এত সুন্দর সৃষ্টি যার, তার সৃষ্টিকর্তা কে?

আস্তিক: দুনিয়ার এত রুপসৌন্দর্য,  এত বৈচিত্র, এত শৃঙ্খলাবদ্ধতা কি একাকি সৃষ্টি হওয়া সম্ভব? এগুলো কি সৃষ্টিকর্তার প্রতি ইঙ্গিত করে না? এর পিছনে কি নেই কোনো কারিগর?

নাস্তিক: ঠিকই বলেছেন। এত অসাধারণ জগৎসংসার – সৃষ্টিকর্তা ছাড়া অস্তিত্বে আসা সম্ভব না। এত বেশি কাকতাল হতে পারে না। আপনাদের সেম লজিক আমারও;  এতকিছু যিনি সৃষ্টি করলেন, এত যার গুণ তার তো অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা থাকা উচিত।

বরং সেম লজিকে তার তো সৃষ্টিকর্তা থাকা আরো জরুরী। অন্যথায়, এত ক্ষমতাধর হয়েও যদি তিনি একা একা অস্তিত্বে আসতে পারেন। তাহলে তার চেয়ে কম ক্ষমতাধর ও বিস্ময়কর  জিনিসগুলো অবশ্যই একা একা অস্তিত্বে আসতে পারে।

আস্তিক: না। সেম লজিক আপনি আল্লাহ তাআলার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন না। কারণটা বলছি…

(ক) ধরুন কেউ পদ্মাসেতুতে রাস্তা ব্লক করে এক ঘণ্টা ফুটবল খেললো।  ফলে রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেলো। স্বাভাবিকভাবেই পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যাবে। কেননা এটাই নিয়ম। এখন যদি প্রধানমন্ত্রী পদ্মাসেতুতে গিয়ে এক ঘন্টা চিত্তবিনোদননে কাটান, গাড়ি চলাচলে বিঘ্ন ঘটান এবং পুলিশ তাকেও গ্রেফতার করে। আপনি অবাক হবেন কিনা? অথচ অবাক না হওয়া উচিত। কেননা এটাই নিয়ম। এটাই আইন। আইন সবার জন্য সমান। তবু আশ্চর্য হবেন। কেননা যিনি এত উচ্চপদে আছেন অথবা এত ক্ষমতার অধিকারী, তার ক্ষেত্রে এসব আইন প্রয়োগ হতে দেখা বিস্ময়কর।

আরেকটু সহজ উদাহরণ দেই, মানুষের জন্য চুলায় আগুন জ্বালাতে না পারা বিস্ময়কর। কেননা মানুষ আগুন ধরানোর বহু কৌশল জানে। আর পৃথিবীতে আগুন ধরানোর উপকরণের বা জ্বালানির অভাব নেই।  সেই একই মানুষের জন্য আবার আগুন জ্বালানো  বিস্ময়কর। যদি সেটা হয়  সূর্যের মতো বিশাল অগ্নিকুণ্ড বানানো। কারণ মানুষের এত সামর্থ্য নেই যে, পৃথিবী থেকে ১৩ লক্ষ গুণ বড় একটি অগ্নিকুণ্ড তৈরি করতে পারে।

একইভাবে এই দুনিয়া বা ইউনিভার্সের জন্য সৃষ্টিকর্তা না থাকা বিস্ময়কর হলেও আল্লাহর জন্য সৃষ্টিকর্তা থাকা বিস্ময়কর। কারণটা ব্যাখ্য করছি…

আসলে বুদ্ধির দিক থেকে মানুষ ছাড়া দুনিয়ার সকল সৃষ্টিজীব কাছাকাছি পর্যায়ের । যদি ধরে নেই মানুষের বুদ্ধি অন্যান্য প্রাণীদের চেয়ে একলক্ষ গুণ বেশি। তবু তা কম, যদি তুলনা হয় আল্লাহ তায়ালার জ্ঞানের সাথে। সুতরাং মানুষসহ সকল সৃষ্টিজীব এক ক্যাটাগরিতে। এবং আল্লাহ তায়ালা আলাদা। সীমাহীন  ব্যাবধান হেতু এখানকার যুক্তিও আলাদা।

আল্লাহ এতই পাওয়ারফুল, এতটাই সৌন্দর্যের আধার যে, সকল সৃষ্টিরাজির গুণ-সমষ্টিও তার কাছে নাই-এর বরাবর। তাই  সৃষ্টিজীবের ক্ষেত্রে যেসব যুক্তি প্রয়োগ হয় তা সব আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে না।

(খ) সৃষ্টিজীবের ভেতরে যতই সৌন্দর্য বা বৈচিত্র থাকুক তা অসীম নয়, সীমাবদ্ধ । এজন্য তা সৃষ্টি করা লজিক্যালি সম্ভব। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সীমাহীন । আর সীমাহীন কিছু সৃষ্টি করা যায় না। আপনারা নাস্তিকরা যদি কোনদিন সীমাহীন কোন বস্তু তৈরি করে দেখাতে পারেন। সেদিন আমি মেনে নেব আল্লাহর সৃষ্টিকর্তা আছেন।

(গ) আমরা সৃষ্টিজীবের প্রতি মানুষকে কেন তাকাতে বলি,  কী দেখাতে চাই তা-ই আপনারা বুঝেননি। আগে বিষয়টা বুঝুন…

যদিও সবকিছু আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি। তবে আমরা  মূলত মানুষকে  সৃষ্টিজীবের পরতে পরতে থাকা সৌন্দর্য ও প্ল্যানিং দেখাই। কেননা এগুলো স্রষ্টায় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বেশি সহায়ক।

এজন্য আমরা  বারবার মানবদেহের দিকে তাকাতে বলি। অথচ মানবদেহ আকারে বড় না। কিন্তু এখানে প্ল্যানিং অনেক বেশি। আর যে জিনিসে প্লানিং বেশি থাকে,  সে জিনিস তৈরিতে কারো হাত বা কারসাজি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

যেমন আপনার পাঁচতলা একটা বিল্ডিং আছে। সেখানে আপনি আর আপনার বন্ধু পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকেন। তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। যা ১৮ তারিখে শোধ দেয়ার কথা। আপনি ১৬ তারিখে দেশের বাড়ি বেড়াতে গেলেন। ১৮ তারিখে ফিরে এসে দেখলেন ভূমিকম্পের আঘাতে আপনার বিল্ডিং ভেঙে চৌচির হয়ে পড়ে আছে। আপনি জানেন যে, ভূমিকম্প প্ল্যান করে আপনার বিল্ডিং ভাঙ্গার জন্য আসেনি। বরং ভাগ্যক্রমে আপনার বিল্ডিং ভেঙ্গে গেছে। সুতরাং আপনি দু:খিত হবেন ঠিকই। কিন্তু  অবাক হবেন না।

কিন্তু যদি বিল্ডিং না ভাঙ্গে; বরং হালকা মাত্রার এক ভূমিকম্প হয়। আর তাতে আপনার ঘরে থাকা কোনো ধাতব বস্তু লাফিয়ে উঠে আপনার ব্রিফকেসের পাসওয়ার্ড-সিস্টেম লকের সাথে ধাক্কা খায়। এবং পাসওয়ার্ড মিলে গিয়ে ব্রিফকেস খুলে যায়। অত:পর ভূমিকম্পের দ্বিতীয়  ঝাঁকুনির সময় সেখান থেকে ১০ হাজার টাকা বের হয়ে পাশের ফ্লাটের দরজার নিচ দিয়ে আপনার বন্ধুর পায়ের কাছে চলে যায়।  যার কাছ থেকে আপনি ঋণ নিয়েছিলেন।  এখানে কিন্তু আপনি ভীষণ অবাক হবেন আর ধারণা করবেন এর পিছনে কোনো হাত, কোনো প্ল্যানিং, কোনো কারসাজি আছে। তখনই আপনি একটি অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে থাকবেন।

অথচ এই ভূমিকম্পের পাওয়ার ছিল কম। ক্ষয়ক্ষতি অল্প।

আমরাও সাধারণত এধরনের বিষয় দেখিয়ে আল্লাহতালার অস্তিত্ব বোঝাতে চেষ্টা করি। কিন্তু আপনারা আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে দেখাচ্ছেন পাওয়ার ও পরিমাণ, প্ল্যানিং নয়। আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতাকে দেখিয়ে বলছেন যে, নিশ্চয়ই তার কোনো সৃষ্টিকর্তা থাকবে। সুতরাং সেম লজিক কোথায়?

আল্লাহ তাআলা কোন নিয়মের অধীন বা অনুগত নন।  তিনি নিজের ইচ্ছার মালিকানাধীন।

তিনি فعال لما يريد,  يفعل ما يشاء। এটা ভিন্ন বিষয় যে, তিনি নিজের উপর কিছু বিষয় আবশ্যক করে নিয়েছেন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির চরিত্রের এই ভিন্নতাটা না বুঝেই আপনারা আমাদের উপর সেম লজিক ছুড়ার দাবি করছেন।

নাস্তিক: কুরআনে আছে ‘আল্লাহ তায়ালা উত্তম পরিকল্পনাকারী’।

আস্তিক: আরে মিয়া! আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সেটা প্রয়োগ হয় সৃষ্টির প্রতি। এমন কোনো পরিকল্পকারী নেই, যার পরিকল্পনা প্রয়োগ হয় আল্লাহর প্রতি।

লেখক: উমর ফারূক তাসলিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *