ইলম যেভাবে উঠানো হয়

যখন কিতাবাদি ছিলো না, তখনও ইলম ছিলো। যখন ইলম থাকবে না তখনও কিতাবাদী থাকবে। কিতাব দ্বারা ইলম ধরে রাখা যায় না। ইলম বাঁচে আহলে ইলমের বক্ষে। এটা স্বয়ং রাসূল সা.র কথা। হ্যাঁ, কিতাবাদী ইলম অর্জনকে সহজ করে দেয়।

রাসূল সা. বলেছেন, আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষের কাছ থেকে ইলম হঠাৎ উঠিয়ে নেবেন না; বরং আলিমদের উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ইলম উঠিয়ে নেবেন। যখন কোন আলিম বাকী থাকবে না তখন লোকেরা জাহিলদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে। তাদের ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা হবে, তারা না জেনেই ফতোয়া দিবে। ফলে তারা নিজেরাও গোমরাহ হবে, অপরকেও গোমরাহ করবে। (সহীহ বুখারী ১০১)
إِنَّ اللهَ لاَ يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنَ الْعِبَادِ وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ حَتَّى إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوسًا جُهَّالاً فَسُئِلُوا فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا

হাসান বসরি রহি. থেকে বর্ণিত
موت العالم ثلمة لا يسدها شيء ما اختلف الليل والنهار
আলিমের মৃত্যু ইসলামের মধ্যে এমন এক শুন্যস্থান, যা কোন কিছুতেই পূরণ হয় না- যতদিন দিনরাত আবর্তিত হতে থাকবে (দারেমী, হাদিস নং ৩৩৩,। শক্তিশালী । হাদিসটি মুসনাদে বাযযারে আইশা রা. থেকে ও শুয়াবুল ইমান লিল বাইহাকিতে ইবনে মাসউদ রা. থেকে মারফুয়ান বর্ণিত হয়েছে, অবশ্য দূর্বল)

বিদায় হজে রাসূল সা. বলেন
يا أيها الناس خذوا من العلم قبل أن يقبض العلم، قيل: يا رسول الله،فَقَالَ لَهُ: يَا نَبِيَّ اللهِ، كَيْفَ يُرْفَعُ الْعِلْمُ مِنَّا وَبَيْنَ أَظْهُرِنَا الْمَصَاحِفُ وَقَدْ تَعَلَّمْنَا مَا فِيهَا، وَعَلَّمْنَا نِسَاءَنَا وَذَرَارِيَّنَا وَخَدَمَنَا؟ قَالَ: فَرَفَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأْسَهُ وَقَدْ عَلَتْ وَجْهَهُ حُمْرَةٌ مِنَ الْغَضَبِ قَالَ: فَقَالَ: ” أَيْ ثَكِلَتْكَ أُمُّكَ وَهَذِهِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى بَيْنَ أَظْهُرِهِمُ الْمَصَاحِفُ لَمْ يُصْبِحُوا يَتَعَلَّقُونَ بِحَرْفٍ مِمَّا جَاءَتْهُمْ بِهِ أَنْبِيَاؤُهُمْ، أَلَا وَإِنَّ مِنْ ذَهَابِ الْعِلْمِ أَنْ يَذْهَبَ حَمَلَتُهُ ثَلَاثَ مِرَارٍ

হে লোকসকল! ইলম অর্জন করো তা উঠিয়ে নেওয়ার পূর্বেই। বলা হলো ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইলম কীভাবে উঠিয়ে নেয়া হবে অথচ আমাদের মাঝে মুসহাফ (লিপিবদ্ধ কুরআন) রয়েছে, আমরা তা থেকে নিজে শিখেছি, স্ত্রী সন্তান, খাদেমদের শিখিয়েছি। তিনি বললেন, তোমার মা তোমার জন্য কাঁদুক। ইহুদী নাসারাদের কাছেও তো মুসহাফ (লিখিত কিতাব) রয়েছে। অথচ তারা আম্বিয়াদের আনীত বিষয়ের একটি হরফও আটকে রাখতে পারেনি । শুনে রাখো, ইলম উঠে যাওয়া মানে (হামিলীনে ইলম) ইলমওয়ালা উঠে যাওয়া। কথাটি তিনি ৩ বার বললেন। (মুসনাদে আহমাদ, ২২২৯০, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৯৭৬, শক্তিশালী)

রাসূল সা. বলেছেন
يا أيها الناس، عليكم بالعلم قبل أن يقبض، وقبل أن يرفع، العالم والمتعلم شريكان في الاجر ولا خير في سائر الناس بعد
হে মানবকূল। তোমাদের জন্য ইলম অর্জন আবশ্যক তা উঠিয়ে নেয়ার পূর্বেই। আলেম ও তালিবুল ইলম সাওয়াবে অংশীদার হবে। এরপর মানুষের মাঝে কল্যাণ নেই। (আল জামিউস সগির ফি আহাদিসিল বাশিরিন নাজির, হাদিস নং ৫৫৬১)

সা’দ বিন যুবাইরকে প্রশ্ন করা হলো,
ما علامة هلاك الناس قال إذا هلك علماؤهم.
মানুষের ধ্বংসের আলামত কী? তিনি বললেন উলামাদের বিলুপ্তি।
(মুসান্নাফ লিইবনি আবি শাইবা ৭/৪৫৮, দারেমি ১/৩০৯ সনদ শক্তিশালী)

সাইদ বিন মুসাইয়াব বলেন,
عن سعيد بن المسيب قال: شهدت جنازة زيد بن ثابت فلما دفن في قبره قال ابن عباس: “يا هؤلاء من سره أن يعلم كيف ذهاب العلم فهكذا ذهاب العلم.. أيم الله لقد ذهب اليوم علم كثير
আমি যাইদ বিন সাবেতের জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। যখন তাকে দাফন করা হয় ইবনে আব্বাস রা. বলতে থাকেন। হে লোকসকল! যারা জানতে চাও ইলম কীভাবে উঠানো হবে তারা শুনো! আল্লাহর কসম। আজ অনেক ইলম উঠে গেছে। (মু’জামুল কাবির লিত্তাবরানী নং ৪৭৫১)

কা’ব রা. বলেন
عليكم بالعلم قبل أن يذهب، فإن ذهاب العلم موت أهله، موت العالم نجم طمس، موت العالم كسر لا يجبر، وثلمة لا تسد، بأبي وأمي العلماء ـ قال: أحسبه قال: قبلتي إذا لقيتهم، وضالتي إذا لم ألقهم، لا خير في الناس إلا بهم
তোমরা ইলম হাসিল করো তা উঠে যাওয়ার পূর্বেই। ইলম উঠে যাবে আহলে ইলমের অন্তর্ধানের মাধ্যমে। আলেমের মৃত্যু যেন আলোহীন জ্যোতিষ্ক, যেন মেরামত অযোগ্য ভাঙ্গন, যেন অপূরণীয় শূন্যস্থান। আমার পিতামাতা উলামাদের জন্য উৎসর্গ হোক, আমার ধারণা তিনি বলেছেন, তাদের সাথে সাক্ষাতে আমি দিশা খুঁজে পাই, তাদের বিচ্ছেদে আমি বিপথগামী হই। তাদের ব্যাতিত মানুষের মাঝে কল্যাণ নেই। (আখলাকুল উলামা ১/৩১)

মুহাম্মাদ বিন হুসাইন বলেন,
فَمَا ظَنُّكُمْ ـ رَحِمَكُمُ اللَّهُ ـ بِطَرِيقٍ فِيهِ آفَاتٌ كَثِيرَةٌ , وَيَحْتَاجُ النَّاسُ إِلَى سُلُوكِهِ فِي لَيْلَةٍ ظَلْمَاءَ , فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ مِصْبَاحٌ وَإِلَّا تَحَيَّرُوا , فَقَيَّضَ اللَّهُ لَهُمْ فِيهِ مَصَابِيحَ تُضِيءُ لَهُمْ , فَسَلَكُوهُ عَلَى السَّلَامَةِ وَالْعَافِيَةِ , ثُمَّ جَاءَتْ طَبَقَاتٌ مِنَ النَّاسِ لَابُدَّ لَهُمْ مِنَ السُّلُوكِ فِيهِ , فَسَلَكُوا , فَبَيْنَمَا هُمْ كَذَلِكَ , إِذْ طُفِئَتِ الْمَصَابِيحُ , فَبَقُوا فِي الظُّلْمَةِ , فَمَا ظَنُّكُمْ بِهِمْ؟ هَكَذَا الْعُلَمَاءُ فِي النَّاسِ لَا يَعْلَمُ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ كَيْفَ أَدَاءُ الْفَرَائِضِ , وَكَيْفَ اجْتِنَابُ الْمَحَارِمِ , وَلَا كَيْفَ يُعْبَدُ اللَّهُ فِي جَمِيعِ مَا يَعْبُدُهُ بِهِ خَلْقُهُ , إِلَّا بِبَقَاءِ الْعُلَمَاءِ , فَإِذَا مَاتَ الْعُلَمَاءُ تَحَيَّرَ النَّاسُ , وَدَرَسَ الْعِلْمُ بِمَوْتِهِمْ , وَظَهَرَ الْجَهْلُ , فَإِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ‍ مُصِيبَةٌ مَا أَعْظَمَهَا عَلَى الْمُسْلِمِينَ؟»
মনো করুন গভীর অন্ধকার রাতে একটা বিপদসংকুল রাস্তা দিয়ে কাউকে যেতে হচ্ছে। যদি তার কাছে আলো না থাকে সে পথভ্রষ্ট হবে। অত:পর আল্লাহ তায়ালা প্রদীপের ব্যবস্থা করে দিলেন। তারা নিরাপদে চলতে থাকে। অত:পর আরেকটি কাফেলা আসে, তাদেরও সেপথ দিয়ে চলতে হবে। চলতে চলতে হঠাৎ প্রদীপ নিভে যায়। তারা অন্ধকারে আটকে পড়ে। তাদের ব্যাপারে আপনার ধারণা কী? মানুষের মাঝে উলামায়ে কেরামের অবস্থান সেই প্রদীপের মত। অনেক মানুষেরই হালাল হারাম, ফরজ ওয়াজিবের জ্ঞান নেই, তাওহিদ শিরক পার্থক্য করার ক্ষমতা নেই। উলামাগণ ছাড়া কে তাদের শেখাবে? যখন উলামাগণের মৃত্যু হয় মানুষ পথভ্রষ্ট হয়, ইলম নিশ্চিহ্ন হয় ও জাহালাত প্রভাব বিস্তার করে। (আখলাকুল উলামা, ৩০)

রাসূল সা. বলেন
مَوْتُ قَبِيلَةٍ أَيْسَرُ مِنْ مَوْتِ عَالِمٍ
একজন আলেমের মৃত্যুর চেয়ে একটি সম্প্রদায়ের মৃত্যু কম ক্ষতিকর। (শুয়াবুল ঈমান ৩/২৪)

উমর রা. বলেন
موت ألف عابد أهون من موت عالمٍ بصير بحلال الله وحرامه
১ জন আলেমের মৃত্যুর চেয়ে ১ হাজার আবেদের মৃত্যু কম ক্ষতিকর। (ইহইয়াউল উলূমিদ্দীন ১/৯ সনদ অত্যন্ত দূর্বল)

ইবনে মাসউদ রা. বলেন,
أتدرون كيف ينقص الإسلام؟ يكون في القبيلة عالمان، فيموت أحدهما فيذهب نصف العلم ، ويموت الآخر فيذهب علمهم كله
তোমরা কি জানো কীভাবে ইসলাম ধ্বংস হবে? কোনো সম্প্রদায়ে দুজন আলেম থাকবে। তাদের একজন মারা যাওয়ার মাধ্যমে অর্ধেক ইলম বিলুপ্ত হবে, অতপর দ্বিতীয়জন মারা যাবে। এবং সম্পূর্ণ ইলম বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
(আখলাকুল উলামা ১/৩৩)

ইমাম ইবিনুল কাইয়িম বলেছেন
لما كان صلاح الوجود بالعلماء، ولولاهم كان الناس كالبهائم، بل أسوأ حالًا كان موت العالم مصيبة لا يجبرها إلا خلف غيره له
যেহেতু শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ণিত হয় উলামাদের মাধ্যমে তারা না থাকলে মানুষ চতুষ্পদ জানোয়ারের মত হয়ে যাবে। বরং তারচেয়েও খারাপ হবে। উলামাদের মৃত্যু এমন মুসিবত যার উপশম নেই। তবে যদি স্থলাভিষিক্ত থাকে। (মিফতাহু দারিস সাআদাহ ১/৬৮)

ইবনে মাসউদ রা. বলেন,
قال ابن مسعود: “عليكم بالعلم قبل أن يرفع، ورفعه هلاك العلماء، والذي نفسي بيده ليودن رجال قتلوا في سبيل الله أن يبعثهم الله علماء؛ لما يرون من كرامتهم
তোমরা ইলম অর্জন করো তা উঠিয়ে নেয়ার পূর্বে। ইলম উঠবে উলামাদের মৃত্যুর মাধ্যমে। যার হাতে আমার প্রাণ তার কসম আল্লাহর রাস্তায় নিহত মুজাহিদরা যখন আলেমদের মর্যাদা দেখবে তখন পুনরায় দুনিয়ায় আসতে চাইবে উলামা হয়ে। (মিফতাহু দারিস সাআদাহ ১/১২১)

উকবা বিন আমের রা. বলেন,
قال عقبة بن عامر “تعلموا العلم من أهله المحققين الورعين قبل ذهابهم، ومجيء قوم يتكلمون في العلم بمثل نفوسهم وظنونهم التي ليس لها مستند شرعي”
ইলম অর্জন করো মুহাক্কিক, খোদাভীরু আহলে ইলম থেকে-তাদের অন্তর্ধানের পূর্বে। এবং লোকদের আগমনের পূর্বে যারা মনগড়া ও অনুমানভিত্তিক ইলমী কথা বলে, যেসবের কোনো শরঈ ভিত্তি নেই।
(আল মাজমু’ শারহুল মুহাজ্জাব ১/২০)

লিখেছেন: উমর ফারূক তাসলিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *