বর্তমানে আমাদের সামনে যে সমস্ত ‘চেহারা’ বড় বড় কথা বলে, উস্কানি দেয়, তাদের অনেকেরই ‘মস্তিষ্ক’ অন্য কোথাও।
ড্রোন যেমন মাথার উপরে দেখা যায়, কিন্তু এর নিয়ন্ত্রক থাকে হাজার কিলোমিটার দূরে, এরাও তেমনি।
জনগণ গরম বক্তব্য শুনতে পছন্দ করে, উত্তেজিত হতে পছন্দ করে, লড়াই করতে পছন্দ করে, (এজন্য তারা কোথাও ঝগড়া হতে দেখলে ভিড় করে দাঁড়ায়।)
একইসাথে জনগণ ধর্মীয় আবেগ ধারণ করে, ইসলামের জন্য জীবন দিতে চায়।
অতএব এমন জনগণের সামনে যদি কেউ নিজের স্বার্থ বা এজেন্ডার উপর ইসলামের রংটা মেখে দিতে পারে এবং বিশ্বাস করাতে পারে যে, এই লড়াই দেশের জন্য বা ইসলামের জন্য, তখন তারা নিজের জীবন বিলিয়ে দিতেও পরোয়া করে না।
এক্ষেত্রে মেধাবী লোকদেরই মাঠে নামানো হয়। তাদের পপুলিস্ট কথাবার্তা বলার ট্রেনিং দেওয়া হয়।
কীভাবে আমাদের আবেগকে ব্যবহার করা হয় তা বুঝতে ভাড়াটিয়া বাহিনী ও মিলিশিয়া বাহিনী সম্পর্কে জানা উচিত।
রাশিয়ার ভাড়াটিয়া বাহিনী ওয়াগনারের একজন সদস্য পদমর্যাদা অনুসারে ৪-৭ লাখ টাকা বেতন পায়।
মার্কিন ভাড়াটিয়া বাহিনী ব্ল্যাকওয়াটারের একজন সদস্যের বেতন পদমর্যাদা অনুযায়ী ২০-৪০ লাখ টাকা।
ভাড়াটিয়া বাহিনী যেকোনো দেশ ও ধর্মের হতে পারে। টাকার জন্য তারা যেকোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করে থাকে।
কিন্তু মিলিশিয়া বাহিনী সাধারণত কোন একটি ধর্মীয় বা জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে একত্রিত হয় এবং তারা সুনির্দিষ্ট প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। তারা খুব অল্প বেতনেও কাজ করে, অনেক সময় বিনা বেতনে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবেও কাজ করে।
বুঝায় যায়, ভাড়াটিয়া বাহিনী তৈরি করতে খরচ অনেক বেশি। কারণ সদস্যদের মৃত্যুঝুঁকির মূল্য পরিশোধ করতে হয়।
কিন্তু যদি মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা যায়, তাহলে খুব স্বল্প বেতনে সদস্য সংগ্রহ করা যায়।
যেমন ইরা নি মিলিশিয়া হিজ বুল্লাহ এবং হাশদি শাব, কুর্দিদের pkk-ypg। তাদের ভাতা ভাড়াটিয়া বাহিনীর চেয়ে অনেক কম হওয়ার কথা।
এজন্যই বড় বড় শক্তিগুলো ভাড়াটিয়া বাহিনী তৈরি করার চেয়ে মিলিশিয়া গঠনে বেশি মনোযোগী।
কুর্দিদের একাংশ যেহেতু স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চায়; তারা এমনিতেই যুদ্ধে নামতো। এ সময় তাদেরকে এসে আমেরিকা, ইউরোপ, ইস রা ইল বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করল। এবং তাদেরকে উস্কে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হলো। (সেই স্বার্থ হলো ইরানকে প্রতিহত করা, সিরিয়ার খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেয়া, তুরস্ককে নিয়ন্ত্রণ করা, মধ্যপ্রাচ্যকে টুকরা টুকরা করা ইত্যাদি।)
যে কাজ করার জন্য পশ্চিমাদের বিপুল খরচ করে ভাড়াটিয়া বাহিনী নিয়োগ দিতে হতো কিংবা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে জান খোয়াতে হতো, তা যুদ্ধে না জড়িয়েই অল্প খরচে তারা করে ফেলতে পারলো।
আমেরিকা ওসা মা বিন লা দেন এবং আফগানিস্তানের মুজা হিদিনকে- যাদের মধ্যে তালে বানেরও অনেক সদস্য ছিল – রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি সাপোর্ট দিতো। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো সেসময় ও সামা বিন লা দেনকে হিরো হিসেবে প্রচার করেছিল।
অভিযোগ আছে যে, দায়েশকেও প্রথমে আমেরিকা সহায়তা করেছে। স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছে “দায়েশ ওবামা-হিলারীর তৈরি”। কারো মতে আমেরিকা শুরুর দিকে দায়েশকে নিজ স্বার্থে ছাড় দিয়েছে। কারো মতে রাশিয়া দায়েশের পৃষ্ঠপোষক।
মুজা হিদিন এবং তালে বান জানতো যে, আমেরিকা তাদেরকে নিজেদের স্বার্থে সাপোর্ট দিচ্ছে। কিন্তু যেহেতু এর দ্বারা তালেবানের লক্ষ্য উদ্দেশ্য -অর্থাৎ মাতৃভূমিকে স্বাধীন করা, দেশ থেকে অপশাসন দূরীভূত করা, ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি- জড়িত ছিল। এজন্য তারা জেনে বুঝেও তাদের সহায়তা নিয়েছে। এবং এতে খারাপ কিছু নেই।
কিন্তু সব জায়গায় বিষয়টি এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা ইনফরমেশন ছড়িয়ে জনতাকে উত্তেজিত করে লড়াই করানো হয়। সেই লড়াইয়ের ”মস্তিষ্ক”দের ইসলামের সাথে কোন সম্পর্ক থাকে না। এবং তাতে জনতারও কোনই ফায়দা হয় না। ফায়দা হয় পিছনে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের।
বাংলাদেশের বসবাস করার কারণে নেগেটিভ পজিটিভ দুই অর্থেই ভারত আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতকে আমাদের দেশের জনগণ অপছন্দ করে, কারণ তারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখার ক্ষেত্রে প্রচুর সাহায্য করেছিল। বিনিময়ে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে বিভিন্ন অসম চুক্তি করিয়ে নিয়েছিল। যাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া সীমান্ত হত্যা ও “র”য়ের মাধ্যমে ভিন্নমতের দমন ও গুম-খুন তো রয়েছেই।
জনগণের ভারত বিরোধিতার আরেকটি কারণ হলো, সেখানকার মুসলমানদের উপর নির্যাতন, মসজিদ ভাঙা ইত্যাদি।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং বর্তমান সরকার সেকুলার হওয়ায় এগুলোর কারণে তারা ভারতের বিপক্ষে দাঁড়াবে না। এছাড়া “বয়কট ক্যাম্পেইন” যারা করছে তারাও এটাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেনি।
অতএব এটা মাথায় রাখি যে, চলমান ভারত বাংলাদেশ টানাপোড়েনে “ধর্মীয়” ইস্যুগুলো ভূমিকা রাখছে না। শুধু “জাতীয় স্বার্থ” ভূমিকা রাখছে।
ভারত বাংলাদেশ যুদ্ধের সম্ভাবনা
পৃথিবীর অনেক দেশেরই প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক এরচেয়েও বহুগুণ খারাপ, কিন্তু তারা যুদ্ধে জড়াচ্ছে না। যেমন উত্তর কোরিয়া-দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত-পাকিস্তান, ভারত-চায়না। তাছাড়া ভারত বাংলাদেশ দখল করে হুদাই ১৬ কোটি মুসলিম ভোটার বাড়াতে চাইবে না।
কিন্তু কিছু কিছু গ্রুপ বাংলাদেশ-ভারত যুদ্ধ চাইছে।
গতকালই আমাদের উপজেলায় একজন হিন্দু কোরআন অবমাননা করেছে। আমার ধারণা এটা সেই হিন্দুর কোন ব্যক্তিগত কাজ ছিল না, তার পেছনে অনেকগুলো ধাপে প্রচুর সংখ্যক মানুষ রয়েছে। যারা যুদ্ধ চায়। যার শেষ মাথা এতটাই দূরে যে, শেষ পর্যন্ত পৌঁছা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এমনকি সে হয়তো নিজেও জানে না যে, কার ক্রীড়নক হয়ে কাজ করছে।
বাংলাদেশের দুএকজন পলিটিকাল একটিভিস্টও হিন্দুদের ব্যাপারে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে ৩টি সম্ভাবনা। ১- হয়তো তারা ভারতের এজেন্ট। এজন্য ভারত বাংলাদেশ যুদ্ধ লাগিয়ে ভারতের উপকার করতে চায়। ২- অথবা তারা ভারতের শত্রুদেশের এজেন্ট। যারা ভারতকে যুদ্ধে এনে দুর্বল করতে চায়। ৩- ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলে জনপ্রিয়তা পেতে চায়।
বাংলাদেশের মানুষ হিন্দুদের প্রতি সহনশীল। তারা সেই ফাঁদে এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি পা দেয়নি। এবং কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিকল্পনাকে সফল হতে দেয়নি।
ভারতকে উস্কানি দেওয়ার একটা উদাহরণ হলো, সেভেন সিস্টার্সের স্বাধীনতা আন্দোলনে সহযোগিতা করার হুমকি দেওয়া। সেভেন সিস্টার্সকে স্বাধীন হওয়ার ক্ষেত্রে যদি বাংলাদেশ সাহায্য করে, অর্থাৎ অস্ত্র সাপ্লাই করে বা ট্রেনিং দেয়, তাহলে এটা ভারতকে সরাসরি যুদ্ধে টেনে আনবে। ভারতের উপরও আভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি হবে যুদ্ধ করার জন্য।
সেভেন সিস্টার্সের ৭টা রাজ্যের একটাও মুসলিমপ্রধান নয়। বাংলাদেশের তো কোন প্রয়োজন নেই তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে সহযোগিতা করার।
কিন্তু একদল ভারত থেকে আরেক দল বাংলাদেশ থেকে যুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলগুলো হিন্দু বাঁচানোর আওয়াজ তুলে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার চেষ্টায় লিপ্ত। যেমন পশ্চিমবঙ্গের শুভেন্দু অধিকারী চায়, পশ্চিমবঙ্গের সকল হিন্দুদের মনে জায়গা করে নিতে। কারণ সব হিন্দু একজোট হয়ে তাকে ভোট দিলে সে জিতে যাবে। এটা ভারতের খুব পরিচিত রাজনীতি।
পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে অনেকেই আজ বাংলাদেশকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে চাচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, নিরাপদ জীবন যাপন অনেক বড় নেয়ামত। নিরাপত্তার মূল্য ওই সমস্ত রাষ্ট্রের নাগরিকরা বুঝছে যারা আজ যুদ্ধবিধ্বস্ত।
তিরমিজির হাদিসে (হাসান সূত্রে) এসেছে যে ব্যক্তি নিরাপদ অবস্থায় ও সুস্থ অবস্থায় রয়েছে এবং তার কাছে একদিনের খাবার রয়েছে। তার কাছে পৃথিবীর সকল নেয়ামত রয়েছে।
আগে অনেক আরবি কিতাবের গায়ে লেখা দেখতাম,যে সেগুলো বৈরুত থেকে বা দামেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ কত জমজমাট ছিল তাদের কিতাবের বাজার। কোনো দেশের মানুষ তখনই বই পড়ে, যখন তারা সুখে শান্তিতে থাকে। অভাবী মানুষেরা বই পড়ার সময় পায় না কিন্তু আজ যুদ্ধের কারণে বৈরুত-দামেস্কের অবস্থা কী?
যুদ্ধ শুরু করা সহজ কিন্তু শেষ করা অনেক কঠিন। যুদ্ধ থেকে চাইলেও বের হওয়া যায় না। যুদ্ধ কোটি কোটি মানুষের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা শহরকে ধুলিস্যাৎ করে দেয়। অসংখ্য নারী-শিশু ও নিরপরাধ মানুষের লাশ উপহার দেয়। অতএব যুদ্ধ কামনা করা কখনোই উচিত নয়। সহীহ বুখারীর হাদিসে এসেছে “তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার কামনা করো না।”
যুদ্ধে ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবেও সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। কারণ তিনদিকেই ভারত। অল্প একটু সীমান্ত মায়ানমারের সাথে আছে। তারাও বাংলাদেশের শত্রু। একাধিকবার তারা বাংলাদেশের আকাশসীমা লংঘন করেছে। তাদের গোলাবারুদও বাংলাদেশ পড়েছে অনেকবার।
ভারতকে বয়কট করার ক্ষেত্রেও আমার ভিন্নমত রয়েছে। আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচিত সারা পৃথিবীকে একটা বাজার হিসেবে দেখা। বাজারে কোন বন্ধু শত্রু বিবেচনা করতে হয় না যার কাছ থেকে কম দামে পণ্য পাওয়া যায় তার কাছ থেকেই কিনতে হয়। হ্যাঁ, যেসব দেশ বাংলাদেশের অথবা মুসলমানদের অনেক বেশি ক্ষতি করে তাদেরকে বয়কট করা উচিত। কিন্তু সেক্ষেত্রে আমেরিকা, ইউরোপ, চায়না, রাশিয়া সবাইকেই বয়কট করতে হয়। শুধু ভারত কেন?
আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ টাই মূল বিষয় হওয়া উচিত। দরকষাকষি করে যেখানে যে পণ্য কম টাকায় পাওয়া যায় সেখান থেকেই নেওয়া উচিত। চাই সেটা ভারত হোক না কেন? তবে ইস রাইলের মতো দেশগুলোর হিশাব ভিন্ন। কারণ তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে, তাই তাদের ক্ষেত্রে যুক্তিগুলো ভিন্ন।
লিখন: উমর ফারূক তাসলিম