুল বালাগ গ্রহণযোগ্য, বিশেষত যদি তা মুজহাহিদ পর্যায়ের কেউ বর্ণনা করে।
(খ) এই আছারটি মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাতে মুত্তাসিল সনদে এসেছে
حدثنا حفص بن غياث عن ليث عن يزيد بن ابي سليمان عن مسروق قال ماتت امرأة لعمر فقال انا كنت اولى بها اذا كانت حية فاما الان فانتم اولى بها (২/৪৫৬)
রাবীদের অবস্থা
হাফস বিন গিয়াস: ইমাম, সিকাহ, হাফিজুল হাদীস।
লাইস বিন আবি সুলাইম। সত্যবাদী, আবেদ, শেষ বয়সে ভুল করতেন। তার লিখিত হাদিস মৌখিক হাদিসের চেয়ে উচ্চমানের। বেশিরভাগ মুহাদ্দিস দূর্বল বলেছেন। কেউ কেউ তাওসিক করেছেন, যেমন ইয়াহইহা বিন মাইন এক জায়গায় বলেছেন لا بأس به، وعامة شيوخه لا يعرفون
তার হাদিস নিতে সমস্যা নাই। তবে তার অধিকাংশ শাইখ অপরিচিত। অন্যত্র বলেছেন, ليس حديثه بذاك ضعيف তার হাদিস তেমন একটা দূর্বল নয়।
(সিয়ারু আলামিন নুবালা)
ইয়াযিদ বিন আবি সুলাইমান: ইয়াহইয়া বিন মাইন ও দারাকুতনি দূর্বল বলেছেন। ইবনে খুযাইমা তার বর্ণনাকে সহিহ আখ্যা দিয়ছেন। ইবনে হিব্বান তার সিকাতে তাকে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি লিখেছেন যে, তিনি ভুলও করতেন। (তা’জিলুল মানফাআহ ২/৭৩) ইমাম আবু দাউদ তাকে তাওসিক করেছে (খুলাসাতু তাহজিবিল কামাল) ইবনে হাজার তাকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন (তাকরিবুত তাহজিব ৭৭৫১)
মাসরুক: উমর রা.র ছাত্র। ফকিহ, হাফিজুল হাদীস।
সব মিলিয়ে হাদিসের মান গ্রহণযোগ্য।
তৃতীয় দলিল: আপনাদের মতেও ইদ্দতের পর ওই মহিলা তার সাবেক স্বামীকে গোসল দিতে পারবে না। শুধুমাত্র ইদ্দত চলাকালীনই তাকে গোসল দেয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তারমানে দাড়ালো, আপনারাও সেই ইল্লত গ্রহণ করেছেন যা দ্বারা আমরা দলিল দিয়েছি। নইলে আপনাদের বর্ণিত হাদিস ও আছারে তো এর দলিল নেই।
উপসংহার: আশরাফ আলী থানভী রহি. ইমদাদুল ফাতাওয়ায় (১/৪৯২) উভয় পক্ষের দলিল উপস্থাপনের পর লিখেছেন, এটি ইজতিহাদি মাসাইল, উভয় পক্ষেরই এখানে যথেষ্ট ভিন্নচিন্তার সুযোগ রয়েছে। একদলকে সুস্পষ্ট বিজয়ী ঘোষণার সুযোগ এখানে কম। অতএব এই মাসয়ালায় একদল আরেকদলকে বিদ্রুপ করা জায়েয হবে না।
উল্লেখ্য, হানাফি মাজহাবে স্ত্রীর মৃত্যুর পর ইস্তিহসানান স্বামীকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। স্বামী তার খাটিয়াও বহন করতে পারবে৷ তবে তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
লেখক: উমর ফারূক তাসলিম
স্ত্রী তার মৃত স্বামীকে গোসল দিতে পারবে। এব্যাপারে ইজমা রয়েছে। কিন্তু স্বামী তার মৃত স্ত্রীকে গোসল দিতে পারবে কিনা এবিষয়টি মতভেদপূর্ণ৷
তিন ইমাম ও আহলে হাদিসের মতে স্বামীর জন্যও স্ত্রীকে গোসল দেয়া জায়েয। পক্ষান্তরে হানাফি ও তদানিন্তন কুফার বড় বড় ফকিহগণের মতে স্বামীর জন্য স্ত্রীকে গোসল দেয়া জায়েয নেই।
জমহুর ও আহলে হাদীসের দলিল
প্রথম দলিল: ইবনে মাজায় বর্ণিত আইশা রা.র হাদিস (১৪৬৫)
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ رَجَعَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم مِنْ الْبَقِيعِ فَوَجَدَنِي وَأَنَا أَجِدُ صُدَاعًا فِي رَأْسِي وَأَنَا أَقُولُ وَا رَأْسَاهُ فَقَالَ بَلْ أَنَا يَا عَائِشَةُ وَا رَأْسَاهُ ثُمَّ قَالَ مَا ضَرَّكِ لَوْ مِتِّ قَبْلِي فَقُمْتُ عَلَيْكِ فَغَسَّلْتُكِ وَكَفَّنْتُكِ وَصَلَّيْتُ عَلَيْكِ وَدَفَنْتُكِ
আইশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাকী থেকে ফিরে এসে আমাকে মাথা ব্যথায় যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় পেলেন। তখন আমি বলছিলাম, হায় আমার মাথা! তিনি বলেন, হে আয়িশাহ! আমিও মাথা ব্যথায় ভুগছি। হায় আমার মাথা! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যেতে, তাহলে তোমার কোন ক্ষতি হতো না। কেননা আমি তোমাকে গোসল করাতাম, কাফন পড়াতাম, তোমার জানাযার সালাত পড়তাম এবং তোমাকে দাফন করতাম।
শাইখ আলবানি ইরওউয়াউল গলিলে (৭০০) হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
হানাফিদের জবাব: (১) রাসূল সা.র স্ত্রীগণের হুকুম সকলের চেয়ে আলাদা। তার স্ত্রীগণের বিবাহ মৃত্যুর পরও বাকি ছিলো। এর পক্ষে দলিল (ক) كل سبب ونسب ينقطع بالموت إلا سببي ونسبي
সকল বন্ধন ও বংশ মৃত্যুর মাধ্যমে মিটে যায় শুধুমাত্র আমার বন্ধন ও বংশ ছাড়া। হাদিসের মান: গ্রহণযোগ্য (খ) রাসূল সা.র ইন্তিকালের পর উম্মাহাতুল মুমিনীনের অন্যত্র বিবাহ হারাম হওয়া। (গ) ইন্তিকালের পর রাসূল সা.র মিরাস বন্টন না হওয়া।
আইশা রা. সম্পর্কে তো বিষয়টা স্পষ্টভাবেই এসেছে। যেমন তিরমিজি ও ইবনে হিব্বানের হাদিস, জিব্রিল আলাইহিস সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লামকে স্বপ্নে এসে বলেছেন
إن هذه زوجتك في الدنيا والآخرة
নিশ্চয়ই আইশা দুনিয়া ও আখেরাতে আপনার স্ত্রী।
জবাব ২- এটা রাসূল সা.র বিশেষত্বও হতে পারে।
জবাব ৩- فَغَسَّلْتُكِ وَكَفَّنْتُكِ বলা দ্বারা স্পর্শ উদ্দেশ্য হওয়া জরুরি না৷ তরজমা এভাবেও করা যায় “আমি তোমার কাফন দাফনের ইন্তিজাম করতাম”
জবাব ৪- কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদিসটিকে দূর্বল বলেছেন।
দ্বিতীয় দলিল: আসমা বিনতে উমাইস রা. বলেন
لما ماتت فاطمة رضي الله عنها غسلتها وعلي بن ابى طالب
যখম ফাতিমা মৃত্যুবরণ করলেন, তখন আমি ও আলী বিন আবু তালেব তাকে গোসল দেই।
(আল মা’রিফাহ লিল বাইহাকি, হাদিসের মান: হাসান)
নাইলুল আওতারে ইমাম শাওকানি হাসানসূত্রে বলেন
ولم يكن بين سائر الصحابة انكار على علي واسماء فكان إجماعا
কোনো সাহাবাই আলী রা.র কাজটিকে অপছন্দ করেননি। সুতরাং এই বিষয়ে ইজমায়ে সুকুতি সাব্যস্ত হয়েছে।
হানাফিদের জবাব: ইজমা তখনই সাব্যস্ত হবে যখন সকল সাহাবার কানে এই খবর পৌঁছা প্রমাণিত হবে। কিন্তু তেমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং কোনো কোনো বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায় ফাতিমা রা.র কাফন দাফন দ্রুত ও স্বল্প উপস্থিতিতে হয়েছিল। ফলে সাহাবাদের কানে খবর পৌঁছার বিষয়টি সুদূর পরাহত।
তৃতীয় দলিল: ইমাম বাইহাকি বর্ণনা করেন (৬৬৬২)
أن عبد الله بن مسعود غَسَّلَ زوجته حين ماتتْ
ইবনে মাসউদ তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাকে গোসল দিয়েছিলেন
হানাফিদের জবাব : বাইহাকি এই হাদিস বর্ণনা করে নিজেই জইফ বলেছেন। আর জইফ হাদিস দলিলের উপযুক্ত না।
চতুর্থ দলিল: স্ত্রী স্বামীকে গোসল করাতে পারবে এব্যাপারে সবাই একমত। সুতরাং এর উপর কিয়াস করে বলা যায়, স্বামীও স্ত্রীকে গোসল দিতে পারবে।
হানাফিদের জবাব: স্বামীর গোসল দেয়ার সাথে একে কিয়াস করা যাবে না। কেননা স্বামীর মৃত্যুর পরও স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হয় না, যতদিন না ইদ্দত শেষ হয়। এজন্যই ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বে অন্যত্র বিবাহ বসা যায় না। পক্ষান্তরে স্বামীর ইদ্দত নেই। স্ত্রীর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই সে বিয়ে করতে পারবে।
হানাফিদের দলীল
প্রথম দলিল- হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে
لا يغسل الرجل امراته
স্বামী তার স্ত্রীকে গোসল দিতে পারবে না
(মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, হাদীস নং ১০৯৮২, এবং دار كنوز اشبيليا এর নুসখায় হাদীস নং ১১৩০২)
দ্বিতীয় দলিল: বেগানা নারীকে স্পর্শ করা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হয়েছে৷ গোসলের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।
জমহুরের আপত্তি: স্ত্রী কীভাবে বেগানা হয়?
হানাফিদের জবাব: মৃত্যুর মাধ্যমে স্ত্রীর স্ত্রীত্ব নষ্ট যায়। এবং সে বেগানা হয়ে যায়। দলিল হলো, স্ত্রীর মৃত্যুর সাথে সাথে সাথে তার বোনকে বিয়ে করা বৈধ হয়ে যাওয়া। এবং তার আগের ঘরের কন্যাকে বিয়ে করা বৈধ হয়ে যাওয়া (দুখুল না হওয়া অবস্থায়)। দুই বোন একত্রে স্ত্রী বানানো কুরআন দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হয়েছে৷ যেহেতু স্ত্রীর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তার বোনকে স্ত্রী বানানো জায়েয। তাই প্রথম স্ত্রীর স্ত্রীত্ব বাতিল হওয়া সুস্পষ্ট।
তৃতীয় দলিল: উমর বিন খাত্তাব রা. বলেন
نحن كنا احق بها اذا كانت حية فاما اذا ماتت فانتم احق بها
স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় আমরা তার সর্বাধিক হকদার। মৃত্যুর পর তোমরা সর্বাধিক হকদার।
(কিতাবুল আসার নং ২৩০)
জমহুরের আপত্তি: এটা হাদিসুল বালাগ। মুহাম্মাদ বিন হাসান শাইবানি ও উমর বিন খাত্তাব রা.র মাঝের রাবি কারা জানা নেই। তাই এই হাদিস দূর্বল।
হানাফিদের জবাব: (ক) আমাদের মতে কুরুনে ছালাছার হাদীসুল বালাগ গ্রহণযোগ্য, বিশেষত যদি তা মুজহাহিদ পর্যায়ের কেউ বর্ণনা করে।
(খ) এই আছারটি মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাতে মুত্তাসিল সনদে এসেছে
حدثنا حفص بن غياث عن ليث عن يزيد بن ابي سليمان عن مسروق قال ماتت امرأة لعمر فقال انا كنت اولى بها اذا كانت حية فاما الان فانتم اولى بها (২/৪৫৬)
রাবীদের অবস্থা
হাফস বিন গিয়াস: ইমাম, সিকাহ, হাফিজুল হাদীস।
লাইস বিন আবি সুলাইম। সত্যবাদী, আবেদ, শেষ বয়সে ভুল করতেন। তার লিখিত হাদিস মৌখিক হাদিসের চেয়ে উচ্চমানের। বেশিরভাগ মুহাদ্দিস দূর্বল বলেছেন। কেউ কেউ তাওসিক করেছেন, যেমন ইয়াহইহা বিন মাইন এক জায়গায় বলেছেন لا بأس به، وعامة شيوخه لا يعرفون
তার হাদিস নিতে সমস্যা নাই। তবে তার অধিকাংশ শাইখ অপরিচিত। অন্যত্র বলেছেন, ليس حديثه بذاك ضعيف তার হাদিস তেমন একটা দূর্বল নয়।
(সিয়ারু আলামিন নুবালা)
ইয়াযিদ বিন আবি সুলাইমান: ইয়াহইয়া বিন মাইন ও দারাকুতনি দূর্বল বলেছেন। ইবনে খুযাইমা তার বর্ণনাকে সহিহ আখ্যা দিয়ছেন। ইবনে হিব্বান তার সিকাতে তাকে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি লিখেছেন যে, তিনি ভুলও করতেন। (তা’জিলুল মানফাআহ ২/৭৩) ইমাম আবু দাউদ তাকে তাওসিক করেছে (খুলাসাতু তাহজিবিল কামাল) ইবনে হাজার তাকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন (তাকরিবুত তাহজিব ৭৭৫১)
মাসরুক: উমর রা.র ছাত্র। ফকিহ, হাফিজুল হাদীস।
সব মিলিয়ে হাদিসের মান গ্রহণযোগ্য।
চতুর্থ দলিল: আপনাদের মতেও ইদ্দতের পর ওই মহিলা তার সাবেক স্বামীকে গোসল দিতে পারবে না। শুধুমাত্র ইদ্দত চলাকালীনই তাকে গোসল দেয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তারমানে দাড়ালো, আপনারাও সেই ইল্লত গ্রহণ করেছেন যা দ্বারা আমরা দলিল দিয়েছি। নইলে আপনাদের বর্ণিত হাদিস ও আছারে তো এর দলিল নেই।
উপসংহার: আশরাফ আলী থানভী রহি. ইমদাদুল ফাতাওয়ায় (১/৪৯২) উভয় পক্ষের দলিল উপস্থাপনের পর লিখেছেন, এটি ইজতিহাদি মাসাইল, উভয় পক্ষেরই এখানে যথেষ্ট ভিন্নচিন্তার সুযোগ রয়েছে। একদলকে সুস্পষ্ট বিজয়ী ঘোষণার সুযোগ এখানে কম। অতএব এই মাসয়ালায় একদল আরেকদলকে বিদ্রুপ করা জায়েয হবে না।
উল্লেখ্য, হানাফি মাজহাবে স্ত্রীর মৃত্যুর পর ইস্তিহসানান স্বামীকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। স্বামী তার খাটিয়াও বহন করতে পারবে৷ তবে তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।