প্রশ্ন : যখন হাই আসে তখন আমরা মুখের মধ্যে হাত দেই। ইসলামি শরিয়ায় এর বাস্তবতা কতটুকু? যদি বিষয়টি থেকে থাকে তাহলে ডানহাত ব্যবহার করবে নাকি বামহাত? দলিলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন!
উত্তর: ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, ইবনুল আরাবী লিখেছেন – হাই অলসতা, উদ্যমহীনতা ও মন্থরতা সৃষ্টি করে। মুসান্নাফে ইবনে শায়বার রেওয়াতে এসেছে, রাসুল সা. এর কখনো হাই আসেনি, এমনকি অন্যান্য নবীদের ব্যাপারেও বর্ণিত হয়েছে যে, তাদের হাই আসতো না। (ফাতহুল বারি ১০/৭১৫)
আল্লাহ তায়ালা হাই অপছন্দ করেন।
সহিহ বুখারীর বর্ণনায় এসেছে (৬২২৬)
أن النبي ﷺ قال: إن الله يحب العطاس، ويكره التثاؤب
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা হাঁচি পছন্দ করেন এবং হাই অপছন্দ করেন।
হাই শয়তানের পক্ষ থেকে আসে।
عَنْ عَدِيِّ بْنِ ثَابِتٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، رَفَعَهُ قَالَ الْعُطَاسُ وَالنُّعَاسُ وَالتَّثَاؤُبُ فِي الصَّلاَةِ وَالْحَيْضُ وَالْقَىْءُ وَالرُّعَافُ مِنَ الشَّيْطَانِ
ইবন ছাবিত তার পিতা থেকে, সে তার পিতামহ থেকে মারফূ’রূপে বর্ণনা করেছে যে, নামাযে হাঁচি আসা, নিদ্রা আসা, হাই আসা, হায়য, বমি ও নাক দিয়ে রক্ত পড়া শয়তানের পক্ষ থেকে। (তিরমিজী হাদিস নং ২৭৪৮)
হাই তোলার সময় মুখে হাত না রাখলে শয়তান মুখে প্রবেশ করে।
আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে মুসলিম শরীফের বর্ণনায় এসেছে (২৯৯৫)
اِذَا تَثَاوَبَ أحَدُکُمْ فَلْیُمْسِکْ بِیَدِہ عَلیٰ فَمِہ، فَانَّ الشَّیْطَانَ یَدْخُلُ
‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ হাই তোলে সে যেন তার হাত মুখের উপর রাখে। কেননা শয়তান প্রবেশ করে।’
হাই আসলে আটকানোর চেষ্টা করবে।
সহিহ বুখারীর বর্ণনায় এসেছে (৩২৪৯)
التثاؤب من الشيطان، فإذا تثاءب أحدكم فليرده ما استطاع، فإن أحدكم إذا قال: ها ضحك الشيطان
‘হাই শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। তোমাদের মধ্যে যদি কারো হাই আসে তাহলে যেন আটকানোর চেষ্টা করে। কেননা তোমাদের কেউ যখন হা করে – শয়তান হাসে।’
ইমাম নববী লিখেছেন, নামাজের ভিতরে হোক অথবা বাইরে সর্বাবস্থায় হাই তোলার সময় মুখের উপর হাত রাখা উচিত (আল আজকার, ৩৪৬)
ফুক্বাহায়ে কিরাম লিখেছেন নামাজের ভিতরে হাই আটকানোর চেষ্টা না করা মাকরূহে তাহরীমী, এবং নামাযের বাইরে মাকরুহে তানজিহী। চেষ্টার পরও সম্ভব না হলে গুনাহ হবে না।
শয়তান হাসার বিভিন্ন কারণ কিতাবে লেখা হয়েছে। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. লিখেছেন, হাই তোলার সময় মানুষের চেহারা বিকৃত হয়ে যায়, শয়তান তা দেখে খুশি হয়। (ফাতহুল বারী ১০/৬২৬)
উলামায়ে কেরাম বলেছেন, যদি তেলাওয়াতের সময় অথবা বয়ানের সময় হাই আসে তাহলে মুখে হাত রেখে হাই শেষ হওয়ার পর তেলাওয়াত বা আলোচনা শুরু করবে। হাই তুলতে তুলতে তেলাওয়াত বা আলোচনা করবে না।
হাই তোলার সময় কোন হাত মুখের উপর রাখবে এ ব্যাপারে হাদীসে কিছু বলা হয়নি। উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, যেকোনো হাত রাখার দ্বারাই সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। তবে বাম হাত রাখা কেউ কেউ মুস্তাহাব মনে করেছেন।
ইমাম মুনাবি রহ. বলেন, ডান হাত রাখার দ্বারা সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। উত্তম হলো বাম হাত রাখা। বাম হাত রাখলে হাতের পিঠ মুখের দিকে এবং তালু বাইরের দিকে রাখবে। আর ডান হাত রাখলে তালু মুখের দিকে রাখবে এবং পিঠ বাইরের দিকে। (ফইজুল কাদির ১/৪০৪)
সাফারিনি বলেন, আমাকে আমার শায়খ তাগলিবি রহ. মুখ ঢাকার ক্ষেত্রে বলেছেন, যদি তুমি বাম হাত দিয়ে মুখ ঢাকো তাহলে পিঠের অংশ দিয়ে ঢাকবে, আর ডান হাত দিয়ে ঢাকলে তালুর অংশ দিয়ে। কেননা বাম হাত দিয়ে মন্দ জিনিস দূর করা হয় আর শয়তানের চেয়ে বেশি মন্দ কেউ নেই। (গিজাউল আলবাব ১/৩৪৮)
শায়খ মোহাম্মদ বিন ইব্রাহিম লিখেছেন, যদি হাই আটকানো অসম্ভব হয় তাহলে বাম হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলা উচিত। কেননা বাম হাত মন্দকাজ দূরীকরণে ব্যবহৃত হয় আর শয়তান মন্দ। এবং তালুর চেয়ে হাতের পিঠ মুখের অধিক নিকটবর্তী। (ফাতাওয়া ওয়া রাসাইলু ইবনু ইব্রাহিম ২/১৮২)
ইমাম ইবনে আবেদীন শামি রদ্দুল মুহতারে (১/৪৭৮) লিখেছেন,
(فإن لم يقدر غطاه) بظهر (يده) اليسرى، وقيل باليمنى لو قائمًا وإلا فيسراه
‘(নামাযে) যদি হাই আটকাতে সক্ষম না হয় তাহলে বাম হাতের পিঠ দ্বারা মুখ ঢেকে ফেলবে। আরেকটি অভিমত হলো, কিয়াম অবস্থায় থাকলে ডান হাত দিয়ে মুখ ঢাকবে এবং অন্যান্য সময় বাম হাত দিয়ে।’ আরো দেখুন, আল বাহরুর রায়েক ১/৩২১, ফাতাওয়া শামি ১/৬৪৫
লিখেছেন: উমর ফারূক তাসলিম