ইমাম আবু হানিফাই ইতিহাসের প্রথম হাদিসগ্রন্থ প্রণেতা

অনেকে বলে থাকে, ইমাম আবু হানিফা কোনো হাদিসের কিতাব লেখেননি। কেউ কেউ তো বলে, ইমাম আবু হানিফা হাদিসই জানতেন না।

তারা এই মন্তব্য হয়ত অজ্ঞতাবশত করে, অথবা শত্রুতাবশত।

কেননা ইমাম আবু হানিফা যেমন ইসলামী ইতিহাসের সর্বপ্রথম আকিদাগ্রন্থ লিখেছেন (আল ফিকহুল আকবার)। একইভাবে সর্বপ্রথম সুনানও তিনিই সংকলন করেছেন (ফিকহী তারতিবে লেখা হাদিসের কিতাবকে সুনান বলে)। যার নাম কিতাবুল আসার।

যদিও হাদিস লেখার কাজ সাহাবাদের যুগেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো গ্রন্থের তারতিবে সাজানো হতো না।

কিতাবুল আছারের আগে অন্য কোনো সুবিন্যস্ত হাদিসগ্রন্থ পাওয়া যায় না।

কিতাবুল আছার যে ইমাম আবু হানিফা সংকলিত, সেই স্বীকৃতি শাইখুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানীও দিয়েছেন। তিনি তার تعجيل المنفعة بزوائد رجال الائمة الاربعة তে (১/২৩৯) লিখেন
وَكَذَلِكَ مُسْند أبي حنيفَة توهم أَنه جمع أبي حنيفَة وَلَيْسَ كَذَلِك وَالْمَوْجُود من حَدِيث أبي حنيفَة مُفردا إِنَّمَا هُوَ كتاب الْآثَار الَّتِي رَوَاهَا مُحَمَّد بن الْحسن عَنهُ

“মুসনাদে আবু হানিফা ইমাম আবু হানিফা সংকলন করেননি। ইমাম আবু হানিফার হাদীসের একটিমাত্র সংকলনই বিদ্যমান রয়েছে, তা হলো কিতাবুল আসার। যা রিওয়াত করেছেন মুহাম্মাদ বিন হাসান শাইবানী।”

হাফেজ ইবনে হাজার কিতাবুল আছারের রিজালদের উপর স্বতন্ত্র কিতাবও লিখেছেন, যার নাম الإيثار بمعرفة رواة الآثار

ইমাম ইবনে হাজার তাহজিবুত তাহজিব, লিসানুল মিজান, দিরায়া (২/২৩৬), আল ইসাবা ফি তামইযিস সাহাবাতে ও শাইখ আলবানি আল আয়াতুল বাইয়িনাত ফি আদামি সিমাইল আমওয়াতের টিকায় (১/৭৫) ও সিলসিলাতুল আহাদিসিজ জইফায় (১/৫৭২/, ১/৬৬১, ১/৬৬৭) এই কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়েছেন।

কিতাবুল আছার মুয়াত্তার পূর্বে লেখা

ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতি তার শরহে সুনানু ইবনি মাজায় লিখেছেন (১/৮৯)
من مناقب ابي حنيفه التي انفرد بها انه اول من دون علم الشريعه ورتبه ابوابا ثم تبعه مالك بن انس في ترتيب الموطا ولم يسبق ابا حنيفه احد

ইমাম আবু হানিফার স্বতন্ত্র এক বৈশিষ্ট্য হলো, তিনিই প্রথম ইলমে শারিয়তকে গ্রন্থনা করেছেন এবং অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন। অত:পর ইমাম মালিক তার অনুসরণে মুয়াত্তা লিখেছেন। এব্যাপারে কেউ ইমাম আবু হানিফার অগ্রবর্তী নয়। (তাবইজুস সহিফাহ ফি মানাকিবি আবি হানিফাহ, ৩৬)

ইবনে হাজার হাইতামী লিখেছেন,
أَنَّهُ أَوَّلُ مَنْ دَوَّنَ عِلمَ الفقه ورتَّبه أبوباً وكتباً ; على نحو ما هو عليه اليوم، وتعبه مالك في «موطئه»، ومَنْ قبله إنَّما كانوا يعتمدون على حفظهم، وأوَّلُ مَن وضَعَ كتاب الفرائض، وكتاب الشروط

তিনিই সর্বপ্রথম ইলমুল ফিকহ লিপিবদ্ধ করেছেন। উত্তরাধিকার আইন ও শর্তের আইনও তিনি প্রথম সংকলন করেছেন। এবং একে অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত করেছেন, যেমনটা বর্তমান যুগের কিতাবাদিতে দেখা যায়। ইমাম মালেক তার মুয়াত্তায় এটি অনুসরণ করেছেন। এর পূর্বে মানুষ মুখস্তশক্তির উপর নির্ভর করত।

ইমাম মুহাম্মাদ নাকি ইমাম আবু হানিফা

অনেকে কিতাবুল আছারের সংকলক হিশেবে ইমাম মুহাম্মাদকে গণ্য করে থাকেন। এর কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি কোনো কোনো জায়গায় ইমাম আবু হানিফার সাথে ইখতিলাফ করে দলিল হিশেবে ইমাম আবু হানিফা ছাড়াও অন্যান্য শাইখ থেকে হাদিস এনেছেন। এবং প্রতিটি হাদিসের শেষে ফতোয়া লিখেছেন। কিন্তু এর দ্বারা কি তিনি এই কিতাবের মূল সংকলক হয়ে যান?

এর উত্তর পেতে ইমাম মুয়াহাম্মদের লেখার স্টাইল বুঝতে হবে। প্রথমত: তিনি পূর্ণ কিতাব রেওয়ায়েত করেন না। যেমন মুয়াত্তা মুহাম্মাদে তিনি ১০০৮টি হাদিস এনেছেন। অথচ মুয়ত্তার প্রসিদ্ধতম রাবি ইয়াহিয়া বিন ইয়াহিয়া ২৮৬১টি হাদিস এনেছেন। এবং মালিক বিন আবু মুসআব ৩০৬৯টি হাদিস এনেছেন।

একই কাজ তিনি কিতাবুল আছারেও করেছেন, যেখানে ইমাম আবু ইউসুফ বর্ণিত কিতাবুল আছারে হাদিসসংখ্যা ১০৬৮। সেখানে ইমাম মুহাম্মাদ বর্ণিত কিতাবুল আছারে হাদিসসংখ্যা ২৬৮।

দ্বিতীয়ত: তিনি কিতাব রেওয়াতের ক্ষেত্রে মূল শায়েখ ছাড়া অন্যান্য শাইখের হাদিসও এনে থাকেন। যদি মুয়াত্তা দেখি, এটি ইমাম মালেকের হওয়া সত্বেও এখানে কিন্তু তিনি ইমাম মালেকের সাথে ইখতিলাফ করে ইমাম আবু হানিফা ও অন্যদের শাইখের হাদিস এনেছেন।

কিতাবুল আসারেও তাই। আমি দূর্বলের হিশেবে ইমাম মুহাম্মাদের কিতাবুল আছারে মাত্র ১১টি ও ইমাম আবু ইউসুফের কিতাবুল আছারে ৩৩টি হাদিস ইমাম আবু হানিফা ছাড়া অন্য শাইখ থেকে আনা হয়েছে। বাকি ৯০ পার্সেন্ট হাদিসই ইমাম আবু হানিফার। ফলে পুরো কিতাব জুড়ে শুধু
أخبرنا أبو حنيفه

তৃতীয়ত: তিনি হাদিসের শেষে নিজের মাযহাব বা ফতোয়া লিখে থাকেন। এটাও তিনি মুয়াত্তা ও কিতাবুল আসার উভয়টিতে করেছেন। অবশ্য ইমাম আবু ইউসুফের কিতাবুল আছারে হাদিসের আগেপরে কিছু নেই।

বলা হতে পারে, ইমাম আবু হানিফা স্বহস্তে তো লিখেননি।

আসলে সেই যুগে এভাবেই কিতাব লেখা হতো। উস্তাজ বলতেন, ছাত্ররা লিখত। এভাবে কোন ছাত্র পূর্ণাঙ্গ কিতাব লিখতো, কেউ কিতাবের অংশবিশেষ। আবার কেউ উস্তাযের কাছ থেকে শুনে নিজের ভাষায় লিখতো।

সুতরাং কেউ যদি কিতাবুল আছারকে ইমাম মুহাম্মাদের সংকলন বলে, তাহলে তাদের মুয়াত্তাকেও ইমাম মুহাম্মাদের সংকলন বলতে হবে। অথচ ইমাম মুহাম্মাদ শুধুমাত্র মুয়াত্তার একজন রাবি। কিতাবুল আছারের ক্ষেত্রেও তাই।

সুতরাং মুয়াত্তা মালিক যেমন বর্ণনার ভিন্নতার কারণে মুয়াত্তা মুহাম্মাদ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছে। একইভাবে কিতাবুল আসারকেও বর্ণনার ভিন্নতার কারণে অনেকে ইমাম মুহাম্মাদের দিকে সম্পৃক্ত করে। আসলে এটি ইমাম আবু হানিফার সংকলন।

কিতাবুল আছারের নুসখা

যুফার বিন হুজাইল রহি.র রিওয়াইয়াত

এই নুসখার কথা হাফেজ আমির বিন মাকুলা তার الإكمال في رفع الارتياب عن المؤتلف والمختلف في الأسماء والكنى والأنساب এর باب الحصينى والجصينى -র মধ্যে উল্লেখ করেছেন।

এছাড়া হাফেজ আবু সাদ সামআনি শাফেঈ তার কিতাবুল আনসাবে ও হাফেজ আব্দুল কাদির কুরাশি হানাফি আল জাওয়াহিরুল মাজিয়্যাহ ফি তারাজিমিল হানাফিয়্যাতে, ইমাম হাকিম তার মারিফাতু উলূমিল হাদিসে (১৬৪), ইবনে হিব্বান তাবাকাতুল মুহাদ্দদিসিনে, ইমাম তাবরানি আল মুজামুস সগিরে (৩৩) উদ্ধৃত করেছেন।

ইমাম আবু ইউসুফ রহি.র রিওয়াইয়াত

বহু আহলে ইলমের লেখায় এর উদ্ধৃতি পাওয়া যায়। শাইখ আলবানি সিলসিলাতুল আহাদিসিজ জইফায় ২/৩১৭ এর কথা উল্লেখ করেছেন। আবুল ওয়াফা আফগানি এর তাহকিক করেছেন। বাংলা তরজমা করেছেন আলেম আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া।

মুহাম্মাদ বিন হাসান শাইবানি রহি.র রিওয়াইয়াত

এই নুসখা সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও মাকবুল। ইমাম কাসিম বিন কুতলুবগা এই কিতাবের রিজালদের নিয়ে রিজালুল আছার নামে কিতাব লিখেছেন, এছাড়া তার জীবনিতে আত তালিক আলা কিতাবিল আছার নামক আরেকটি কিতাবের সন্ধান পাওয়া যায়। কাশফুজ্জুনূনে ইমাম তাহাভির শরাহর কথাও পাওয়া যায়।

মাওলানা আব্দুর রশিদ নুমানি এর রিজালের উপর কিতাব লিখেছেন, এবং তা মুসনাদে সাহাবা অনুযায়ী সাজিয়েছেন। এই নিবন্ধ তৈরিতে তার লেখালেখি থেকে আমরা সর্বাধিক সহযোগিতা নিয়েছি।

মুফতি মাহদি হাসান শাহজানাপুরী এর একটি উত্তম ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন।

এই নুসখায় ইমাম আবু হানিফার ১০৫ জন শাইখের সন্ধান পাওয়া যায়।

হাসান বিন যিয়াদ আল লুউলুউই রহি.র রিওয়াইয়াত

এই নুসখার কথা হাফেজ ইবনে হাজার লিসানুল মিজানে উদ্ধৃত করেছেন। ইবনুল কইয়িমের ইলামুল মুয়াক্কিইনে (১/৪৩) এই নুসখার প্রতি ইশারা পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন,
قال الحسن بن زياد اللؤلؤي حدثنا ابو حنيفه قال كنا عند محارب بن دثار وكان متكئا فاستوى جالسا ثم قال سمعت ابن عمر يقول سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم لياتين على الناس يوم تشيب فيه الولدان وتضع الحوامل ما في بطنها

এছাড়া ইমাম আবু হানিফার ছেলে হাম্মাদ বিন আবি হানিফাও কিতাবুল আছার রিওয়াইয়াত করেছেন।

কিতাবুল আছারের প্রশংসা

ইবনু মুবারাক রহি. বলেন,
روى اثاره فاجاب فيها كطير الصقور من المنفية
ইমাম আবু হানিফা আছার সংকলন করেছেন এমনভাবে, যেভাবে বাজপাখি আকাশের উচ্চতায় উড়ে। (মানাকিবে ইমামে আজম)

ইমাম আবু মুকাতিল সমরকন্দি বলেন,
روى الاثار عن نبل ثقات جزار العلم مشيخة حصيفة
তিনি আছারকে এমন নির্ভরযোগ্য রাবিদের থেকে বর্ণনা করেছেন, যারা বড় আলেম ও শাইখ ছিলেন। (প্রাগুক্ত)

শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভী রহি. তার কুররোতুল আইনাইন ফি তাফজিলি শাইখাইনে (১৬৫) লিখেছেন, মুসনাদে আবু হানিফা ও কিতাবুল আছার হানাফি মাজহাবের ভিত্তি।

ইমাম বাকর বিন মুহাম্মাদ যারাঞ্জারি হানাফি (৫১২হি.) বলেন, ইমাম আবু হানিফা এই কিতাবটি ৪০ হাজার হাদিস থেকে বাছাই করে লিখেছেন। এটিই ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ হাদিসগ্রন্থ (মানাকিবে ইমামে আজম ১/৯৫)

মাওলানা আব্দুর রশিদ নুমানি লিখেন, আমি তাহকিক করে কিতাবুল আছারে এমন কোনো হাদিস পাইনি যা দলিলযোগ্য নয়।

এতদসত্ত্বেও ইমাম আবু হানিফার প্রতিটি ভাল কাজ অস্বীকার করার লোক প্রতি যুগেই ছিল। হাজারো মিথ্যা অপবাদে তাকে জর্জরিত করা হয়েছে যুগের পর যুগ।

যেকারণে আজও দেখতে পাই, যারা হাদিস সংকলনের ইতিহাস লিখছে/ লিখেছে, তারা মুয়াত্তার কথা লিখলেও কিতাবুল আছারের কথা লিখে না।

লেখক: উমর ফারূক তাসলিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *